Home » বিশেষ নিবন্ধ » আমরা বেশি উদ্বিগ্ন সরকারের আচরণে

আমরা বেশি উদ্বিগ্ন সরকারের আচরণে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis-2পর পর দু’জন বিদেশী নাগরিক হত্যা, তারপর ঈশ্বরদীতে বাঙ্গালী খ্রিস্টান যাজককে গলা কেটে হত্যা প্রচেষ্টা এবং সবশেষে শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলের জন্য সমবেত মানুষের উপর গ্রেনেড হামলা সব কিছু অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটে গেল। এই সকল ঘটনা আমাদেরকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। এর সাথে দেশীবিদেশী ষড়যন্ত্র থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমরা বেশি উদ্বিগ্ন সরকারের আচরণ দেখে এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি শুনে।

প্রথম দু’টি ঘটনা সম্ভবত একই সূত্রে গাথা। সম্ভবত কথাটা বলছি এই কারণে যে, পুরো তদন্ত না করে সকল তথ্য না যাচাই করে মন্তব্য করা সঠিক নয়। ঢাকার কূটনৈতিক পাড়া গুলশানে, যেখানে নিরাপত্তা সর্বাধিক থাকার কথা, সেখানে তিনজন মোটর সাইকেল আরোহী কতো সহজে ইতালীয় নাগরিক সিজারে তাভেল্লাকে গুলি করে পালিয়ে গেল এটা ভাবতেও অবাক লাগে। জাপানি নাগরিক কুনিও হোশীকেও প্রায় একইভাবে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় তিন মোটর সাইকেল আরোহী গুলি করে হত্যা করে। দুটি ঘটনার চিত্র প্রায় একই রকম। সম্ভবত মোটিভও এক। দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা। সরকার তাইই বলছে। এবং দোষ গিয়ে পড়ছে জামায়াত ও বিএনপির ঘাড়ে। জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক আলী আহসান মুজাহিদের এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাসির দন্ডাদেশ এখনো ঝুলে রয়েছে। এই অবস্থায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে তাদেরকে প্রাণে বাচানোর চেষ্টার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে এই সকল হত্যাকাণ্ড, এমনটা বলছে সরকার।

এই রকম সম্ভাবনাকে উড়িয়ে না দিয়েও বলা যায় যে, ন্যায় বিচার ও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সরকারের কর্তাব্যক্তি ও পুলিশের উচিত হচ্ছে, কোন অগ্রিম মন্তব্য না করা। কিন্তু আমরা দেখলাম ঠিক উল্টোটা। ঘটনা ঘটার অল্প পরেই প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীরা বলতে শুরু করলেন যে, এটা মাছেলের কাজ। লন্ডন থেকে ষড়যন্ত্রের গুটি চালা হচ্ছে। এমন কথা, বিশেষ করে উচ্চতর মহল থেকে যদি এমন কথা বলা হয়, তবে তা তদন্তকেই প্রভাবিত করবে। সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে কোনো কিছু বলা হলে তা আসলে নির্দেশরূপেই গণ্য হয়। এই প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক আইজি মহম্মদ হাদিসউদ্দিন এক সাক্ষাতকারে (২৩ অক্টোবর ২০১৫) যা বলেছেন, তা খুবই প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। কোন ঘটনার তদন্তের আগেই কারো কোনো বক্তব্য দেয়া ঠিক নয়। এতে করে ঘটনার তদন্তে ক্ষতি হওয়ার আশংকা থাকে। পুলিশের সঠিক কাজও তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পুলিশকে পুলিশের কাজ করতে দিতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কোনো ঘটনা ঘটার পর এমন কোনো স্থান থেকে ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য আসে, তখনই তদন্ত ও তদন্ত কর্মকর্তার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ নিয়ে বিব্রত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। সঠিকভাবে তদন্ত চললেও সেই তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। এমন ঘটনা অতীতেও বেশ কয়েকবারই ঘটেছে। বাংলাদেশ পুলিশে মেধাসম্পন্ন কর্মকর্তার অভাব নেই। কিন্তু এমন প্রভাব বা চাপের কারণে তারা কাজ করতে পারেন না। স্রোতের বাইরে গিয়ে বিরাগভাজন হতে চাইবেন না কোনো পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশের কাজেও মানুষ তখন আস্থা রাখতে পারে না’।

সাবেক পুলিশ প্রধান যে অভিযোগটি করেছেন, ঠিক সেটাই ঘটেছে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা তদন্তের ব্যাপারে। উচ্চতর মহলের হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ তিনি করেছেন, সেটা তার মতে অতীতেও বহুবার হয়েছে। অতীতের একটি উদাহরণ হলো ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার তদন্ত। তখন বিএনপিজামায়াতের সরকার ক্ষমতায়। আমরা দেখেছি, তখন বেচারা জজ মিয়াকে আসামি বানানো হলো। তদন্তের নামে প্রতারণা বা প্রহসনের এক ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু তদন্তের নামে প্রহসন, সুষ্ঠু তদন্তের বদলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার একই প্রয়াস এখনো এই আমলেও অব্যাহত আছে। ঘটনা ঘটার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব অপরাধীকে চিহ্নিত করলেন এবং সেটা আর কেউ নয়, তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। কয়েকদিন ধরে বেশ হৈ চৈ করে মিডিয়ায় বলা হলো, ইতালীয় নাগরিক হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী আসামিকে চিহ্নিত করা গেছে। তিনি হচ্ছেন বিএনপির ঢাকা মহানগরীর নেতা এম এ কাইয়ুম। ইদানীং হুকুমের আসামীর কথা প্রায়ই শোনা যায়। হুকুমের আসামী বলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কয়েকবার গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, মূল ধারায় রাজনীতিতে ভদ্র চেহারার যে দু’চারজন আছেন তার মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা আলমগীর একজন।

যাইহোক, হুকুমের আসামি খুজতে খুজতে শেষ পর্যন্ত লন্ডন পর্যন্ত গড়াবে কিনা জানি না। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, যে কাইয়ুমকে নিয়ে এতো হৈ চৈ (তিনি অবশ্য মালয়েশিয়ায় পলাতক ছিলেন, এখন লন্ডনে আছেন), দু’দিন পরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তার সম্বন্ধে ভিন্ন কথা বললেন। প্রথমে বলেছিলেন, এই সেই কাইয়ুম যিনি হচ্ছেন ‘বড়ভাই’ ‘হুকুমদাতা’। পরে একেবারে সুর পাল্টে বললেন (গত ২৮ অক্টোবর) ‘কাইয়ুমকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে’। হুকুমের আসামি আর সন্দেহের তালিকাভুক্ত দুটো কথার মধ্যে বিরাট ফারাক।

যে বিষয়ে আমরা সকলেই উদ্বিগ্ন, সেই বিষয়ে সরকার কতোটা চিন্তাগ্রস্ত, তদন্তের ব্যাপারে সত্যিকার কতোটা আগ্রহী তা নিয়ে তাই সন্দেহ জাগে। মনে হয়, সুষ্ঠু তদন্তের চেয়েও রাজনৈতিক চাল খেলতেই তারা আগ্রহী। সবকিছু নিয়ে রাজনীতি করতে নেই। বেশি চালাকিও করতে নেই। তা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে নিজের গায়েই লাগতে পারে।

হোসনি দালানের ঘটনাটি দুই বিদেশী হত্যার সাথে সম্পর্কিত নয়। স্পষ্টতই এটা ধর্মীয় সন্ত্রাসী গ্রুপের কাজ। শিয়াসুন্নীর বিরোধ আমাদের দেশে কখনো ছিল না। পাকিস্তানে ও মধ্যপ্রাচ্যে এই বিরোধ হিংসাত্মক রূপ নেয়। আইএস তো সরাসরি শিয়া বিরোধী। আমাদের দেশে শিয়ার সংখ্যাও নগন্য। এখানে আইএস বা তালেবানের বা আল কায়দার কমিটি আছে কিনা জানি না। তবে নিশ্চিতভাবে একই ভাবধারার ছোট ছোট সন্ত্রাসী গ্রুপ তৎপর রয়েছে। এ প্রসঙ্গেও সরকারের ভূমিকা বেশ রহস্যজনক। কখনো বলে সবকিছু ইসলামী জঙ্গীরা করছে এবং এই কথা বলে শেষ পর্যন্ত টার্গেট করে বিএনপিকে। এমনকি জামায়াতও তাদের টার্গেট নয়। জামায়াতকে ধরে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিকেই আসলে আঘাত করতে চায়। আর প্রায়শ বিএনপি সেই ফাদে পা দিয়ে আত্মহননের পথ নেয়।

অন্যদিকে সরকার ইদানীং জঙ্গীর অস্তিত্ব অস্বীকার করে চলেছে। এ কথা বলে সরকার কোন বিদেশী রাষ্ট্রকে খুশি করতে চায় তাও বোধগম্য নয়।

কোন সন্দেহ নেই যে, ধারাবাহিক মুক্তবুদ্ধির ব্লগার হত্যা, হোসনি দালানে গ্রেনেড বিস্ফোরণ, ঈশ্বরদীতে খ্রিস্টান যাজককে হত্যা প্রচেষ্টা এবং তার আগে উদিচির অনুষ্ঠানে, সিপিবি’র জনসভায়, রমনা বটমূলে, সিনেমা হলে, আদালতে বোমা হামলা সবটাই একই সূত্রে বাধা। এই ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কোন সমর্থন না থাকলেও তারা কিন্তু বিস্তার লাভ করছে। সরকারের দুর্নীতি, অপকর্ম, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি ও সর্বোপরি গণতন্ত্রহীনতা এই উগ্রবাদী প্রবণতাকে বৃদ্ধি করবে।

ধর্মীয় উগ্রবাদী তৎপরতা এবং দেশীবিদেশী ষড়যন্ত্র যাইই থাকুক, তাকে মোকাবেলা, নিশ্চিহ্ন ও পরাভূত করতে হলে রাষ্ট্রশাসনে যে নৈরাজ্যিক অবস্থা চলছে, যে স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী শাসন চলছে, তার অবসান করা দরকার। আর মন্ত্রী ও বড় নেতাদের বুঝেশুনে কথা বলা দরকার। সর্বোপরি গণতন্ত্রকে প্রসারিত করা দরকার। গণতন্ত্রই পারে সন্ত্রাসী তৎপরতা ও ষড়যন্ত্রকে পরাজিত করতে। কিন্তু সরকার কি সেভাবে ভাবছে?