Home » আন্তর্জাতিক » ভারতের অবরোধে নেপালি নতুন প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ

ভারতের অবরোধে নেপালি নতুন প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ

ইকোনোমিস্ট থেকে অনুবাদ আসিফ হাসান

Last-1সাধারণত ধোঁয়াশায় আবছা থাকলেও কাঠমান্ডুর আকাশ এখন বিস্ময়করভাবে পরিষ্কার। ভারত সীমন্তে নেপালের ওপর আরোপিত কয়েক সপ্তাহের অবরোধের ফলে দেশটির রাজধানী জ্বালানি সঙ্কটে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আরো অনেক কিছুর মতো তেল ও গ্যাসের জন্যও নেপাল তার দক্ষিণের বৃহৎ প্রতিবেশীর ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল। রাজধানীতে গাড়ি আর লরিগুলো অলস দাঁড়িয়ে আছে। হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে রান্নার গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। তরুণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের বাচ্চাদের ডায়াপার কিনতে পারছে না। এই সময় কাঠমান্ডু শক্তির দেবী দুর্গার সম্মানে বৃহত্তম হিন্দু ধর্মীয় দশাইন উৎসবে আলো ঝলমলে থাকার কথা। অথচ নিকষ কালো অন্ধকারে ছেয়ে আছে সব কিছু। এমন এক সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতেই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ খড়গ প্রসাদ শর্মা অলি ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। 

দীর্ঘ বিতর্কের পর নতুন সংবিধান নিয়ে কাঠমান্ডুতে যখন নতুন সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ভারতের সাথে নেপালের প্রধান সীমান্ত ক্রসিং বীরগঞ্জের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় বিক্ষোভকারীরা দুই দেশের মধ্যকার নোম্যান্স ল্যান্ড দখল করে আছে। তাদের অবস্থানকে অজুহাত ধরেই ভারত সীমান্তের একদিকে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার লরিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না। বিক্ষোভকারীরা মোটামুটিভাবে নেপালি সমাজের নিম্ন সমাজের জনগোষ্ঠী। থারু ও মদেশী জাতিভূক্ত এসব মানুষ নেপালের দীর্ঘ দক্ষিণ সীমান্তের নিচু ভূমি তেরাই অঞ্চলে বাস করে। বিশেষ করে মদেশীদের সাথে ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশের ভারতীয়দের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তেরাই অঞ্চলের মানুষজন মনে করে, কাঠমান্ডুতে অবস্থানকারী নেপালের উচ্চবর্ণের অভিজাতরা তাদেরকে কোনঠাসা করে রেখেছে। বীরগঞ্জে ভারতের প্রত্যক্ষ মদতে তারা তাদের কণ্ঠ পেয়েছে বলে তারা মনে করছে। প্রতিদিন তারা ঢোল বাজাতে বাজাতে মিছিল করে। অনেক সময় তাদের মিছিলের সামনে থাকে একটা হাতি।

কয়েক সপ্তাহ আগে তেরাই অঞ্চলে মারাত্মক সহিংসতা হয়েছে। সংবিধান (১৯৫০ সাল থেকে এটা সপ্তম) প্রণয়নের কাজে যে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা অপ্রত্যাশিতভাবে অতি দ্রুত সমাপ্ত হওয়ায় বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। ২০০৬ সালে নেপালের দীর্ঘ মাওবাদী বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধ অবসানকারী শান্তিচুক্তিতে নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছিল। দেশটির প্রথম নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ গ্রহণযোগ্য খসড়া প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ২০১৩ সালে গঠিত দ্বিতীয় পরিষদ সামান্য অগ্রগতি হাসিল করেছিল। কিন্তু এপ্রিলের ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পের পর রাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট ও মাওবাদীসহ চারটি প্রধান দল তাদের নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের অংশ হিসেবে দ্রুত সংবিধান বলবতে নজর দেয়।

উচ্চবর্ণগুলোর মধ্যে সম্পর্ক নিবিড় হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে তেরাই অঞ্চলের মানুষজন মনে করছে, তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, নতুন রাষ্ট্রের সীমায় তাদেরকে তার চেয়ে অনেক কম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সব রাষ্ট্রীয় সংস্থায় সবার অংশগ্রহণমূলক সংবিধান দাবি করছে। গত আগস্টে সৃষ্ট ভয়াবহ সহিংসতায় আট পুলিশ নিহত হয়, পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী এর নির্মম জবাব দেয়। ৪০ জনের বেশি মারা যায়। কিন্তু তারপরও ২০ সেপ্টেম্বর সংবিধান গৃহীত হয়।

বীরগঞ্জের বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছে, সরকার তাদের সাথে সমান নাগরিক হিসেবে আচরণ না করা পর্যন্ত তারা বিক্ষোভ অব্যাহত রাখবে। নেপালে আর যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে চাইলে সংবিধানে সংশোধন আনতেই হবে। সংবিধান কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে নেপালকে নির্দেশনা প্রদান এবং তার কথা শোনা না হলে সীমান্ত অবরোধ করতে উৎসাহিত করার ভারতের দাদাগিরিতে নেপালি রাজনীতিবিদেরা অসন্তুষ্ট। কিন্তু তবুও নেপালের এখন ভারতের সাহায্য বড্ড প্রয়োজন।

১৯ অক্টোবর নেপালের উপপ্রধানমন্ত্রী কমল থাপা দিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাত করেন। মোদির প্রতিক্রিয়া তেরাই অঞ্চলের মানুষজনের সাথে বিবাদ মিটিয়ে ফেলো, এবং আন্তঃসীমান্ত সরবরাহ আবার শুরু হতে পারে, এমন প্রস্তাব কাঠমান্ডুতে ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়েছে, ভারতের নমনীয়তা প্রকাশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। যদিও তা দিয়ে বিপরীত বিষয়টিই বোঝানো হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের বাধা নেই, এমন অঞ্চল দিয়ে অপেক্ষমাণ লরিগুলো নেপালে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মোদি। তবে শীতের বরফ দ্রুত নেমে আসছে, ফলে অবরোধজনিত কষ্ট আরো বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নেপালের অনেকেই দোষ দেবে ভারতকে। তবে মোদির অবস্থান অনেক নেপালি পর্যবেক্ষকের সমর্থন লাভ করেছে, একইসাথে তিনি ভারতের সমর্থনপুষ্ট তেরাই অঞ্চলের নায়ক হিসেবেও সমাদৃত হয়েছেন। কাঠমান্ডুর অনেক রাজনীতিবিদ ‘চীনা’ কার্ড খেলার ব্যাপারে আগ্রহী। তাদের মতে উত্তরের প্রতিবেশী দেশটি নেপালের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে চায় অনেক বেশি। কিন্তু নেপাল বিষয়ক একটি সাম্প্রতিক বইয়ের লেখক প্রশান্ত ঝার মতে, চীন সামান্যই সহায়তা করতে পারে। ভারতের সাথে নেপালের সম্পর্কের যে গভীরতা রয়েছে, সেটা ডিঙানো চীনের পক্ষে সহজ নয়। তিব্বত মালভূমি দিয়ে নেপালে বিপুল পরিমাণে তেল পাঠানো বিরাট চ্যালেঞ্জ। তার ওপর ভূমিকম্পে চীন সীমান্ত থেকে কাঠমান্ডু যাওয়ার প্রধান রাস্তাটি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।

এসব কারণে ছাড় দিতে ওলির ওপর চাপ বাড়বে। তিনি আপত্তি তুলবেন : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি সংবিধান প্রণয়নপ্রক্রিয়ায় মদেশী ও থারুদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেওয়ার বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। নেপালকে আসন্ন শীতের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে চাইলে তাকে জিহ্বায় কেবল কামড় দেওয়ার কাজটুকু করলেই চলবে না, তাকে আরো অনেক কিছু করতে হবে।।