Home » শিল্প-সংস্কৃতি » জেমস বন্ড-এর সেকাল-একাল (পর্ব – ২)

জেমস বন্ড-এর সেকাল-একাল (পর্ব – ২)

আলফ্রেড হিচকক কেন থাকলেন না

ফ্লোরা সরকার

Last-7গত সংখ্যায় আমরা জেমস্ বন্ড সিরিজের এই সিরিজ লেখায় এর জন্মলগ্নের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। এবার আমরা দেখব “ড. নো” দিয়ে বন্ড সিরিজের যাত্রা শুরু হলেও শুরু হবার কথা ছিলো ‘থান্ডারবল’ দিয়ে। এবং সেটা পরিচালনার কথা ছিলো, বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আলফ্রেড হিচককের। কিন্তু সেটা হয়নি। গত ২৬ অক্টোবর ২০১৫, ভেরাইটি ম্যাগাজিনে, ‘কেনো আলফ্রেড হিচককের বন্ড সহ ০০৭এর তিন ছবির মূল গল্প থেকে কেন সরে গিয়েছিলেন?’ – এই শিরনামে ম্যাথিউ চারনভ চমকার একটি প্রতিবেদন লেখেন। লেখাটিতে প্রশ্ন রাখা হয়, বন্ডের প্রথম সিরিজ ‘থান্ডারবল’ হিচকককে দিয়ে শেষ পর্যন্ত পরিচালনা করা কেনো সম্ভব হলোনা? হিচকক কি তাহলে অনিচ্ছুক ছিলেন? কেননা স্টিভেন স্পিলবার্গ ও কোয়েনটিন তারাটিনোর মতো প্রথম সারির নির্মাতারা যেভাবে এই সিরিজের হাল ধরা নিয়ে ছলনা করেছিলেন, হিচককও কি সেই পথে হেঁটেছিলেন? অথচ হিচককরের মতো চমৎকার করে জেমস বন্ডের নির্মাণের জন্যে আর ক’জনকেই বা পাওয়া যেতো সেই সময়ে? ১৯৫৯ সালেই ‘থান্ডারবল’ সিরিজের প্রথম ভার্সানটি নির্মাণের জন্যে হিচককের কাছে প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিলো। বন্ড সিরিজের রেডিও প্রচার কর্মী ক্রিস রাইট জানাচ্ছেন, ‘হিচককের সঙ্গে যোগাযোগ করার বিষয়টি ইয়ান ফ্লেমিংএর মাথাতেই প্রথম এসেছিলো। তিনি হিচকককে টেলিগ্রামে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, বন্ড সিরিজ পরিচালনার জন্যে’। ঐ টেলিগ্রামেই ফ্লেমিং ছবির একটা সারসক্ষেপ দিয়ে দিয়েছিলেন, যেখানে লেখা হয়, একদল মাফিয়া চক্র ইংল্যান্ডকে ব্ল্যাক মেইল করার জন্যে অ্যাটমিক বোমা চুরির চক্রান্ত করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই দুই প্রতিভা অর্থাৎ ইয়ান ফ্লেমিং এবং আলফ্রেড হিচকক কখনোই মুখোমুখি হতে পারেননি। দেখা হলে, বন্ড সিরিজের প্রথম ছবির ইতিহাস আজ হয়তো অন্যভাবে লিখিত হতো। অন্যদিকে বন্ড সিরিজের আরেক রেডিও প্রচার কর্মী টম সিয়ারস জানাচ্ছেন, ‘এটা এখনো পরিস্কার না যে, হিচকক আদৌ সেই পান্ডুলিপিটি পড়েছিলেন কিনা। যদিও তিনি প্রস্তাবটিতে রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু সেই সময়ে হিচকক তার ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’ নির্মাণের পর আর কোনো থ্রিলার সিরিজ নির্মাণের পক্ষপাতি ছিলেন না।”

তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, হিচকক যদি সেটা নির্মাণ করতেন, তাহলে ‘থান্ডারবল’ ছবির বন্ডের চরিত্রে কে রূপদান করতেন? সিয়ারস জানাচ্ছেন, ‘০০৭ এর সম্ভাব্য বন্ড ছিলেন রিচার্ট বার্টন। কিন্তু ক্যামেরার পেছনে হিচকক থাকলে, ফ্লেমিং বেশি খুশি হতেন যদি জিমি স্টুয়ার্ডকে মনোনীত করা হতো।’ এরপর আমরা দেখতে পাই হিচকক তার ‘সাইকো’ নির্মাণের দিকে চলে গেলেন এবং ফ্লেমিং তার অস্টম বন্ড সিরিজ লেখার দিকে মনোনিবেশ করলেন। ক্রিস রাইটকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “.নো’তে যেভাবে আমরা বন্ডকে পাই, হিচকক যদি বন্ড নির্মাণ করতেন, তাহলে তাকে কি আমরা সেভাবে পেতাম?’ উত্তরে রাইট বলেন, ‘ঠিক করে বলা যায়না। কেননা, চরিত্রগুলি হুবহু ফ্লেমিংএর আদলেই নির্মিত হয়েছিলো। যদিও পরবর্তীতে বন্ডের চরিত্রের অনেক রদবদল ঘটানো হয়।’

এবার দেখা যাক, বন্ডের অন্যান্য সিরিজ নিয়ে সময়ে সময়ে কেমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে নির্মাতাদের এবং যার কারণে কিছু কিছু সিরিজের মূল গল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অন হার মেজেসটিস সিক্রেট সার্ভিস’ দর্শকদের মতে সব থেকে রোমাঞ্চকর, রোমান্টিক এবং স্টাইলিস। কিন্তু ছবির অস্ট্রেলিয়ান নায়কমডেল জর্জ লেজেনবি যখন জানালেন, তিনি আর পরবর্তী বন্ড সিরিজে অভিনয় করবে না, তখন প্রযোজকদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। কেননা, পরবর্তী সিরিজের পান্ডুলিপি ‘ডায়মন্ড ফর এভার’ বন্ড সিরিজের অন্যতম লেখক রিচার্ড মেইবাম ইতিমধ্যে লিখে ফেলেছেন এবং অবশ্যই সেটা লেজেনবিকে মাথায় রেখে। জর্জ লেজেনবির অপ্রত্যাশিত চলে যাওয়া, আবার নতুন করে পান্ডুলিপি লিখতে বাধ্য করা হয়। বন্ডের ইতিহাসবিদ চার্লস হেলফেনস্টেইন জানান, ‘আসলে যা ঘটেছিলো, সেটা হলো, ‘ অন হার মেজেসটিস সিক্রেট সার্ভিস’ সহ ‘দা লিভিং ডে লাইট’ দুটো ছবিতেই অত্যধিক মাত্রায় প্রতিশোধমূলক (স্ত্রীকে খুন ইত্যাদি) আবেগী চরিত্র নির্মাণ করা হয়েছিলো, যে চরিত্র লেজেনবি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু তার প্রস্থান সবকিছু ভন্ডুল করে দেয় এবং পান্ডুলিপির পুর্ণলিখন প্রয়োজন পড়ে।’ কিন্তু এই ঘটনাই আবার বন্ড সিরিজের কপাল খুলে দেয়। ১৯৭১ এর ১৪ ডিসেম্বর শেন কেনেরি অভিনীত ‘ডায়মন্ডস আর ফর এভার’ যখন মুক্তি পেলো, সিনেমা হলগুলো দর্শক সমাগমে গম গম করতে লাগলো এবং পৃথিবী জুড়ে ছবিটি মুনাফা কুড়ালো ১১কোটি ৬০লাখ ডলার। বলা হয়ে থাকে, তুলনামূলক কম উত্তেজক ভাবে নির্মিত এই ছবি পরবর্তী বন্ড সিরিজের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিলো এবং যে দরজার দিয়ে রজার মুরের প্রবেশ পথ আরো মসৃণ হয়ে উঠেছিলো।

থান্ডারবল’ শেষ পর্যন্ত হিচককের দ্বারা নির্মিত না হলেও, কেলভিন ম্যাক ক্লরি যখন সেটা নির্মাণ করলেন, ইয়ান ফ্লেমিংএর সঙ্গে বিরোধ বেঁধে গেলো। বিরোধ ছবির সত্বাধিকার নিয়ে। ইয়ানের সঙ্গে চুক্তি শেষে কেলভিন তার মনের মাধুরী দিয়ে ছবিটা সাজালেন। এভাবে দেখা যায়, বন্ড সিরিজের নিয়ত পরিবর্তন, পরিবর্ধন ঘটেছে। যেসব পরিবর্তন, পরিবর্ধন সিরিজগুলিকে নানান বাঁকে নিয়ে গেছে। কোনো কোনো বাঁকে ছবির উচ্ছসিত প্রশংসা হয়েছে, কোনোটাকে একেবারে নিম্নমানের বলে গালমন্দ করা হয়েছে। পরবর্তী পর্বে আমরা সেসব ছবি নিয়ে আলোচনা করবো।

(চলবে…)