Home » প্রচ্ছদ কথা » বাংলাদেশের ভয়দশা, ভয় বাণিজ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

বাংলাদেশের ভয়দশা, ভয় বাণিজ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Coverবাংলাদেশের জন্মের পরে কিংবা জন্মের আগে অথবা সেই ব্রিটিশ শাসনকালে ‘ষড়যন্ত্র’ এবং ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ স্বৈরশাসন ও দমন পীড়নের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাকিস্তান আমলে জনগণের যে কোন ন্যায্য আন্দোলনসংগ্রামের ক্ষেত্রে পাক শাসকগোষ্ঠি ভারতের সাথে ষড়যন্ত্রের একটি আগাম গন্ধ পেত এবং যে কাউকে, যেমন খুশি ভারতের চর বানিয়ে ফেলা হতো। বাংলাদেশ জন্মের পরে এই প্রবণতা অব্যাহত থেকেছে এবং এখনও যে কাউকে ভারত বা পাকিস্তানের অনুচর বানিয়ে দেয়া হয়। সন্দেহ নেই, দীর্ঘ দু’দশকেরও বেশি চলমান বাঙালীর মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতাকারীরা যে মানসিকতায় এটি করেছে, পরবর্তীকালে ক্ষমতায় আসীন দলগুলো বিরোধীপক্ষকে সেভাবেই চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছে।

নানা আলোচনা, দলিলদস্তাবেজ ও লেখায় উঠে এসেছে যে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির মাঝে যুদ্ধকালেই নানা বিভাজন, গ্রুপিং ও সর্বনাশা চক্রান্ত বাংলাদেশ জন্মের সাড়ে চার দশকের বিভাজিত, বিদ্বেষপূর্ণ ও হিংসাশ্রয়ী রাজনীতির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এর ফাঁক দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীরা সামরিকবেসামরিক সরকারগুলির দুর্বলতার সুযোগে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হতে পেরেছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জাতীয় ঐক্যের প্রতি গুরুত্বারোপ না করে পরস্পর বিরোধী নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়ায় এখন যুক্ত হয়েছে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং ভয় ও ভয় বাণিজ্য।

এই দেশের রাজনীতি ও জনগণের প্রাত্যহিক জীবনাচার এখন যে ঘুর্ণাবর্তে পড়েছে তার প্রধান উপাদান হচ্ছে ভয়। এখানে রাজনীতির পক্ষবিপক্ষগুলি কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে আশ্রয় করে আছে ভয়ের ওপর। ক্ষমতাসীনদের ভয়, ক্ষমতা হারালে অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। দেখা দেবে অস্তিত্বের সংকট। ফলে ক্ষমতাসীনরা ভোটকে ভয় পাচ্ছে। ব্যালটে জনগণ সাড়া দেবে না এই আশংকায় নির্বাচন নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষার পরে এটিকে একক ও একমুখীনতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

ক্ষমতা থেকে দুরে থাকা যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে ততই ভয় বাড়ছে বিএনপির। ক্রমাগত রাজনৈতিক বিপন্নতায় দলটির টিকে থাকার প্রশ্নে সংকট বাড়ছে। এসব বিষয় ক্ষিপ্ত ও দিশেহারা করে তুলছে তাদের। এরসাথে যুক্ত হয়েছে অর্জিত সম্পদভান্ডার খুইয়ে ফেলার। এক্ষেত্রে মিল হচ্ছে, দু’পক্ষই পালাক্রমে ক্ষমতায় থেকেছে। একশ্রেনীর রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা দেশেবিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। এই বিপুল সম্পদ অতি অল্প সময়ে ক্ষমতায় থাকাকালে অর্জিত বলে এর চেহারা সাদা নয়। তাই নিত্যদিনের ভয় হচ্ছে সম্পদ হারানোর।

এই ভয় থেকে রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্রসমাজে ভয়ের বাত্যাবরণ সৃষ্টি করে নিজের চারদিকে নিরাপত্তা বলয় তৈরী করতে চান। হরতালঅবরোধ, পেট্রোল বোমাআগুন, ক্রসফায়ারগুম, গ্রেফতার বাণিজ্যমামলা, সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণকে সন্ত্রস্ততটস্থ রেখে ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখা। এর মধ্য থেকে একদল আবার ক্ষমতা ফেরত পেতে চায়। আর ক্ষমতাসীনরা এসব ঘটনা থেকে সৃষ্ট ভয়কে পুঁজি করে কর্তৃত্ববাদীতার মাঝখানে ক্ষমতা আরো সংহত করতে চায়। এই সুযোগে অন্ধকারের প্রাণীরা চরমপন্থার বাত্যাবরণে সংগঠিত হয়। জঙ্গী, সন্ত্রাসবাদী, দেশীবিদেশী ষড়যন্ত্রনানা নামে অভিহিত হয়ে ভয়ের একটি দুষ্টচক্র গড়ে তোলে।

রাজনীতির পক্ষবিপক্ষগুলি এখন ভয়াশ্রয়ী বলে ভীতি তাদের চরমপন্থার দিকে নিয়ে যায়। চরমপন্থা জিঘাংসা বাড়িয়ে তোলে এবং নীতিহীন করে দেয়। নীতিহীনতা দেশে বয়ে আনে প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয়। এই বিপর্যয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাসীন দল একাকার হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানের কর্তারা দলীয় ভূমিকায় নামে। প্রতিপক্ষ দমনে তাদের উগ্রতা জনগণকে আরো ভয়ের আবর্তে নিক্ষিপ্ত করে। শক্তি প্রয়োগই হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ দমনে মূল অস্ত্র। এভাবে ভয়ের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ন্যায্যতা দুর্ক্ষল হয়ে পড়ে। আইনের শাসনের বদলে আইনকে শাসন করা কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।

২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভয়ের বিস্তার, কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং জনমত প্রকাশের একমাত্র স্পেস জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় নির্বাচনগুলিকে একক ও একমুখী করে তোলার প্রচেষ্টা কতগুলি অশুভ আশংকা তৈরী করেছিল। গণতন্ত্র চর্চা ও সুশাসনের অভাব এবং সেইসাথে স্বচ্ছতাজবাবদিহিতা এবং ন্যায়পরায়ণতা না থাকায় চরমপন্থার উত্থানের বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকরা বারবার সতর্ক করার চেষ্টা করেছেন। গণতান্ত্রিক স্পেস না থাকায় ধর্মীয় চরমপন্থা বাড়ছে। আর সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দল যখন চরমপন্থাকে ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে তখন তার পরিণাম সম্পর্কে বলার অপেক্ষা রাখে না।

দেশ এগোচ্ছে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে রোল মডেল, জঙ্গীবাদ নিয়ন্ত্রনে, ভাবমূর্তি সমুজ্জলএসব প্রচারণার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বলে দিচ্ছে এই দেশ আদতেই সংকটের মধ্যে রয়েছে। দু’জন বিদেশী নাগরিক হত্যা, একজন ধর্মযাজককে হত্যার প্রচেষ্টা, পিডিবি’র সাবেক চেয়ারম্যানকে হত্যা, সংসদ সদস্য কর্তৃক নিরীহ শিশুকে হত্যার প্রচেষ্টা এবং সবশেষ তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলার পরে সরকারের ভাষ্যে দেশীবিদেশী ষড়যন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে। ইঙ্গিত করা হচ্ছে, সফররত বিএনপি চেয়ারপার্সন, লন্ডনে অবস্থানরত তদীয় পুত্র ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের দিকে।

অন্যদিকে, কয়েকটি বিদেশী দূতাবাসের ঘন ঘন এ্যালার্ট সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠছে। এই দেশে যে কোন ঘটনা ঘটলে মিডিয়ায় সরকারের নির্বাহীরা এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা সন্দেহ বা ধারনার কথা অবলীলায় বলতে থাকেন, যা প্রায়শ: পরস্পরবিরোধী। ফলে জনগণ ধন্ধে থাকেন, যা ভয় আরো বাড়িয়ে তোলে। সবচেয়ে বড় সংকটটি হচ্ছে, ধারাবাহিক সহিংস ঘটনায় তদন্ত শেষের আগেই সিদ্ধান্তমূলক ভাষ্য সরকার প্রধান বা নির্বাহীদের মুখ থেকে আসা। তদন্ত সুষ্ঠ হওয়ার ক্ষেত্রে বিতর্ক তৈরী হয় এবং জড়িত কুশীলবদের চিহ্নিত করার বদলে প্রতিহিংসা চরিতার্থে ব্যবহৃত হয়। ফলে আইনী ও বিচারিক দীর্ঘসূত্রীতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র ও জনগণ।

রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ও সুশাসনের অভাব দেখা দিলে সাধারণ মানুষ সবকিছু ভাগ্যের হাতে সঁপে দেয়। এই ভাগ্যনির্ভরতা কর্মহীন, উদ্যোগবিহীন, দেশত্যাগী মনোভাবাপন্ন একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলে। এই প্রজন্মের বড় অংশই ধর্মাশ্রয়ী উগ্রবাদী সংগঠনগুলির টার্গেটে পরিনত হয়। পরিনামে তরুনরা মুক্তি খোঁজে ধর্মাশ্রয়ী উগ্রতায়। দেশে অন্যায্যতাঅনাচারবিচারহীনতা যত বাড়ে, ততই ধর্মাশ্রয়ী উগ্রতায় জড়িয়ে পড়ে তারুন্য। তাদের একমাত্র আদর্শ হয়ে দাঁড়ায় প্রতিপক্ষ নিধন, যার শিকার হয় প্রধানত: নিরীহ মানুষ। দেশ ও জনগণের এখন সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে এই উগ্রতা আর নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়ার।

ভয় উৎপাদনের সাথে ভয় বাণিজ্যের একটি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বজুড়ে ভয় রাজনীতি ও ভয় বাণিজ্যের ক্রমাগত অংশীজন হয়ে উঠতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এখানকার রাজনৈতিক সংকট এই সুযোগ করে দিয়েছে। অন্যপক্ষের ৯/১১ এর পরে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়া বিপর্যয়, তালেবান, আলকায়েদা, আইএস সৃষ্টিতে সহায়তা এবং দমনের মাধ্যমে মার্কিনসহ পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্দখল করেছে। রাশিয়া নতুন শক্তি হিসেবে সিরিয়ায় তার প্রভাব নিয়ে ঢুকে পড়েছে, আসাদ সরকারকে নিরাপদ করতে ও আইএস দমনে। স্বদেশে কথিত উদারতাবাদ চর্চা আর মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম প্রধান দেশসমূহে কথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ধর্মীয় উগ্রবাদ দমনের নামে মার্কিনসহ পশ্চিমা বিশ্বের যুদ্ধ ও দখল জন্ম দিয়েছে বৈশ্বিক অন্যায্যতা। এই অন্যায্যতা ডেকে আনছে অবিশ্বাস, অনাস্থা। এর প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং প্রতিক্রিয়ায় ভয় উৎপাদন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইউরোপিয় সহযোগীরা এই ভয়কে পুঁজি করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে সমরাস্ত্র বাণিজ্য, সশস্ত্র উপস্থিতি এবং যুদ্ধ।

বাংলাদেশকে এখন সেই ভয়দশা ও ভয় বাণিজ্যের অংশ বানানোর চেষ্টা চলছে। বুঝে বা না বুঝে হোক, এই দেশের রাজনীতি এখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে সেই সুযোগ করে দিচ্ছে। এজন্য ভয় যত বাড়বে, গড়ে উঠবে অবৈধ বাণিজ্য। এই অবৈধ বাণিজ্যের দেশীয় হাতে নিগৃহীত হবে সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক হাতে নিগৃহীত হবে ব্যবসাবাণিজ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ। রাজনীতিতে পক্ষবিপক্ষে বৈরীতা, সহিংসতা এবং চরমপন্থা বাড়লেই আন্তর্জাতিক মহল এর সুবিধা নেবে, বিশেষত: যারা দীর্ঘদিন ধরে মুখিয়ে আছে।

দেশীবিদেশী ভয় একসাথে বাণিজ্য করলে তা রাষ্ট্রকে কতটা বিপন্ন করে, জনগণ নিজ দেশে আর বাইরে কিভাবে উদ্বাস্ত হয়ে পড়ে, কিভাবে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় নেমে আসেএর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, পাকিস্তান এবং এক সময়ে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার গৃহযুদ্ধরত দেশগুলি। জনগণ আশা করে, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এ দেশ কখনই সেই পথে যাবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অনেকগুলি আশংকার জন্ম দিয়েছে। এরপরেও এটি বোঝা যাবে রাজনীতিবিদরা ভয় থেকে নিজেদের কতটা দুরে সরিয়ে রাখতে পারেন তার ওপর।