Home » প্রচ্ছদ কথা » আমরা অবশ্যই বিচার চাই

আমরা অবশ্যই বিচার চাই

আমীর খসরু

Coverসরকার এই কথা স্বীকার করবে না জানি, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, দেশে এক ভয়ংকরভীতিকর পরিস্থিতি চলছে। মানুষ আতঙ্কিত, শঙ্কিত এবং এ কারণেই বিপর্যস্ত, বিপন্ন, অসহায় ও বিষন্ন। দু’জন বিদেশী হত্যাকাণ্ড এবং শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপরে গ্রেনেড হামলার পরে প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন দুটো বোমা এবং পাচটি ডিম মেরে দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করা যাবে না। এর আগে এ বছরই পর পর চারজন ব্লগারকে হত্যার পরে প্রতিটি ঘটনার শেষেই সরকারের পক্ষ থেকে এমন কথা এবং ধারণা দেয়া হচ্ছিল যে, এসব ঘটনাগুলো বিরোধী দল সৃষ্ট ষড়যন্ত্রের কারণে নিছক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিচ্ছিন্ন ঘটনা। একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, সব ঘটনা তদন্ত শুরুর আগেই প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে বলা হয় এবং হচ্ছে যে, এগুলো সব অভ্যন্তরীণভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র। দেশে কোনো জঙ্গী নেই। বিরোধী দলের কারা বড়ভাই, কারা মদদদাতা এবং হুকুমদাতা তাও স্পষ্ট করে জানান দিয়ে দেয়া হয় তদন্তের আগেই। ব্লগার হত্যার দায় কোনো না কোনো জঙ্গী সংগঠন স্বীকার করেছে এবং দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা ও শিয়া সম্প্রদায়ের মিছিলে বোমা হামলার দায় ইসলামিক স্টেট বা আইএস সরাসরি স্বীকার করেছে। ওই সব ঘটনার পরে তদন্ত কমিটিও গঠিত হয় একাধিক। কিন্তু তদন্ত কমিটি বাস্তবে কি করছে বা করেছে সে সম্পর্কে দেশবাসী অবহিত না হলেও, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা ও অন্যান্য নেতারা অতিমাত্রার যেসব সোচ্চার বক্তব্য দিচ্ছেন, সে সম্পর্কে তারা যথেষ্ট অবহিত।

শনিবারে একজন মুক্তমনা প্রকাশককে কুপিয়ে হত্যা আরও একজনকে কুপিয়ে ও গুলি করে আহত করা, দু’জন ব্লগারকে একই সাথে আহত করা হয় মারাত্মকভাবে। পরেরদিনই অর্থাৎ রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উচ্চারণ করলেন, ইতোপূর্বে বহু উচ্চারিত একই শব্দমালা। তিনি বললেন, এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা বিভিন্ন দেশে ঘটে থাকে। তিনি আবারও জঙ্গী সংগঠনের সম্পৃক্ততাকে খাটো করে দেখার প্রয়াস পেলেন। কিন্তু দুটো ঘটনা বিশ্লেষণ করলে ইতোপূর্বেকার ব্লগার হত্যার সাথে বেশ কিছুটা মিল পাওয়া যায়। এই দফায় এর দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আনসার আল ইসলাম। তবে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা বলছে, এটা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কাজ। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জঙ্গী সংগঠন দায় স্বীকার করলেও কি কারণে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা সেদিকে না গিয়ে স্থানীয় একটি জঙ্গী সংগঠনের দিকে কোনো তদন্ত ছাড়াই অঙ্গুলি নির্দেশ করছে তা বোধগম্য নয়। এটাও বোধগম্য নয় যে, আইএস বা আনসার আল ইসলামের দায় স্বীকারকে সরকার কেনই বা এড়িয়ে যাচ্ছে? এ ধরনের ঘটনা ঘটলে গোয়েন্দা বা তদন্তকারীদের দায়দায়িত্ব হচ্ছে, প্রতিটি সম্ভাব্য বিষয়কে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে তদন্ত কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দুনিয়ার সর্বত্র এমনটিই চলে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের গোয়েন্দারা ক্ষমতাসীনদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর এতে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাবলীর সৃষ্টি হয়।

একের পর এক ঘটনা ঘটছে স্বল্পসময়ের ব্যবধানে। এসব ঘটনার কারণ কি সে সম্পর্কে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে নানা বক্তব্য দেয়া হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু প্রকৃত তদন্ত কাজ এবং অনুসন্ধান প্রভাবমুক্তবিহীনভাবে চলতে দেয়ার বদলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ঘায়েলের নীতিকৌশল পুরো দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে। তবে তথ্য মন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, যদিও তা তার নিজের স্বার্থ মতো ব্যবহার করে। তিনি রোববার বলেছেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ ধরনের ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে পারে না।

দেশে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এ শূন্যতার অনিবার্য ফলাফল হচ্ছে এসব দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক এবং অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাবলী। এ কথাগুলো ক্ষমতাসীনদের আদৌ পছন্দ হবে না কিংবা মনোবৈকল্যের কারণে তারা এটা বুঝতে পারছেন না। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই তারা বিরোধী মত, পথ, পক্ষ এবং দলসহ সামগ্রিকভাবে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে যারা নয়, তাদের বিনাশ, ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে থাকে। শুধু যে চিরাচরিত প্রতিপক্ষ বিএনপিকেই বিনাশ ও ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে তাই নয়, বিরোধী যে কোনো মত, পথ, দল এমনকি সাধারণ মানুষের ন্যায্য প্রতিবাদকেও জোর করে বন্ধ করা হয়েছে। আর এর বহু ক্ষেত্রে লাঠিসহ অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ভয়াবহ রাজনৈতিক শূন্যতার একটি দুর্ভাগ্যজনক পর্যায়ে তারা সৃষ্টি করেছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একদলীয়, ভোটারহীন, নজিরবিহীন নির্বাচনের মধ্যদিয়ে। সামগ্রিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে প্রথম থেকে ওই সময় কিংবা আজঅব্দি সবাই সতর্ক করছেন এই বলে যে, রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টির ফলাফল কখনোই ভালো হতে পারে না। রাজনৈতিক শূন্যতার ফলে এর নেতিবাচক ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া নানা ধরনের ও পন্থায় হতে পারে। এই ধরন এবং পন্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এতোটাই বিপজ্জনক হয়ে থাকে যে, তা দেশ ও জনগণকে সীমাহীন এবং চরম বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়, ইতিহাস এমনটাই সাক্ষ্য দেয়। তবে এর প্রধানতম বর্হিঃপ্রকাশ বর্তমান বিশ্বের বহু দেশে ঘটছে জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার উত্থানে। বিশ্বব্যাপী জঙ্গীবাদের যে ধরনধারণ দেখা যাচ্ছে তাতে এই জঙ্গীবাদ হতে পারে একেবারেই স্থানীয় পর্যায়ের অথবা স্থানীয় পর্যায়ের জঙ্গীদের সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গীদের যোগাযোগের মাধ্যমে কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় জঙ্গী সংগঠনের শাখা প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে। অন্যান্য নানা পদ্ধতিতেও যেমন ব্যক্তিগত পর্যায়েও এই জঙ্গীবাদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। জঙ্গীবাদের উত্থান সব দেশে এক ধরনের হবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।

মনে রাখতে হবে, জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ বা চরমপন্থা প্রধানত একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। আর রাজনেতিক পরিস্থিতি নেতিবাচক পথে গেলে তার প্রতিক্রিয়ায় নেতিবাচকভাবেই হৃষ্টপুষ্ট হয় জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জঙ্গীবাদের উত্থানের নানা কারণ রয়েছে এবং এরও প্রধান কারণ রাজনৈতিক শূন্যতার কারণে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। শাসকদের গণতন্ত্রের প্রতি অনীহা এবং শাসন কর্মে গণতন্ত্রহীনতা, স্বৈরাচারী, একনায়কতান্ত্রিক শাসন ও এই সুযোগে বিদেশী শক্তির গণতন্ত্র রফতানির নামে দখলহস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় শূন্যতা সৃষ্টির কারণেই দানবীয় জঙ্গী শক্তি উত্থানে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া এককেন্দ্রীক বিশ্ব ব্যবস্থার উত্থান এবং উদার গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতিকে মহান আদর্শ বলে চালিয়ে দেয়ার শূন্যতাও আন্তর্জাতিকভাবে সামগ্রিক ব্যবস্থাকে ওলোটপালোট করে দিয়েছে।

শূন্যতার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া যে একই ধরনের, একই ধারার বা একই পদ্ধতির হবে এমনটা নয়। বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তার নানা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং এর একটি দিক হচ্ছে একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত, দুর্ভাগ্যজনক হত্যাকাণ্ড, হামলাসহ এ জাতীয় ঘটনাবলী।

ক্ষমতাসীনরা এ কথাটি কখনই মানতে নারাজ যে, গণতন্ত্রহীনতার পরিবেশে জঙ্গীবাদ চরমপন্থার উত্থান হবেই। তাছাড়া প্রতিপক্ষ দমনের নামে সামগ্রিকভাবে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয় তার সুযোগ ওই শক্তি নেবে এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু ক্ষমতাসীনরা এই শূন্যতাকে আর্শীবাদ হিসেবে বিবেচনা করে একে কাজে লাগানোর নামে অল্পস্বল্প গণতন্ত্র, বেশি উন্নয়নের কথাটি প্রচার করে, উল্টো পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত, বিপন্ন করেছে। গণতন্ত্র বিপন্ন ও বিপর্যস্ত করার ঘটনাটি এবারে ভয়াবহ হলেও এর শুরু মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বল্পকাল পরেই। এরপরে বছর কয়েক বাদে সব সময়ই একটি অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বাংলাদেশে চলছে।

রাজনৈতিক শূন্যতার পুনরুৎপাদন করা হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে। আর এটি করা হচ্ছে সব কিছুকেই অস্বীকার করার মধ্যদিয়ে। না বলার রাজনীতির কারণে বিদেশী হত্যাকাণ্ড, শিয়া সম্প্রদায়ের উপরে গ্রেনেড হামলা, খ্রিস্টান যাজককে হত্যার চেষ্টা এবং আগেপরে ব্লগার হত্যা ও হামলা, প্রকাশক হত্যা, হামলার ঘটনা ঘটছে। সরকার না বলার সংস্কৃতি যদি তৈরি না করতো এবং প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত কাজ যদি সম্পন্নের ব্যবস্থা করা হতো তাহলে প্রকৃত অপরাধী বেরিয়ে আসতো এবং একের পর এক ঘটনা ঘটতে পারতো না। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রহীন একনায়কতান্ত্রিক শাসকদের পক্ষ থেকে যখন ইচ্ছাকৃতভাবে এই শূন্যতার সৃষ্টি করা হয় তখন কোনো কিছুই আর বাদ থাকে না।

কোনো তদন্ত নেই, বিচার নেই বলে মানুষ ক্ষুব্ধ। ক্ষুব্ধতার মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, নিহত প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে বলতে হয় – ‘আমি কোনো বিচার চাই না’। এর মধ্যে ক্ষোভের মাত্রা যেমন আছে তার চেয়েও বেশি রয়েছে অসহায়ত্ব ও রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটিকে এক এবং এককের ইচ্ছা মতো করে পরিচালনা করার কারণে সৃষ্ট নানা দুর্যোগ।

রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করা হয়েছে একটি কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার জন্য। কিন্তু এ কথাটিও মনে রাখতে হবে যে, শূন্যতার পরিবেশ তৈরির কারণে সৃষ্টি হয় চরম ভারসাম্যহীনতার। এটা বিপজ্জনক। রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যদিয়ে সৃষ্ট ভারসাম্যহীনতা দূর করার উপায় সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ। এই পরিবেশ যদি সৃষ্টি করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতের পরিস্থিতি যে আরও সংকটাপন্ন হবে তার আলামত স্পষ্ট।

আর এ কারণেই বিচার চাই না বলে ক্ষোভ আর ঘৃণা প্রকাশ করে ক্ষান্ত থাকলে চলবে না। বিচার চাইতেই হবে। বিচার হতে হবে আমরা যারা এখনো বেচে আছি তাদের সকলের স্বার্থে। আর এই বিচার হতে হবে যারা দানব তাদের এবং সাথে সাথে দানব যারা সৃষ্টি করেছে ক্ষমতার স্বার্থে তাদেরও।।