Home » বিশেষ নিবন্ধ » স্থানীয় সরকার নির্বাচন :: একটি কালো উদাহরণ সৃষ্টির প্রচেষ্টা

স্থানীয় সরকার নির্বাচন :: একটি কালো উদাহরণ সৃষ্টির প্রচেষ্টা

আমদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis-4বাংলাদেশে মোটামুটি একটি পার্লামেন্ট শাসিত সরকার গত আড়াই দশক কাজ করলেও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের আদলটি টিকে আছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়। ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান এবং সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় মেয়রই সর্বেসর্বা। সব স্তরে ৩৩% নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ঘোষণা থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদে ১৩ জনে ০৩ জন নারী সদস্য, যার শতকারা হার কমবেশি ২৪%। আবার সংসদ সদস্যরা ইউনিয়ন বা উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হওয়ার কারণে দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপ দৃশ্যমান বাস্তবতা। এজন্য তৃণমূল পর্যায়ের এই প্রতিষ্ঠানগুলি স্বশাসিত বা স্বায়ত্ত্বশাসিত কোনটাই হয়ে উঠতে সক্ষম হয়নি।

এ অবস্থায় সরকার অবশেষে স্থানীয় সরকারের ওপর দলীয় মার্কা স্থাপন করতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের অনেকগুলি প্রতিষ্ঠানের ওপর ‘অদৃশ্য’ দলীয় মার্কা লাগানো সম্পন্ন করে এবার স্থানীয় সরকার এর আওতায় আসছে। এমনিতেই তৃণমূলের এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সব সরকারেরই একটি তীক্ষ্ণ নজর থাকে। সামরিক সরকারগুলির ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। ক্ষমতা দখলের পর পরই তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করে। কারণ ওই সামরিক সরকারগুলি অচিরেই দল গঠন করবে এবং স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের ভিত্তির ওপর দল গড়ে উঠবে। আইয়ুব খানের কনভেনশন মুসলিম লীগের বুনিয়াদী গণতন্ত্র, জিয়উর রহমানের জাগদল ও বিএনপির বহুদলীয় গণতন্ত্র ও এরশাদের জনদল ও জাতীয় পার্টির নতুন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ও এর জনপ্রতিনিধিদের ব্যবহার মনে আছে নিশ্চয়ই।

এত কাণ্ডের পরেও দেশের সবচেয়ে প্রাচীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা জনগণের কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও আস্থার জায়গা। এখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং বিশ্বস্ত। এই পরিষদের নির্বাচন নিয়ে উৎসাহের কোন অন্ত থাকে না। সারা দেশ উৎসবের আমেজে মেতে ওঠে। ভোট প্রদানে অশতীপর বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নবীন তরুনও উন্মুখ হয়ে থাকে। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও এই নির্বাচন মাইলষ্টোন হিসেবে বিবেচিত।

সবশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১১ সালে, তার আগেরটির আট বছর আগে, ২০০৩ সালে। কমবেশি অনেকগুলি পৌরসভা নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছিল একই সময়ে। উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। মনোনয়ন দলীয় ভিত্তিতে হলেও নির্বাচন ছিল নির্দলীয়। সেদিক থেকে আগত দলীয় নির্বাচন কেমন হবে সে আভাস ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে। ঘরের কাছের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ এখানে বরাবরি একটু বেশি। তবে এবারের নির্বাচনে বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে আশংকা রয়েছে। বিএনপি এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি, তবুও ধরে নেয়া যায় বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নেবে। যদিও ইতিমধ্যে তারা দলীয় মার্কায় অনুষ্ঠানের বিষয়ে বিরোধিতা জানান দিয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় অবস্থান ও জনসমর্থনের বিষয়টি সরকার ভালভাবে জানে। এও জানে, ২০১৩ সালের সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের মত মোটামুটি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন তাদের জন্য কি ফল বয়ে আনতে পারে। ঐ নির্বাচনের ফল তাদেরকে ধাবিত করেছিল একক জাতীয় নির্বাচনের দিকে। পরবর্তীকালে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচন ও ঢাকা সিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতাই অনুসৃত হয়েছে। গত উপজেলা নির্বাচনের কথা কেউ ভুলে যায়নি। প্রথমধাপে শান্তিপূর্ণ থাকলেও দ্বিতীয়তৃতীয় ধাপে ঐ নির্বাচন হয়ে ওঠে সহিংস ও রক্তপাতময়। নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাও এক্ষেত্রে সকলেরই জানা রয়েছে।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন রাজনৈতিক ও দলীয়ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়। পার্শ্ববর্তী ভারতেও এ নির্বাচন দলীয়। তবে সেখানকার নির্বাচন কমিশন ও অধীন প্রশাসন নির্বাচন অনুষ্ঠানে দায়দায়িত্ব পালনে সরকারের নির্দেশনা পরোয়া করে না। এমনিতেই এসব দেশে তৃণমূল স্থানীয় সরকার অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্থানীয় উন্নয়ন, রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বশাসিতস্বায়ত্ত্বশাসিত। সেসব দেশের উদাহরণ নিয়ে আসলে সেটি হাস্যকর হয়ে উঠবে। যেমন হয়ে ওঠে এখানকার গণতন্ত্র চর্চার সাথে ‘ওয়েষ্ট মিনিষ্টার’ টাইপ গণতন্ত্রের তুলনা।

দলীয় মার্কায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইন পাশ হওয়ার আগেই, গেজেট করে সরকার গ্রাউন্ড ওয়ার্ক শুরু করে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন পুলিশি অভিযানে জেলায় জেলায় বিএনপিজামায়াতের শত শত নেতাকর্মী গ্রেফতার হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন, স্থিতিশীলতার স্বার্থেই এই বিশেষ অভিযান। বিরোধী দলসমূহের পক্ষ থেকে আশংকা করা হচ্ছে, মার্কা লাগানো স্থানীয় নির্বাচন শেষ না হওয়া অবধি কথিত বিশেষ অভিযান চলতেই থাকবে। যেমনটি চলেছিল গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময়।

স্থানীয় সরকার দলীয় দখলে রাখার ব্যাপারে সব সরকারের অভূতপূর্ব ঐক্য রয়েছে। যে কোন উপায়ে তারা স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করতে চান। দু’একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই নির্বাচন কখনই সরকারী নিয়ন্ত্রণের বাইরে অনুষ্ঠিত হয়নি। সবচেয়ে সহিংস এবং রক্তাক্ত উদাহরণটি সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৮৭ সালে, এরশাদের সামরিক শাসনামলে। চর দখল, ভোটকেন্দ্র দখল ও রক্তপাতের জন্য ঐ নির্বাচন এখনও অনেকে ভুলে যাননি। এর পরের নির্বাচনগুলো মোটামুটি শান্তিপূর্ণ কাটলেও নির্বাচন কমিশনের দল প্রীতি ও সরকারী হস্তক্ষেপের অভিযোগ কখনই বন্ধ হয়নি। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের সীমাহীন ক্ষমতা ও অবাধ, সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানে রয়েছে সকল আইনী সমর্থন। এতকিছুর পরেও কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সকলের আস্থাভাজন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন দাঁড়াতে পারেনি।

এর ওপর বর্তমান নির্বাচন কমিশন মোটেই বিরোধী দলের আস্থায় নেই। নির্বাচন কমিশনারদের কারো কারো রাজনৈতিক বক্তব্য, জাতীয়, উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশনে ভূমিকা দলীয় আনুগত্যের উর্ধ্বে ছিল না। সেই অবস্থার পুনরাবৃত্তি এই নির্বাচন কমিশন ঘটাবে না এমন গ্যারান্টি নেই। প্রায় ছয় হাজার ইউনিয়ন পরিষদ ও দুই শতাধিক পৌরসভায় চেয়ারম্যানমেয়রমেম্বরকাউন্সিলর পদে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ করতে নির্বাচন কমিশন কতটা সাফল্য লাভ করবে সে আশংকায় জর্জর সকলেই।

আইনে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ের সরকারী ও সামাজিক সকল কাজের দায়িত্ব দেয়া থাকলেও হাতে গোনা কয়েকটি কাজ ছাড়া তাদের কোন ক্ষমতাই নেই। এ নিয়ে অবশ্য সরকারের কোন মনিটরিং ব্যবস্থাও নেই। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক সামর্থ্য গড়ে তোলার পদক্ষেপও কখনও নেয়া হয়নি। এ অবস্থায় দলীয় ভিত্তিতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেখানে ভোটারের অংশগ্রহণ এবং ভোট প্রদানের গ্যারান্টি সম্পর্কে তৃণমূল জনমনে অনেক আশংকা রয়েছে।

ক্ষমতাসীন ও বিরোধীসকল দলেই প্রার্থীতা নিয়ে সংশয় তৈরী হয়ে আছে। দলীয়ভিত্তিক নির্বাচনে যদি তৃণমূলের মতামত না নিয়ে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়, সেক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি বাধাগ্রস্ত হবে। ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন দলের কালো টাকার মালিক, সন্ত্রাসী ও স্থানীয় গডফাদার সম্পর্ক, যোগাযোগ ও অর্থের জোরে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে জোর প্রচেষ্টা শুরু করেছে। জনসমর্থন না থাকলেও দলীয় সমর্থনে মার্কার জোরে এসব প্রার্থীরা যে কোন ভাবে নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করবে। পরিস্থিতি যদি সেরকম হয় তাহলে স্থানীয় সরকার নিয়ে জনগণের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরো একটি কালো উদাহরণ তৈরী হবে।