Home » শিল্প-সংস্কৃতি » জেমস বন্ড-এর সেকাল-একাল (পর্ব – ১)

জেমস বন্ড-এর সেকাল-একাল (পর্ব – ১)

ফ্লোরা সরকার

Last-6১৯৫৩ সালে প্রথম যখন জেমস্ বন্ড নিয়ে লেখা শুরু করি, তখন বন্ডকে আমি প্রচণ্ড রকমের একজন বোকাসোকা, অগভীর বা আকর্ষনহীন একজন নায়কের চরিত্র হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম একজন ভোঁতা বা স্থুল বুদ্ধিসম্পন্ন নায়কের চরিত্র দাঁড় করাতে। যখন এই প্রধান চরিত্রের (জেমস্ বন্ড) নাম খুঁজছিলাম, সত্যি বলছি, এই নামটা (জেমস্ বন্ড) আমার কাছে সব থেকে স্থুলতম নাম মনে হয়েছিলো’ ইয়ান ফ্লেমিং, দ্য নিউ ইয়র্কার, ২১ এপ্রিল, ১৯৬৩। জেমস্ বন্ড সিরিজের আদি এবং মূল লেখক ইয়ান ফ্লেমিং, দ্য নিউ ইয়র্কারকে ঠিক এভাবেই কথাগুলো বলেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি চেয়েছিলেন, তার নায়ক হবে সরকারে নিয়োজিত এমনই এক চরিত্রের মানুষ, সরকারি কর্মকাণ্ডের চারপাশে নানা অঘটন ঘটলেও তিনি থাকবেন নির্বিকার চিত্ত হয়ে, একজন ছদ্মনামা বা নামহীন হয়ে। কিন্তু নামটি পরবর্তীতে এমন পৃথিবী বিখ্যাত হয়ে যাবে, লেখক নিজেও তা কল্পনা করেননি।

জেমস্ বন্ড পরবর্তীতে জনপ্রিয় নায়ক, দঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের একজন প্রতীমা বা আইকন, সুপুরুষ হবার জন্যে পুরুষদের গুরু, মোহিনী মায়ার প্রতীক, সুন্দরী নারীদের স্বপ্নপুরুষ আর সাধারু নারীদের স্বপ্নভঙ্গের পুরুষ, কনসুমারিজম বা পণ্যায়িত দুনিয়ার চ্যাম্পিয়ান এবং সর্বোপরি তার যৌন আবেদন এবং ভায়োলেন্সের জন্যে তাকে ‘মি.কিস কিস, ব্যাঙ্গ ব্যাঙ্গ’ নামে অভিহিত করা হয়। নারীপুরুষ সবাই তার জন্যে পাগল, এক কথায় দিওয়ানা ! তার সমালোচকেরা তাকে রেসিস্ট, যৌন আবেদনময়ী এবং ডাকাত হিসেবে অভিহিত করে। অন্যদিকে, তার ভক্তরা তাকে দেখে একজন সংস্কৃতিবান, সম্মোহনী এবং বোধবুদ্ধিসম্পন্ন নায়ক হিসেবে। তিনি ০০৭ এর এজেন্ট, যার আইনগত অধিকার আছে খুন করার। তার ছবি মুক্তি পেলেই দলে দলে ছুটে যায় ভক্তরা। তিনি শুধু ছবির পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকেন না, হাজির হন রেডিও, টেলিভিশান আর কার্টুনেও। আলোচনার জন্যে শুধু প্রবন্ধের মাঝেই তিনি সীমাবদ্ধ থাকেন না, তাকে কেন্দ্র করে লেখা হয় বইপত্র। জেমস্ বন্ড সিরিজের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ‘স্পেকটার’ অর্বিভূত হবার পর, নতুন করে আবার নানা সমালোচনা, কথন, অতিকথনের এক ছড়াছড়ি পড়ে গেছে মুভি রিভিউগুলোতে। জেমস্ বন্ডের জানাঅজানা কাহিনী উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। জেমস্ বন্ডের ভক্তরা ছাড়াও সবাই যেন বেশ উৎসুক হয়ে উঠেছে জেমস বন্ড সম্পর্কে আরো গভীর করে জানতে। আমাদের আজকের লেখা জেমস্ বন্ডের সেসব কথন এবং অতিকথন নিয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়েই ইয়ান ফ্লেমিং তার এক বন্ধুকে বলেছিলেন, তিনি একটি গোয়েন্দা উপন্যাস লিখতে চান। কিন্তু সেই উপাখ্যান লেখা শুরু হয় ১৯৫২ সালে, যখন তিনি তার অন্তঃসত্ত্বা বান্ধবীকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। তার অভিজ্ঞতা এবং কল্পনার রং মিশিয়ে ১৯৫২র ১৭ ফেব্রুয়ারির এক সকালে জ্যামাইকায় বসে লিখতে শুরু করেন তার প্রথম উপন্যাস ‘ক্যাসিনো রয়াল’। এক মাসের মধ্যে অর্থাৎ ১৮ মার্চ, ১৯৫২তে লিখে শেষ করে ফেলেন ২ হাজার শব্দের তার এই প্রথম উপন্যাসটি। এরপর একে একে লিখে শেষ করেন বন্ড সিরিজের আরো বারটি উপন্যাস এবং দুটো গল্প, ১২ আগস্ট, ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত, যখন তার মৃত্যু হয়। তার শেষ দুটো উপন্যাস ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন গান’ এবং ‘অক্টোপুসি অ্যান্ড দ্য লিভিং ডেলাই’ তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। তার মৃত্যুর পর, বন্ড সিরিজের লেখা থেমে থাকেনি। জন গার্ডনার (বন্ড সিরিজের ১৪টা উপন্যাস), রেমন্ড বেনসন (বন্ড সিরিজের ৬টা উপন্যাস) সহ লিখেছেন কিংসলে এমিস, সেবাস্টিয়ান ফোকস, জেফেরি ডেফার এবং উইলিয়াম বয়েডের মতো লেখকেরা। উপন্যাসগুলোকে কেন্দ্র করে এই পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে ২৪টি চলচ্চিত্র এবং পৃথিবী বিখ্যাত সাতজন অভিনেতা প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। প্রায় প্রত্যেকটা নায়ক ‘মহানায়ক’ এর আইকন হয়ে গেছেন ধীরে ধীরে।

কাহিনী নির্ভর বন্ড সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র জেমস্ বন্ড একটা সিক্রেট সার্ভিসের বুদ্ধিমান অফিসার। যার কোড নম্বর ০০৭ এবং যিনি একজন নেভাল রিজার্ভ কমান্ডার। যে কমান্ডারের অনুপ্রেরুা লেখক ইয়ান ফ্লেমিং পেয়েছিলেন, বুলডগ ড্রুমন্ডের গল্পের সিরিজের লেফটেন্যান্ট কর্নেল হারম্যান সিরিল ম্যাকনেইল থেকে এবং রিচার্ড হ্যানির গল্পের সিরিজের জন বুচম্যান চরিত্র থেকে। ফ্লেমিংএর কৃতিত্ব তিনি এই দুই চরিত্রের মিশেলে এক অসাধারু চরিত্র ‘জেমস্ বন্ড’ নির্মাণ করেছিলেন। যিনি শুধু দুর্ধর্ষ কর্মকাণ্ড করেই বেড়ান না, ভালোবাসেন গাড়ি, নারী, খাবার আর পানীয়। ‘জেমস্ বন্ড’ নামটিও তিনি সংগ্রহ করেছিলেন, একজন আমেরিকান পাখি বিশারদ বাস্তব জেমস্ বন্ডের নাম থেকে। প্রথম দেখাতেই তিনি বন্ড দম্পতিকে দারুণ পছন্দ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘চমৎকার এক দম্পতি যারা শুধু নিজেদের আনন্দে ভরিয়ে রাখেন।’ তার ০০৭ কোডটিও একটা জার্মান ডিপ্লোম্যাটিক কোড থেকে নেয়া, যে কোড প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের হাতে এসেছিলো, ‘জিমারম্যান টেলিগ্রাম’ এর মাধ্যমে, যার নম্বর ছিলো ০০৭৫ এবং যে কোডের কারণে পরবর্তীতে আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যায় বলে মনে করা হয়। সম্ভবত পরবর্তীতে শেষের ৫ সংখ্যাটি বাদ দিয়ে শুধু ০০৭ রাখেন। তাছাড়া, ৭ সংখ্যাটি ইংরেজিতে একটা শুভ সংখ্যা হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইয়ান ফ্লেমিংএর প্রথম ছবি ‘ড: নো’ হলেও, শুরুতে সেই ছবি দিয়ে বন্ড সিরিজের চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হবার কথা ছিলোনা। প্রথম ছবি নিয়ে কি হয়েছিলো, কেনো হয়েছিলো এবং বন্ড সিরিজের আরো কথনঅতিকথন নিয়ে আমরা পরবর্তী সংখ্যায় নিয়ে আসবো।।

(চলবে…)

১টি মন্তব্য