Home » আন্তর্জাতিক » ভারতে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণু পরিস্থিতির উত্থান

ভারতে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণু পরিস্থিতির উত্থান

কেন অ্যাওয়ার্ড ফিরিয়ে দিলাম :: অরুন্ধতী রায়

sahityaভারতে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা, হত্যাকাণ্ড, উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থানের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন দেশটির লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদরা। তাদের মনে হয়েছে, ভারত যেদিকে চলছে, তাতে করে তাদের বসে থাকার উপায় নেই। তারা প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও সম্মাননা (অ্যাওয়ার্ড) ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তিত্ব এই পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন। এবার এই প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন খ্যাতিমান লেখক, সক্রিয়বাদী অরুন্ধতী রায়ও। তিনি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসএ পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে লিখেছেন। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ।

যদিও আমি বিশ্বাস করি না যে, আমাদের বিপুল সংখ্যক যে কাজ তা সঠিক বিচারে বিচার্য্য হয় এবং অ্যাওয়ার্ডই আমাদের কাজের স্বীকৃতি। কিন্তু তবুও আমি ১৯৮৯ সালে পাওয়া ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট স্ক্রিনপ্লেটি, যা এই ফেরত দেওয়ার সাথে যুক্ত করতে যাচ্ছি। সেইসাথে আমি এটাও পরিষ্কার করতে চাই, বর্তমান সরকারের বাড়িয়ে দেওয়া কথিত ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতায় ‘কষ্ট’ পেয়ে আমি এই অ্যাওয়ার্ড ফিরিয়ে দিচ্ছি। প্রথমত, কাউকে গণপিটুনিতে হত্যা করা, গুলিচালনা, পুড়িয়ে মারা ও গণহত্যার ঘটনাগুলোতে অসহিষ্ণুতা শব্দটি ব্যবহার করাও ভুল। দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে সে সম্পর্কে আমাদের ব্যাপক ধারণা ছিল। ফলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এই সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর যা ঘটছে তা নিয়ে কষ্ট পেয়েছি বলে দাবি করতে পারি না। তৃতীয়ত, এসব নৃশংস হত্যা আরো গভীর বিপর্যয়ের লক্ষণমাত্র। যারা জীবিত, তাদের কাছেও এই সমাজ নরক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোটি কোটি দলিত, আদিবাসী, মুসলিম ও খ্রিস্টান সব মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। তারা জানে না, কখন কোন দিকে থেকে অত্যাচারের খড়গ নেমে আসবে।’

আজ আমরা এমন এক দেশে বাস করছি যেখানে নতুন ব্যবস্থার দুর্বৃত্ত আর ক্যাডাররা ‘অবৈধ হত্যার’ কথা বলছে, তখন তারা কল্পিত একটি গরুকে হত্যার কথা বোঝায়। সত্যিকারের যে লোকটিতে খুন করা হলো, তার কথা নয়। তারা যখন অপরাধ সংঘঠনস্থল থেকে ‘ফরেনসিক পরীক্ষার প্রমাণ’ নেওয়ার কথা বলে, তখন তারা বোঝায় ফ্রিজের খাবারের কথা, হত্যার শিকার লোকটির দেহ নয়। আমরা বলছি, আমরা ‘অগ্রগতি হাসিল করেছি’, কিন্তু যখন দলিতদের গলা কাটা হয়, তাদের শিশুদের পুড়িয়ে মারা হয়, তখন আক্রান্ত, কোপানো, গুলিবিদ্ধ কিংবা জেলে যাওয়া ছাড়া কোনো লেখক কি বাবাসাহেব অম্বেদকরের মতো করে স্বাধীনভাবে বলতে পারে : ‘অচ্ছ্যুতদের জন্য হিন্দুধর্ম হলো আতঙ্কের চিরন্তন কুঠুরী’? কোন লেখক এখন সাদত হাসান মান্টোর ‘লেটার্স টু আঙ্কল স্যাম’এর মতো কিছু লিখতে পারে? যা বলা হচ্ছে, তার সাথে আমরা একমত বা দ্বিমত পোষণ করি তা কোনো ব্যাপার নয়। আমরা যদি স্বাধীনভাবে কিছু বলার অধিকার না রাখি, তবে আমরা সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অপুষ্ট, বোকাদের জাতিতে পরিণত করব। উপমহাদেশ জুড়ে চলছে প্রতিযোগিতা করে অবক্ষয়ের দিকে ছুটে চলা, নতুন ভারতও ব্যাপক উদ্দীপনায় সেদিকে যোগ দিয়েছে। এখানেও সেন্সরশিপের দায়িত্ব বর্তে গেছে দাঙ্গাবাজাদের ওপর।

আমি ফিরিয়ে দেওয়ার মতো একটা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়ে (আমার অতীতের কোনো একটা সময় থেকে) খুবই খুশি হয়েছি। কারণ এর মাধ্যমে দেশে লেখক, চলচ্চিত্রকার ও শিক্ষাবিদদের উদ্যোগে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তার অংশ হলাম। এসব ব্যক্তি এক ধরনের আদর্শিক কদর্যতার বিরুদ্ধে এবং সামষ্টিক বুদ্ধিমত্তার ওপর হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, তা না হলে এটা আমাদের ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলবে, গভীর গর্তে পুঁতে ফেলবে। আমি বিশ্বাস করি, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা এখন যা করছেন, তা অভূতপূর্ব, ইতিহাসে এ ধরনের কোনো ঘটনা কোনোকালে ঘটেনি। এটা অন্য উপায়ে রাজনীতি। আমি এর অংশ হতে পেরে গর্বিত। আর বর্তমানে এই দেশে যা হচ্ছে, আমি সে জন্য লজ্জিত।

পুনশ্চ: ২০০৫ সালে আমি সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, তখন কংগ্রেস ছিল ক্ষমতায়। দয়া করে আমাকে কংগ্রেস বনাম বিজেপি বিতর্কের মধ্যে ফেলবেন না। এটা অনেক ঊর্ধ্বে চলে গেছে।।