Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩৩)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩৩)

পার্টির অভ্যন্তরীণ লড়াই

আনু মুহাম্মদ

Last-5লিউ শাও চীর সঙ্গে মাও সেতুঙ লাইনের বিরোধের সারবস্তু ছিলো, যেখানে লিউ মনে করতেন মালিকানার যৌথায়নের আগে উৎপাদনের বিকাশ হওয়া দরকার, সেখানে মাও এর অবস্থান ছিলো উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের চাইতে যৌথায়নকে বা সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরকে বেশি গুরুত্ব প্রদান। লিউ চীনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, পার্টির মধ্যে তাঁর প্রভাব ছিলো ব্যাপক। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বর্শাফলক তাঁর দিকে তাক করা থাকলেও পার্টির উচ্চ পর্যায় থেকে তাঁকে সরানো সহজ ছিলো না।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অনেক চড়াই উৎরাই, ভুল ও বাড়াবাড়ি, সঠিক ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনার মধ্যেই ১৯৬৮ সালের ১৩ অক্টোবর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ৮ম কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত দ্বাদশ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শুরু হয়। ৩১ অক্টোবর অধিবেশন সমাপ্ত হয়। এই অধিবেশনে লিউ শাও চীর বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলাকালীন বক্তব্য ও কর্মসূচি পার্টিগত আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে প্রকাশ করা হয়। চৌ এন লাই চীনের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও লিন পিয়াও ততদিনে দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। অধিবেশনের শেষে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অষ্টম কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত দ্বাদশ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন সর্বসম্মতিক্রমে মন্তব্য করে যে, আমাদের মহান নেতা কমরেড মাও সেতুঙ স্বয়ং যে সর্বহারা শ্রেণীর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করেছেন এবং নেতৃত্ব দিচ্ছেন তা হচ্ছে আমাদের দেশের সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বের শর্তে বুর্জোয়া শ্রেণী ও সমস্ত শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণীর একটি মহান রাজনৈতিক বিপ্লব।’ লিন পিয়াও সম্পর্কে বলা হয়, ‘সভাপতি মাওএর সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী লাইন, সর্বহারা শ্রেণীর মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে সভাপতি মাওএর মহান রণনীতিগত পরিকল্পনা, মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায়ে সভাপতি মাও প্রদত্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ ও সহকারি সভাপতি লিন পিয়াওয়ের বহু ভাষণ সবই নির্ভুল।’ লিউ শাও চী সম্পর্কে অধিবেশনের বক্তব্য ছিলো, ‘..গণমুক্তি ফৌজের সমর্থনে বারংবার শ্রেণী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণীর সদর দফতরকে, লিউ শাও চী যার প্রতিনিধি এবং যা পার্টির নেতৃত্ব ক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার অপচেষ্টা করেছিল, আর দেশের বিভিন্ন স্থানে তার দালালদেরকে অবশেষে উৎখাত করা হয়েছে এবং ক্ষমতার যে অংশটা তারা কুক্ষিগত করে নিয়েছিল তা আবার কেড়ে আনা হয়েছে।ইতিমধ্যেই এই ব্যাপকতম সর্বহারা শ্রেণীর মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লব বিরাট এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছে।’ এই অধিবেশনের আগেই লিউ শাও চীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় কমিটির একটি বিশেষ গ্রুপ তদন্ত পরিচালনা করে। এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত রিপোর্টকে অধিবেশন অনুমোদন করে। সুতরাং এই অধিবেশনের মধ্য দিয়েই পার্টি ও রাষ্ট্রে লিউ শাও চীর সকল প্রভাব ও ক্ষমতা চূর্ণ হয়। কিন্তু আমরা পরে দেখবো ‘চূড়ান্ত বিজয়’ সম্পর্কে এই ঘোষণাকে ভুল প্রমাণ করে অনেক বেশি দক্ষিণপন্থী ধারা পরে আরও শক্তিশালী আকারে আবির্ভূত হয়।

১৯৫৬ সালে পার্টির অষ্টম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হলেও নবম জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় এর ১৪ বছর পরে, ১৯৬৯ সালে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে সবচাইতে প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠা লিন পিয়াও তখন কার্যত কর্তৃত্বে, তিনিই এই কংগ্রেসে রিপোর্ট পেশ করেন ও তা গৃহীত হয়। রিপোর্টে বলা হয়, ‘চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সমস্ত সাফল্যই হচ্ছে সভাপতি মাওএর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বের ফল এবং সবই মাও সেতুঙ চিন্তাধারার বিজয়।’ আরও বলা হয়, ‘সভাপতি মাওরাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও দর্শন প্রভৃতি ক্ষেত্রে মার্কসবাদলেনিনবাদকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছেন, রক্ষা করেছেন ও বিকশিত করেছেন এবং মার্কসবাদলেনিনবাদকে এক সম্পূর্ণ নতুন পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। মাও সেতুঙ চিন্তাধারা এমন একটা যুগের মার্কসবাদলেনিনবাদ, যে যুগে সাম্রাজ্যবাদ সামগ্রিক ধ্বংসের মুখে চলেছে আর সমাজতন্ত্র এগিয়ে চলেছে বিশ্বব্যাপী বিজয়ের পথে।’

নবম কংগ্রেসে লিন পিয়াও এই রিপোর্ট পেশ করলেন কিন্তু এর চারবছর পরে ১৯৭৩ সালের ২৪ আগষ্ট থেকে অনুষ্ঠিত দশম কংগ্রেসে উপস্থাপিত রিপোর্টের মূল প্রতিপক্ষ ছিলেন তিনি নিজেই। তাঁর বিরুদ্ধে মাওকে হত্যা এবং সামরিক অভ্যুত্থানের চক্রান্ত করবার অভিযোগ আনা হয়। এই রিপোর্টে লিন পিয়াওকে ‘বুর্জোয়া উচ্চাভিলাষী, চক্রান্তকারী, দ্বিমুখি, দলত্যাগী ও দেশদ্রোহী’ হিসেবে অভিহিত করে বলা হয়, ‘১৯৭০ সালের আগষ্ট মাসে নবম কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে এক প্রতিবিপ্লবী অভ্যুত্থান শুরু করার জন্যে সে আরেক পদক্ষেপ এগিয়ে যায়, যা নস্যাৎ করে দেয়া হয়। তারপর ১৯৭১ সালের মার্চে ‘৫৭১’ প্রকল্পের রূপরেখা নামে এক সশস্ত্র প্রতিবিপ্লবী অভ্যুত্থান সংগঠিত করার জন্য এক পরিকল্পনা সে প্রণয়ন করে এবং ৮ সেপ্টেম্বর আমাদের মহান চেয়ারম্যান মাওকে হত্যা করে প্রতিদ্বন্দ্বী কেন্দ্রীয় কমিটি স্থাপনের চেষ্টায় সে এক অভ্যুত্থান ঘটায়। ১৩ সেপ্টেম্বর,তার চক্রান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে, লিন পিয়াও গোপনে এক বিমানে আরোহণ করে পার্টির প্রতি ও দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য পালিযে যায় এবং গণপ্রজাতন্ত্রী মঙ্গোলিয়ার উন্দুরখানে এক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে।’

এই সময়ে পার্টির অবস্থানের মধ্যে আরও পরিবর্তনের সূচনা হয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বারবার ঘোষিত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে চীনা পার্টির অন্যতম অভিযোগ ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের নমনীয়তা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি। কিন্তু ১৯৭১ এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবার জন্য ভেতর ও বাহির বহুদিক থেকে তাগিদ তৈরি হয়। নানাভাবে অপ্রকাশ্যে যোগাযোগও শুরু হয়, ১৯৭১এ তা স্পষ্ট রূপ নেয়।

(চলবে…)