Home » আন্তর্জাতিক » আন্তঃনদী সংযোগ :: ভারতের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন

আন্তঃনদী সংযোগ :: ভারতের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন

হায়দার আকবর খান রনো

Dis-3ভারত কি ভাটির দেশের এতো বড় সর্বনাশ করতে পারে? না, আন্তর্জাতিক আইনে তা পারে না। তবে গায়ের জোরে পৃথিবীতে বড় শক্তি তুলনামূলক ছোট দেশের উপর নানা ধরনের আগ্রাসন ও অবিচার করে আসছে। ভারতও অন্ততঃ এই ক্ষেত্রে তাই করে চলেছে।

হেলসিংকি নীতিমালা (১৯৬৬), হেলসিংকি চুক্তি ১৯৯২ এবং এই রকম অনেক চুক্তি ও নীতিমালা আছে, যেখানে আন্তর্জাতিক নদী প্রবাহের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতির উল্লেখ আছে। উজানের দেশ ভাটির দেশের ক্ষতিসাধন করে যা খুশি তাই করতে পারে না। সর্বশেষ জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত (১৯৯৭ সাল) ‘কনভেনশন অন দ্য ল’ অফ দ্য নন নেভিগেশনাল ইউজেস অফ ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কোর্সেস’খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভোটাভুটিতে পাস হলেও তাকে আইনে পরিণত করতে হলে ৩৫টি দেশের স্বাক্ষর লাগে। ভোটাভুটির সময় বাংলাদেশ এর পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ভারত ও চীন বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল। এরপর দেড় দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। ৩৪টি দেশের স্বাক্ষর পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ দেয়নি। অথচ একটি মাত্র স্বাক্ষরের অভাবে এতোদিন পর্যন্ত এটি আইনে পরিণত হয়নি। বাংলাদেশের স্বার্থেই দরকার ছিল আগেই স্বাক্ষর করা। বাংলাদেশের সরকার দেশপ্রেমিক হলে সেটাই করা উচিত ছিল। এর মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকার পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। ২০০৭০৮ সালে ছিল সেনাসমর্থিত সরকার। কিন্তু কোনো সরকারই স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়নি। কারণ সম্ভবত এই যে, এতে ভারত অসন্তুষ্ট হবে। বন্ধুদেশ ভারতের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে যারা জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়, তাদের দেশপ্রেম নিয়েই প্রশ্ন আছে।

যাই হোক, গত বছর (২০১৪ সালে) ভিয়েতনাম স্বাক্ষর করায় এখন এটি আইনে পরিণত হয়েছে। এই আইনের ৭ () এবং ৭ () ধারায় এ কথা সুস্পষ্ট বলা আছে যে, উজানের দেশ ভাটির দেশের সাথে সমঝোতায় আসা ছাড়া নদী প্রবাহে কোন প্রকার বাধ দেয়া, পানি সরানোর মতো কাজ করতে পারে না। (আমি ইতোপূর্বে আমাদের বুধবারএর এক সংখ্যায় এই ধারা দুটি পুরোপুরি উল্লেখ করেছিলাম, তাই এখানে পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে না)

ভারত আমাদের বন্ধুদেশ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা আমরা কৃতজ্ঞতা সহকারে স্মরণ করি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ভারতের অন্যায় আচরণকে মেনে নেবো। বিশেষ করে যখন ভারতের প্রকল্প বাংলাদেশকে পানিশূন্যে ও মরুভূমিতে পরিণত করার ব্যবস্থা নেয়, তখন তা কোনো সুস্থ বুদ্ধির মানুষ মেনে নেবে?

জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত আন্তর্জাতিক আইনকে এক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে ভারতকে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প থেকে বিরত রাখতে হবে। বর্তমান সরকারের সাথে ভারত সরকারের ভালো সম্পর্ক আছে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে এবং আন্তর্জাতিক আইনের দিকটি উল্লেখ করে ভারতকে বিরত রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা নিতে হবে।

এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, ভারতের সুপ্রিম কোর্টও আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ২০১৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার হুকুম জারি করেছে। ভাবতে অবাক লাগে যে, সুপ্রিমকোর্টের ‘বিজ্ঞ’ বিচারকগণ (?) বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের বিষয়টি, এমনকি আন্তর্জাতিক আইনের দিকটিও উপেক্ষা করলো।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের উচিত আলোচনার মাধ্যমে ভারতকে বিরত করা। যদি সম্ভব না হয় তাহলে উপযুক্ত আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি তুলতে হবে।

একই সাথে বাংলাদেশের জনগণকে ভারতের এই দানবীয় প্রকল্প সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ করতে হবে (যেমন করেছিলেন মওলানা ভাসানী) সরকারের উপরও চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে আমাদের সরকার ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানাতে বাধ্য হয় এবং যুক্তি তুলে ধরে। আমাদের সরকার কিন্তু এখনো কোনো প্রতিবাদ জানায়নি।

ভারতের প্রগতিশীল মহলেরও ভূমিকা থাকা উচিত। বিশেষ করে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর। মনে রাখতে হবে যে, কমিউনিস্টরা কখনই জাতীয়তাবাদী নয়। তারা আন্তর্জাতিকতাবাদী। বাংলাদেশের জনগণের কোনো ক্ষতি হয় এমন কাজ করা থেকে নিজ দেশের শাসকগোষ্ঠীর উপর চাপ সৃষ্টি করা ভারতের কমিউনিস্টদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

মোট কথা আমরা এখন সত্যিই এক ভয়ংকর বিপদের মুখে দাড়িয়ে আছি। ভারতের আন্তঃনদী প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনবে। ছোটখাটো সর্বনাশ নয়। সুজলাসুফলা নদীমাতৃক দেশকে মরুদেশে পরিণত করার মতো সর্বনাশ।

এই সর্বনাশ হতে দেয়া যাবে না। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারকে রুখে দাড়াতে হবে। বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় করতে হবে ভারতের প্রগতিশীল মহল ও আন্তর্জাতিক শক্তিকে। এ যে আমাদের বাচামরার প্রশ্ন। আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন।।