Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩২)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩২)

রাজনৈতিক সংগ্রামে অর্থনৈতিক অগ্রগতি

আনু মুহাম্মদ

Last-4সাংস্কৃতিক বিপ্লবে কৃষক শ্রমিকদের অংশগ্রহণ যতো বাড়তে থাকে ততোই এর নানামুখী বিচ্যুতি কমতে থাকে। কেননা কৃষক শ্রমিকদের বিভিন্ন ইউনিট বা সাংগঠনিক কাঠামো নির্বিচার বাড়াবাড়ির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করতে বেশি আগ্রহী ছিলো। তাঁদের প্রয়োজন ছিলো উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি নিজেদের বিপ্লবী সম্পর্কের বিষয়ে যথাযথ দৃষ্টি দেয়া। অনাবশ্যক বা ইচ্ছামতো কাউকে আঘাত করা বা তোয়াজমুখি তৎপরতার সময় বা মনোভঙ্গী তাদের মধ্যে কমই দেখা গেছে।

উচ্চলম্ফ এবং সাংস্কতিক বিপ্লবে যে উথাল পাথাল হয়, কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা বিন্যাসে যেরকম পরিবর্তন বা টানাপোড়েন দেখা যায় তাতে অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে অবনতি দেখা দেবার কথা। কিন্তু তা ঘটেনি বরং অনেকক্ষেত্রে তা যে সহায়ক হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন তথ্য থেকে। ভারতের অনীক পত্রিকার সম্পাদক লেখক ও গবেষক দীপংকর চক্রবর্তী বিভিন্ন তথপ্রমাণ ঘেঁটে ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনামূলক আলোচনা করেছিলেন। তিনি পিকিং রিভিউ, জার্ণাল অব কনটেমপোরারী এশিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্ট এবং তার সাথে নিকোলাস ব্রুণার, এডগার স্নো, ফেলিক্স গ্রীণের গ্রন্থ পর্যালোচনা করে এই তুলনামূলক চিত্রটি হাজির করেছিলেন। সময়কাল ধরা হয়েছিলো ১৯৫০৫১ থেকে ১৯৭০৭১। দেখিয়েছেন, এই বিশ বছরে ভারতে জাতীয় আয় বেড়েছে শতকরা ৪১ ভাগ, চীনে ৬ গুণ; শিল্প উৎপাদন ভারতে বেড়েছে ২ গুণ, চীনে ২০ গুণ; কৃষি উৎপাদনে ভারতে শতকরা ৮২ ভাগ, চীনে ২.৫ গুণ; রেলপথ ভারতে বেড়েছে শতকরা ২০ ভাগ, চীনে ৪ গুণ; বিদ্যুৎ শক্তি ভারতে বেড়েছে ৯ গুণ, চীনে ৩০ গুণ।

চীনের সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুবই মনোযোগী বিশ্লেষকদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত আরেকটি গ্রন্থে আরও সতর্কতার সাথে অর্থনৈতিক অগ্রগতির হিসাব ও পরিস্থিতির পর্যালোচনা করা হয়েছে। গ্রন্থের সম্পাদকমণ্ডলী প্রথমেই বলেছেন, ‘সমাজতন্ত্রে উত্তরণের প্রাথমিক স্তরে (চীনের কমিউনিস্ট) পার্টি দুটো কাজকে গুরুত্ব দিয়েছে বেশি। এগুলো হল: () দারিদ্র ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা থেকে মুক্তির জন্য শিল্পায়নকে ভিত্তি করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন; এবং () দীর্গমেয়াদে উৎপাদন উপায়ের ওপর ব্যক্তি মালিকানা থেকে যৌথ ও রাষ্ট্রীয় দুভাবেই সমাজতান্ত্রিক মালিকানায় উত্তরণ।’

এই গ্রন্থে প্রদত্ত হিসাব অনুসারে ১৯৫২ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত শিল্প উৎপাদন বেড়েছে গড়ে শতকরা ১১ ভাগ হারে। সেই তুলনায় খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়েছে কম হারে যদিও তা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় বেশি ছিলো। কৃষিখাতে সেই সময় শুধু মালিকানায় পরিবর্তন আসেনি, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং অবকাঠামোগত পরিবর্তনও হয়েছে বিস্তর। কৃষির সাথে সম্পর্কিত ছিলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ ব্যবস্থাপনা। বলাহয়, চীনের কৃষিতে ভুমি উন্নয়ন, সেচ,পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির মধ্য এই সময়কালে নতুন প্রায় ১০ কোটি বাড়তি কর্মসংস্থান হয়। ১৯৫০ দশকে দামস্তর মোটামুটি স্থিতিশীল ছিলো। ৬০ দশকের প্রথমদিকে এই দামস্তরের কিছুটা বৃদ্ধি ঘটে, তবে ৭০ দশকের মাঝামাঝি তা আবার স্থিতিশীল হয়। গ্রন্থকারদের মতে, এই সময়কালে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে যে মাত্রায় অগ্রগতি হয়েছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি সেই তুলনায় কম হয়েছে।

গ্রন্থভুক্ত একটি প্রবন্ধে ভিক্টর লিপ্পিট দেখিয়েছেন, সমাজতন্ত্রে উত্তরণে অগ্রগতি নির্ভর করে কতটা সাফল্যের সঙ্গে সমাজের পুরনো দ্বন্দ্ব নিরসন করা যায়। এগুলোর মধ্যে আছে প্রত্যক্ষ উৎপাদকদের সঙ্গে সমাজের দ্বন্দ্ব, সামাজিক চেতনা বিকাশের সঙ্গে সমাজের বিদ্যমান বিন্যাসের দ্বন্দ্ব, জনগণের সাথে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব। তিনি এইসাথে আশংকা প্রকাশ করেছিলেন যে, এসব দ্বন্দ্ব যথাযথভাবে নিরসন না হলে পার্টি ক্যাডার ও আমলাদের মধ্য থেকে একটি নতুন ক্ষমতাবান শ্রেণীর উদ্ভব ঘটা খুবই সম্ভব। যার ফলে ‘() এরা অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করবে, প্রত্যক্ষ উৎপাদকদের সাথে তাদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব বাড়বে। () নিজেদের জীবন ও তৎপরতার ওপর শ্রমজীবী মানুষের নিয়ন্ত্রণ কমবে। এবং () প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেও নতুন শ্রেণী ক্ষমতা তৈরি হবে।’ এই আশংকা যে খুবই সঠিক ছিলো তা পরে প্রমাণিত হয়েছে।

সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলাকালীন সময়ই মাও সেতুং বলেন, ‘বর্তমান মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লব এই ধরনে এটাই প্রথম। ভবিষ্যতে এরকম আরও বহু সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজন হবে। কে বিজয় লাভ করবে, সমাজতন্ত্র না পুঁজিবাদ, তার নিষ্পত্তির জন্য দীর্ঘ ঐতিহাসিক পর্বের প্রয়োজন হবে। এই সংগ্রাম যদি সফলভাবে পরিচালনা করা না যায়, তাহলে পুঁজিবাদের পুনরুত্থান সবসময়ই একটি সম্ভাবনা হিসেবে জাগরুক থাকবে।’ বলাই বাহুল্য, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পর ৭০ দশকেই আমরা চীনে ভিন্নমুখি যাত্রার সূচনা দেখতে থাকলাম।।

(চলবে…)

তথ্যসূত্র

১। দীপংকর চক্রবর্তীর নির্বাচিত রচনা, ‘ভারত ও চীন দুই দেশ দুই অর্থনীতি দুই পথ’ (প্রথম প্রকাশ অনীক, ফেব্রুয়ারি ১৯৮২), , প্রথম খণ্ড, পিপলস বুক সোসাইটি, কলকাতা, ২০১৪। পৃ. ১৫৮

২। Mark Selden and Victor Lippit (ed): The Transition to Socialism in China, NY, 1982