Home » অর্থনীতি » সমুদ্রে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা

সমুদ্রে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ফরেন পলিসি অবলম্বনে

Last 3চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিঙের ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন সফরে গেলেন। এর মাত্র অল্প কয়েক দিন আগে দেশটির একটি নৌবহর যুক্তরাষ্ট্রের পানিসীমায় আত্মপ্রকাশ করে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তারা রণতরীগুলোর ক্যাপ্টেনদের সংক্ষিপ্ত ও আইনসম্মত পথেই চলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

পাঁচটি রণতরীর বেরিং প্রণালীতে ভেসে বেড়ানোটা যুক্তরাষ্ট্র সানন্দেই গ্রহণ করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর এক মুখপাত্র এমনটাও বলেছেন, ‘চীন হলো বৈশ্বিক নৌবাহিনী। আমরা তাদের এবং অন্যদের আন্তর্জাতিক সমুদ্রে কার্যক্রম চালাতে উৎসাহিত করি, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিরাপদ, পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখবে এবং আন্তর্জাতিক বিধিমালা অনুসরণ করে চলবে।’

চীন কেন পশ্চিম গোলার্ধের উত্তর অংশে এই অভিযানে নামল? কারণ সে মনে করছে, দূরের সাগরে উপস্থিতি প্রদর্শনের একটা বিশেষ মূল্য আছে। বিশেষ করে চীন এখন আর মনে করে না যে, কেবল তার দেশের উপকূল রক্ষা কাজে নিয়োজিত থাকলেই চলবে। অবশ্য আক্রমণই সর্বোত্তম রক্ষাকবজএই সূত্র ধরেও অন্যদের এলাকায় যাওয়ার নীতি অনুসরণ করাটা বোধগম্য। চীন দেখাতে চাইছে, পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির (পিএলএএন) রণতরী প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরে তো যেতেই পারে, এর বাইরের এলাকাও তার করায়ত্ব। আর এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সি’র তার দেশের বাহিনীকে মহাদেশীয় শক্তি থেকে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক শক্তিতে উপনীত করার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এক ধাপ এগিয়ে যেতে চান।

অথচ মাত্র কিছু দিন আগেও চীনা নৌ কর্মকর্তারা তাদের বাহিনীকে পশ্চিম প্যাসিফিক ও চীন সাগরের বাইরে পাঠাতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। চীনা নৌবাহিনীর শক্তি বাড়ার সাথে সাথে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন ঘটেছে। তারা তাদের বিধ্বংসী নতুন অস্ত্রসম্ভার নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট। এ কারণেই তারা এখন কেবল বেরিং প্রণালী নয়, সাত সাগরেই তাদের উপস্থিতি দেখাতে চায়। এই ২০১৫ সালেই তারা সেপ্টেম্বরে মিসরীয় বন্দরে ভিড়েছে, মে মাসে গেছে কৃষ্ণ সাগরে। তাদের এই অভিযাত্রাকে অনেকে এক শ বছর আগে মার্কিন সমুদ্রযাত্রীদের সাথে তুলনা করছে।

চীনারা আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্রকে তার এলাকায় খোঁচা দিয়ে চীনের সমস্যাটা ওয়াশিংটনকে বোঝাতে সক্ষম হবে। চীনা কর্মকর্তারা মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র তার দেশের আশপাশে অন্য কোনো দেশের উপস্থিতি মেনে নেবে না। কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সঙ্কট এবং এ ধরনের আরো কিছু উদাহরণ এক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।

চীনারা যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চায়, তাদের এলাকা যেমন তাদের থাকা দরকার, তেমনি দক্ষিণ চীন সাগরও চীনের থাকা দরকার। এখানে কেন বিদেশী পর্যবেক্ষণ বিমানের আনাগোনা থাকবে, কেন পানির নিচে অন্য দেশের সাবমেরিন লুকিয়ে থাকবে, এখানে কেন শত্রুদেশের বিমানবাহী রণতরী মহড়া চালাবে? কেন বাণিজ্যিক রুটের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অন্য দেশ এখানে নাক গলাবে? কেন এই সাগরে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে না?

তবে বিশেষজ্ঞদের মত হলো, এই দৃষ্টিভঙ্গি যদি মেনে নেওয়া হয়, তবে বিশ্বজুড়ে সাগরপথের স্বাধীনতা বলতে আর কিছু থাকবে না। আজ দক্ষিণ চীন সাগর, আগামীকাল কৃষ্ণ সাগর, তারপর দিন পারস্য উপসাগর কোনো না কোনো দেশের মালিকানায় চলে যাবে। সংশ্লিষ্ট দেশের মেজাজমর্জির ওপর নির্ভর করবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল। সেটা কি চূড়ান্ত পর্যায়ে কারো জন্য কল্যাণকর হবে?

চীনের এই নৌশক্তি কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়। তারা মূলত স্থলভাগের নিরাপত্তা নিয়েই ব্যস্ত ছিল। স্থলভাগ থেকে দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে শত্রুকে ঘায়েল করার পরিকল্পনাও তাদের ছিল। তবে এখন তারা মনে করছে, সাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা না হলে তারা তাদের স্থলভাগকেও যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারবে না। নৌবাহিনীকে তারা এগিয়ে নিতে চায়।

ফলে এখন থেকে চীনা রণতরী বিভিন্ন সাগরে দেখা যেতে পারে। এই সূত্র ধরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক আর একটি স্থল শক্তি আর একটি নৌশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং দুই নৌশক্তির মধ্যকার সম্পর্কে রূপান্তরিত হতে পারে।।