Home » প্রচ্ছদ কথা » গণতন্ত্রই জঙ্গীবাদ প্রতিরোধের গ্যারান্টি

গণতন্ত্রই জঙ্গীবাদ প্রতিরোধের গ্যারান্টি

আমীর খসরু

Coverদুনিয়ার বড় বড় সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশের খবরাখবর যখন ছাপা হয়, তার মধ্যে ইতিবাচক বা পজিটিভ খবরাখবরের সংখ্যা নিতান্তই নগন্য। বাংলাদেশ অধিকাংশ সময়ে খবর হয় দৈব্যদুর্বিপাক, কোনো বিপর্যয় বা খারাপ খবরের জন্য। আগে ঝড়জলোচ্ছ্বাস, বন্যাসহ এ জাতীয় বিপর্যয়ের খবরই ছাপা হতো, তবে গেল কিছুদিন ধরে এর সাথে যুক্ত হয়ে যে খবরাখবর এবং বিশ্লেষণ প্রকাশিত হচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাপারে তা জঙ্গীবাদের উত্থান সম্পর্কিত বিষয়াবলী নিয়ে। এ নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশীরা কতোটা অস্বস্তিতে আছেন, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। আর ভাবমূর্তিগত সঙ্কটেরই বা কি হাল হয়েছে তাও বোধ করি বোঝা যাচ্ছে। বাংলাদেশে আইএস বা আল কায়েদার ভারতীয় শাখার অস্তিত্ব আছে কি নেই এ প্রশ্নটিই হরহামেশা উঠছে।

তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানটি পুরোপুরিভাবে ভিন্ন। তারা যতো জোরে বলা যায় ততো জোরেই বলছে যে, দেশে আইএস বা আল কায়েদার ভারতীয় শাখার কোনোই অস্তিত্ব নেই। একের পর এক ব্লগার হত্যার সময় এ কথা বলা হয়েছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর ক্ষেত্রেও সরকারের বয়ান একই। একটি ঘটনা ঘটে তখন যে কথা বলা হয়, পরে যখন আবার আরেকটি ঘটনা ঘটে তখন আগের বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি করা হয়। এ কারণেই গণজাগরণ মঞ্চসহ অনেকের পক্ষ থেকেই এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হচ্ছে যে, এর পরে কে? এর মধ্যে আতঙ্ক যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত।

সরকার বরাবরই বলছে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথা। এতোদিন ইনিয়েবিনিয়ে বললেও প্রধানমন্ত্রী রোববার যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তাতে স্পষ্টভাষায় বলে দিয়েছেন ষড়যন্ত্রটি কতো বিশাল এবং বড় মাপের। তিনি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিয়ে যা বলেছেন তার মোদ্দা কথা হচ্ছে, ‘আইএসএর কথা স্বীকার করিয়ে নিতে পারলে তারা বাংলাদেশের উপর হামলে পড়তে পারে’। এই ‘তারা’ তা যে আন্তর্জাতিক কোনো কোনো শক্তি এবং ইঙ্গিতটি তাদের প্রতিই করা হয়েছে তা সহজেই বোঝা যায়। আর কাদের কথা বলতে চেয়েছেন তাও মোটামুটি স্পষ্ট। এই অনুমান যদি সত্যি হয় তাহলে ঘটনা গুরুতর। তাহলে এই শক্তির বিরুদ্ধে কি প্রধানমন্ত্রী দেশে আইএস বা আল কায়েদার অস্তিত্ব নেই বলে প্রতিরোধ ঘোষণা করেছেন? তাছাড়া সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘চক্রান্তকারীদের বহু পরিকল্পনা আছে। তারা আরও বেশি দূর যেতে চায়’।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, একের পর এক যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা কি সব ওই আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ? দেশের জঙ্গী বা এমন কোনো শক্তির আসলে কি অস্তিত্ব নেই? যদি চক্রান্তের ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ না থাকে এবং তথ্যপ্রমাণাদি থেকে থাকে তাহলে কেন এই চক্রান্ত প্রতিহত করা হচ্ছে না ও কেনই বা এমন একটি গুরুতর বিষয়কে অভিযোগ হিসেবেই শুধু প্রচার করা হচ্ছে?

একটি বিষয় বলতেই হবে জঙ্গীবাদের উত্থান নিয়ে সরকার যে অবস্থান গ্রহণ করেছে তা কতোটা বাস্তবসম্মত সে বিষয়টিও পুনরায় ভেবে দেখতে হবে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক চক্রান্তের যে গুরুত্বর অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী করেছেন তা তিনি কি এককভাবে সামাল দিতে চাচ্ছেন? যদি তাই হয় তাহলে বলতেই হবে সরকার ভুল পথে আগাচ্ছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সবার আগে যা প্রয়োজন তা হচ্ছে সবাইকে সাথে নিয়ে সমবেত ও ঐক্যবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা। এ কারণেই সংলাপের প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ফরেইন পলিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক লিসা কার্টিজ গত ৭ নভেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে সংলাপ অনুষ্ঠানের উপর তাগিদ দিয়েছেন। অন্যান্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদেরও মনোভাব তাই।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সরাসরি সংলাপের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। তার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, এই নাকচের কারণ সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক। এ জন্য তিনি তার ওই বক্তব্যের রাজনৈতিক পটভূমি এবং কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তাদের পক্ষের নিজস্ব বয়ান। এটা বক্তব্যে যাদের বিশ্বাস নেই তাদেরও একটি দৃষ্টিভঙ্গি এবং বক্তব্য আছে। সে প্রসঙ্গে আলোচনা করা এ মুহূর্তে সমীচিন হবে বলে মনে করি না।

তবে কোনো একটি দেশে গণতন্ত্র সচল রয়েছে কিনা তার যে মাপকাঠি আছে তাতে একটি বিষয় হচ্ছে সংঘাতসহিংসতার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ দমন নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রসঙ্গই যদি উল্লেখ করা হয় তাহলে দেখা যায় যে, কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় বা ঘটনা ঘটলে, সাথে সাথে শুধু প্রধান বিরোধী দলই নয়, অপরাপর দলকে নিয়ে সংলাপের আয়োজন করা হয় জাতীয় স্বার্থে। আর এটি করে থাকে ক্ষমতাসীন সরকার। এটাই হচ্ছে সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কিন্তু এ দেশে চলে ঠিক তার উল্টো। এর বিপদটি হচ্ছে, সব কিছুকে ‘না বলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ (পলিটিক্স অফ ডিনায়েল) শুধুমাত্র ওই সংশ্লিষ্ট সরকার বা দলের ক্ষতির চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদাপন্ন হয় দেশ এবং এর জনগণ। প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে সিরিয়া, মিশর, পাকিস্তানের উদাহরণও দিয়েছেন। এসব দেশে জঙ্গীবাদের উত্থান হয়েছে দীর্ঘকালের গণতন্ত্রহীনতা এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসনের কারণে। আর ওইসব দেশের শাসকেরা ‘না বলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ চর্চার মাধ্যমে জঙ্গীবাদের উত্থানের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। একথা মনে রাখতে হবে যেসব দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি বিদ্যমান, সে সব দেশে কখনই জঙ্গীবাদের ব্যাপক বিস্তার বা উত্থান সম্ভব হয় না। গণতন্ত্রহীনতার কারণে না বলার সংস্কৃতির পথ ধরেই জঙ্গীবাদ বিস্তার লাভ করে। কাজেই গণতন্ত্রই হচ্ছে জঙ্গীবাদ প্রতিরোধের গ্যারান্টি এ কথাটি মনে রাখতেই হবে।