Home » বিশেষ নিবন্ধ » প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৮৫৭ :: পুনঃঅনুসন্ধান (প্রথম পর্ব)

প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৮৫৭ :: পুনঃঅনুসন্ধান (প্রথম পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো

Last-3পুরনো ঢাকার নবাবপুর রোডের শেষ মাথায় বায়ে ঘুরলে লক্ষ্মীবাজার, সোজা গেলে বাংলা বাজার, সেখানে স্বল্প পরিসর যে জায়গাটি বাহাদুর শাহ পার্ক নামে পরিচিত, তা ১৫৮ বছরের স্মৃতি বহন করে চলেছে। বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহী সিপাহীদের ওখানে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। আগে ওই পার্কটির নাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক, বৃটেনের রাণীর নামানুসারে। বৃটিশ শাসকরা ওই নাম দিয়েছিল। পরে নাম বদলিয়ে রাখা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক, শেষ মোগল সম্রাটের নামানুসারে, যাকে বিপ্লবী সিপাহীরা সারা ভারতের সম্রাট ঘোষণা করেছিলেন। নতুন নামকরণটি তাই যথাযথ হয়েছিল।

প্রথমে যুদ্ধ শুরু হয় বাংলা থেকে, কলকাতার নিকটবর্তী ব্যারাকপুর থেকে। সিপাহী মঙ্গল পাণ্ডের নেতৃত্বে এই মহা বিদ্রোহের সূচনা হয় (২৯ মার্চ ১৮৫৭ সাল)। বাংলায় কলকাতা, ঢাকা (২২ নভেম্বর ১৮৫৭ সাল), ফরিদপুর, পাবনা, চট্টগ্রাম (১৮ নভেম্বর ১৮৫৭ সাল, হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে), সিলেট ও অন্যান্য অঞ্চলে সিপাহী অভ্যুত্থান হয়েছিল।

বাংলাসহ ভারতের বহু স্থানেই বৃটিশ শাসকদের চরম বর্বরতা ও প্রতিহিংসার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। ১৮৫৭ সালে অর্থাৎ পলাশীর যুদ্ধের ঠিক একশ বছর পর ভারতীয় সিপাহীরা বিদ্রোহ করেছিলেন দখলদার বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে। প্রথমদিকে অনেকটা বিজয়ী হয়েও, শেষে পরাজয় বরণ করেছিলেন। পরাজয় সত্ত্বেও ভারতীয় সিপাহী ও জনগণের এই যে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ তা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রেরণা যুগিয়েছে। পাশাপাশি বৃটিশ শাসকদের নৃশংস বর্বরতার চিত্রও তুলে ধরেছে। অবশ্য বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের নৃশংসতা ও বর্বরতার ঘটনা এর আগে ও পরেও অনেক আছে। একইভাবে জনগণের সংগ্রামের ইতিহাসও ১৮৫৭এর সিপাহী বিদ্রোহের আগে ও পরে অনেক আছে। এক কথায় বৃটিশ শাসনের দুইশ বছরের ইতিহাস হলো একদিকে জনগণের সাহসী সংগ্রামের ঘটনায় ভরপুর, অন্যদিকে এই ইতিহাস হলো সঘোষিত সভ্য ইংরেজদের চরম অসভ্যতা, বর্বরতা ও নৃশংসতার ইতিহাস।

পলাশীর যুদ্ধ থেকে আমাদের পরাধীনতার যুগ শুরু হয়েছিল। তখন থেকেই ‘বণিকের মানদণ্ড’ পরিণত হয়েছিল ‘শাসকের রাজদণ্ডে’। প্রথমে বাংলা এসেছিল ইংরেজদের দখলে। তারপর ক্রমে ক্রমে সারা ভারত তাদের দখলে চলে যায়। ১৮৫৭ সালেও মোগল সম্রাট ছিলেন দিল্লীর সিংহাসনে। শেষ মোগল সম্রাটবাহাদুর শাহ। তবে তাকে সম্রাট না বলাই ভালো। তার শাসন ক্ষমতা দিল্লীর লাল কেল্লার বাইরে খুব একটা কার্যকর ছিল না। কার্যতঃ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রায় পুরো ভারতটাই দখল করে নিয়েছে। সিপাহী বিদ্রোহের পর এই শাসনভার সরাসরি বৃটেনের রাজকীয় সরকার নিজ হাতে তুলে নিয়েছিল।

পলাশীর মাঠে সিরাজউদ্দৌলা’র পরাজয়ের তাৎপর্য সেদিন ভারতবাসী বুঝতে পারেনি। এবং সেই কারণেই ইংরেজ কোম্পানীর পক্ষে যুদ্ধে বিজয় এতো সহজ হয়েছিল। ভারতবর্ষ সুপ্রচীনকাল থেকেই বিদেশীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। আক্রমণকারীরা হয় লুট করে চলে গেছে (যেমন গজনীর সুলতান মাহমুদ বা নাদির শাহ) অথবা আক্রমণকারী নিজেরাই ভারতবাসী হয়ে গেছে। এইভাবে বাইরে থেকে এসেছে আর্যরা, পরে এসেছে তুর্কি, পাঠান ও মোগলরা। তারা সকলেই ভারতবাসী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতকে পরাধীন দেশ বানিয়ে শাসন করেছে একমাত্র ইংরেজরাই। তাই ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম তা ছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম।

এ কথা ঠিক যে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটেনি। তাই পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা বা ক্লাইভের জয়পরাজয় নিয়ে মাথা ঘামায়নি বাংলার মানুষ, এমনকি এই পক্ষ বা অপর পক্ষের সৈন্য দলও। সামন্তযুগে সৈন্যরা কোন না কোন রাজার ভাড়াটে বা মার্সিনারী হিসেবেই যুদ্ধ করতো। এটা অবশ্য দৃশ্যপটের একদিক। অন্যদিকে ইংরেজ শাসকরা শাসন ও লুণ্ঠন চালাতে গিয়ে প্রতি পদে পদে প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। পলাশীর যুদ্ধের পরবর্তী একশ বছরের ইতিহাস হচ্ছে অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহের ঘটনায় ভরপুর। বিশেষ করে বাংলায়, যেখানে প্রথম ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানেই সবচেয়ে বেশি কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে। তার মধ্যে অধিকাংশই ছিল সশস্ত্র। আর এই সকল বিদ্রোহী ছিল হিন্দু মুসলমানের মিলিত লড়াই। কোন কোন সশস্ত্র বিদ্রোহ বছরের পর বছর ধরেও চলেছে। বাংলায় তো বটেই, সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ উত্তর ভারতে, মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে, মহারাষ্ট্রে, উড়িষ্যায় বলা যেতে পারে ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্র কমবেশি হয়েছে। এই সকল বিদ্রোহ ছিল কৃষকের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। তার মধ্যে বৃটিশ হটানোর দিকটিও একভাবে ছিল। তবু তখনো পর্যন্ত এই সকল কৃষক সংগ্রামকে স্বাধীনতার সংগ্রাম বলা যায় না। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ছিল সত্যিকার অর্থে প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ। কার্ল মার্কসও সিপাহী বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছিলেন। এমনকি কার্ল মার্কস এই বিদ্রোহকে ‘একটি সামরিক বিদ্রোহ নয়, বরং একটি জাতীয় বিদ্রোহ’ রূপে দেখেছিলেন।

তদানীন্তন ভারত, বৃটিশ শাসন ও সিপাহী বিদ্রোহ প্রসঙ্গে মার্কসের ভাবনা খুবই প্রাসঙ্গিক। যা ইতিহাস ও সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র ও গবেষকদের খুবই গুরুত্ব সহকারে নেয়া উচিত। আমরা একটু পরে মার্কসের ভারত ভাবনা সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করবো। তার আগে ১৮৫৭ সালের মহান সিপাহী বিদ্রোহের বিবরণ খুবই সংক্ষেপে তুলে ধরা যাক।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনের একশ বছরে ভারতের জনগণের মধ্যে বৃটিশ বিরোধী ক্ষোভ জমা হতে থাকে। সেই ক্ষোভ কোম্পানীর সেনাবাহিনীর ভারতীয় সদস্যদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। ভেতরে ভেতরে বিদ্রোহের প্রস্তুতিও চলছিল। তবে যে ধরনের পরিকল্পিত প্রস্তুতির দরকার তা ছিল না। কিছুটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বিদ্রোহের জন্ম যা দ্রুত বিভিন্ন সেনানিবাসে ছড়িয়ে পড়ে। জনগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাতে সাড়া দিয়েছিল। প্রথমে যুদ্ধ শুরু হয় বাংলা থেকে, কলকাতার নিকটবর্তী ব্যারাকপুর থেকে। সিপাহী মঙ্গল পাণ্ডের নেতৃত্বে এই মহা বিদ্রোহের সূচনা হয় (২৯ মার্চ ১৮৫৭ সাল)। বাংলায় কলকাতা, ঢাকা (২২ নভেম্বর ১৮৫৭ সাল), ফরিদপুর, পাবনা, চট্টগ্রাম (১৮ নভেম্বর ১৮৫৭ সাল, হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে), সিলেট ও অন্যান্য অঞ্চলে সিপাহী অভ্যুত্থান হয়েছিল। সিপাহীদের মধ্যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও ধর্মের লোক ছিলেন।

কোম্পানীর সেনাবাহিনীর মধ্যে অফিসাররা বৃটিশ হলেও সিপাহীদের মধ্যে ভারতীয়রাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কোম্পানীর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাহিনীটি ছিল বাংলায়। তার সদস্য ছিল এক লাখ সত্তর হাজার। তার মধ্যে এক লাখ চল্লিশ হাজারই ছিল ভারতীয়। বস্তুত বৃটিশরা ভারতীয়দের সাহায্যেই ভারতকে পরাধীন রাখতে পেরেছিল। সেই ভারতীয় সিপাহীরা যখন বিদ্রোহ করলো তখন আর সাগর পাড়ি দিয়ে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন পথ ছিল না। বস্তুত সিপাহী বিদ্রোহ প্রথম পর্যায়ে বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় ধরে রাখতে পারেনি।।

(চলবে…)