Home » আন্তর্জাতিক » কোটি শিশু অনাহারে অথচ গরু রক্ষা

কোটি শিশু অনাহারে অথচ গরু রক্ষা

সনিয়া ফ্যালেরো

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Last-3ভারতীয় নেতারা এখন খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন, তারা নিজেদের নয়, অন্যদের কোরবানি করছেন। তাদের সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের শিশুরা আরো দুর্বল হয়ে যাবে বলে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে, অবশ্য শিশুরা এর মধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে অপুষ্টির শিকারদের তালিকায় রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সাবসাহারীয় আফ্রিকার চেয়ে দ্বিগুণ অপুষ্টির শিকার শিশু বাস করে ভারতে, সাবসাহারীয় আফ্রিকার চেয়ে ভারতে জন্ম নেওয়া শিশুরা প্রায়ই খর্বাকায় হয়ে থাকে। ইউনিসেফের মতে, গ্রামীণ ভারতের পাঁচের কম বয়সের ৫১ ভাগ শিশু বেঁটে। অথচ প্রতিবেশী চীনের পল্লী এলাকায় বেঁটে শিশুর সংখ্যা ১২ ভাগ। ক্ষুধার কারণে ভারতের শিশুরা কেবল খর্বাকায়ই হচ্ছে না, এটা তাদের বুদ্ধিমত্তাতেও প্রভাব ফেলছে।

অক্টোবরের প্রথম দিকে ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ আদিবাসী গ্রুপগুলোর অধ্যুষিত এলাকার বিনা বেতনের সরকারি নার্সারি স্কুলে দুপুরের খাবারে ডিম দেওয়ার ব্যবস্থা প্রবর্তনের একটি পাইলট প্রকল্প প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। প্রস্তাবটি করেছিলেন ওই রাজ্যের কর্মকর্তারাই। কিন্তু চৌহান এই যুক্তিতে প্রস্তাবটি বাতিল করে দিয়েছিলেন যে, ডিম হলো অনিরামিষ খাবার। অনেক হিন্দুর মতো চৌহানও নিরামিষভোজী। এসব মানুষের মতে, ডিম নিষিক্ত হয়ে থাকতে পারে, তারা একে জীবনী শক্তিসম্পন্ন বিবেচনা করে। তাই তাদের মতে ডিম খাওয়া ঠিক নয়। মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি প্রকাশ্যে বলতে অস্বীকার করলে তার প্রেস কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘এর চেয়েও পুষ্টিকর বিকল্প রয়েছে।’ কিন্তু সেটা ঠিক কী? তা তিনি বলেননি।

মধ্যপ্রদেশে অনেক গরিব সম্প্রদায় সরকারি ভর্তুকিপ্রাপ্ত শস্য এবং কুড়িয়ে আনা ফলমূললতাপাতা খেয়ে জীবন ধারণ করে। ভারতের গত ‘ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে’ অনুযায়ী রাজ্যটিতে অন্য যে কোনো গ্রুপের চেয়ে আদিবাসী শিশুরা সবচেয়ে বেশি অপুষ্টির শিকার। ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন জানিয়েছে, রাজ্যটির ছয় বছরের কম বয়সী ৫২ ভাগ শিশু (তারা সম্ভবত সরকারি নার্সারি স্কুলে যায়) কম ওজনের। অর্থনীতিবিদ জ্যাঁ ড্রেজের মতে, ভারতের গড় অবস্থার চেয়েও মধ্যপ্রদেশের অবস্থা অনেক খারাপ।

সরকারি স্কুলে ডিম খাওয়ানোর প্রস্তাবটি শিশু অধিকার কর্মীরা সমর্থন করেছেন এই যুক্তিতে যে, ১০ ভাগ ফ্যাট ও অতি উচ্চমানের প্রোটিনসমৃদ্ধ ডিমকে ‘সুপার ফুড’ও বলা চলে। বর্তমানে এক কাপ দুধ আর একটি কলা খাওয়ানোর যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তার চেয়ে ডিম থেকে অনেক বেশি পুষ্টি পাওয়া যেতে পারে। কলা খুব সহজে পচে যায়। আর ভারতে দুধে ভেজাল হিসেবে রং, ডিটারজেন্ট কিংবা শ্যাম্পুর মতো সামগ্রী মেশানো হয়। এই অপরাধটা এত বেশি যে ভারত সরকার দুধে ভেজাল মেশানোকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তিযোগ্য করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

মহারাষ্ট্র সরকার গরুর গোশত রাখা ও বিক্রি করা নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে গরিবদের ‘থালা’ থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাবার তুলে নিয়েছে। এই আদেশ অমান্যকারীর জন্য পাঁচ বছর কারাদণ্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হিন্দুরা গরুকে পবিত্র বিবেচনা করে। প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদি নির্বাচিত হওয়ার পর হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা সাহসী হয়ে গরুর প্রতি সহমর্মি হয়ে নয়, হিন্দুদের ওপর তাদের ধর্মবিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার জন্য বিষয়টি নিয়ে আগ্রাসী আচরণ করছে। যদিও এই প্রাণী প্রায়ই হাড্ডিসার হয়ে থাকে এবং আবর্জনা খেয়ে বাঁচে। গত মার্চে জারি হওয়া নিষেধাজ্ঞটি গরিবদের ওপর একটি বড় ধরনের আঘাত। ছাগল ও মুরগির চেয়ে গরুর গোশত সস্তা। নিম্ন বর্ণের দলিত এবং মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মতো সংখ্যালঘুদের গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনের উৎসও এটি।

মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাদনাবিস তার রাজ্যে ব্যাপক বিস্তৃত দারিদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন। এমনকি তিনি যে প্রাণীগুলোকে রক্ষার জন্য এ কাজ করছেন, সেগুলোর জন্যও অমানবিক। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, কৃষকরা বুঝতে পারছে না তারা মৃতপ্রায় গরু নিয়ে কী করবে। যেহেতু তারা এগুলো বিক্রি করতে বা জবাই করতে পারছে না, তাই তারা সেগুলোর দড়ি খুলে দিচ্ছে, যেখানে খুশি চলে যাওয়ার জন্য। অথচ গরুকে না খাইয়ে রাখাটাও অপবিত্র কাজ।

এ ধরনের সিদ্ধান্ত এই প্রথম নয়। সময়ের পরিক্রমায় ২৯টি ভারতীয় রাজ্যের মধ্যে অন্তত ২০টিতে গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অবশ্য, এগুলোর মধ্যে মহারাষ্ট্রের আইনটিই সবচেয়ে কঠোর। আর মাত্র ১০টি রাজ্যে সরকারি স্কুলের খাবার তালিকায় ডিম রয়েছে। ভারতীয়দের যখন কম নয় বরং আরো বেশি খাবার দরকার, তারা যতটুকু পুষ্টি পাচ্ছে, প্রয়োজন এর চেয়ে বেশি বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে, তখন এসব সিদ্ধান্ত আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থকেরা এসব বাজে সিদ্ধান্তের দায় জৈন ধর্মবিশ্বাসীদের, এটাও সত্যি যে এই ধর্মাবলম্বীরা গরুর গোশত নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়নে সম্পৃক্ত ছিল, ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করছেন।

জৈনরা কঠোরভাবে নিরামিষভোজী। তারা এমন কোনো খাবার গ্রহণ করে না যেটার সাথে কোনো জীবন্ত প্রাণীর আহত হওয়া বা মৃত্যু নির্ভর করে। তারা মাছ বা গোশত কোনোটাই খায় না, ডিমও তারা এড়িয়ে যায়।

কিন্তু সবচেয়ে কট্টর জৈনকেও বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে শিশুদের ডিম খাওয়ানো নিষিদ্ধ করার জন্য দোষী করা যায় না।

একইভাবে একটি গ্রুপের দাবির কারণে গরুর গোশত নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এমন দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। সেপ্টেম্বরে বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ (নিরামিষভোজী) বলেছেন, ‘যেখানেই বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, সেখানেই গরুর গোশত নিষিদ্ধ হবে।’

বিজেপি শিশুদের ডিম না খাওয়ানোর ব্যাপারে অটল থাকলেও বর্তমানে প্রতিটি নার্সারিতেই কিন্তু নিরামিষের বিকল্প রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এই যেমন এক কাপ দুধ বা একটা ফল। কোনো শিশুকেই তার ধর্মবিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু খেতে বাধ্য করা যাবে না। কিন্তু এখন অন্যদের ধর্মবিশ্বাসের কারণে সব শিশুকেই নির্দিষ্ট খাবার থেকে বঞ্চিত করা হবে।

ভারতে আপনার পরিচিতি নির্ভর করবে আপনার খাবারের ওপর, আর উচ্চবর্ণের অনেক হিন্দুর সাধারণ বৈশিষ্ট হলো নিরামিষ ভোজন। অনেকে তাদের মর্যাদার পরিচিতি হিসেবে তাদের খাদ্য তালিকাকে ব্যবহার করে। অনেকে তাদের আশপাশের মানুষজনকে, শিশু এবং বাড়ির কর্মী, তাদের রান্নাঘরের বিশুদ্ধতা বজায় রেখে খাওয়ার শর্ত চাপিয়ে দেয়। ছোঁয়া লাগার আশঙ্কায় তারা যেসব রেস্তোরাঁয় অনিরামিষ খাবার রয়েছে, সেখানে যায় না।

সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদেরা বঞ্চিত মানুষজনের (যারা তাদের ধর্মে বিশ্বাসী নয় এবং সস্তায় পাওয়া প্রোটিন গ্রহণ না করার বিলাসিতা করতে পারেন না) ওপর তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিচ্ছেন। রাজনীতিতে ধর্ম ও বর্ণ ঢুকিয়ে বিজেপি পশ্চাদপদতা কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপকে রুখে দিচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বরে এক বক্তৃতায় মোদি বলেছিলেন, ‘প্রত্যয় যদি দৃঢ় হয়, তবে আমি বিশ্বাস করি যে এই দেশের তরুণ ও শিশুদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি ও প্রতিভা রয়েছে।’ কিন্তু ভারতের অনেক শিশুই শক্তিশালী নয়, আর এর মূল কারণ রাজনীতিবিদেরা তাদের মৌলিক পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করছেন। আর এই প্রক্রিয়ায় ভারত বিপুল মানবমূলধন হারাচ্ছে, বিপুল সম্পদকে বোকার মতো দায়ে পরিণত করছে।

যদি মোদির লক্ষ্য হয় ভারতকে এগিয়ে নেওয়ার, তবে তাকে অবশ্যই তার দলের অগ্রাধিকার নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে, নীতি নির্ধারণে ধর্মকে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। এটা খুবই সাদামাটা বিষয় : বিজেপি সরকার শিশুদের হয় খাওয়াবে কিংবা দেশের ভবিষ্যত নষ্ট করবে।’

লেখক :: ‘বিউটিফুল থিঙ : ইনসাইড দ্য সিক্রেট ওয়ার্ল্ড অব বোম্বাই’স ড্যান্স বারস’এর রচয়িতা।

(নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে)