Home » আন্তর্জাতিক » উদ্বাস্তু :: ইউরোপে উগ্র ডানপন্থার উত্থান

উদ্বাস্তু :: ইউরোপে উগ্র ডানপন্থার উত্থান

অ্যানেলা সাফদার, আল জাজিরা

অনুবাদ : আসিফ হাসান

Last-2প্যারিসে অন্তত ১২৯টি প্রাণ ধ্বংসকারী হামলার দিন কয়েকের মধ্যেই ইউরোপের বিপুলসংখ্যক রাজনীতিবিদ এটাকে মুসলিমসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর যুদ্ধ ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা মানুষজনকে আর না গ্রহণ করার ব্যাপারে তাদের বক্তব্য আরো সোচ্চার করার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে শুরু করেছেন। প্যারিসে হামলাকারীদের একজন সিরীয় পাসপোর্ট বহন করছিল, যদিও হামলার সাথে তার সম্পৃক্ততা থাকাটা প্রমাণ হয়নি, এমন প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাদের জোরালো হুঁশিয়ারি উদ্বাস্তুদের দুর্দশার আরো অবনতি ঘটবে বলেই আশঙ্কা বেড়েছে।

প্যারিস ঘটনাকে উদ্বাস্তুদের স্রোত থামানোর চেষ্টায় রূপান্তরের কাজটি সবার আগে যেখানে দেখা গেছে, তা হলো পোল্যান্ড। আত্মঘাতী বোমা ও বন্দুক হামলায় ফরাসি রাজধানী প্রকম্পিত হওয়ার ২৪ ঘণ্টা সময়েও আগে পোল্যান্ডের হবু ইউরোপীয় বিষয়ক মন্ত্রী ইউরোস্কেপটিক (ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের শক্তি বাড়ানোর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণকারী) কনরার্ড জিমানস্কিক একটি নিউজপোর্টালকে বলেন, ‘ইউরোপে আসা উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্ট সংখ্যককে গ্রহণ করার জন্য ইইউ’র কোটা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তার দেশ পুরণ করবে না। তিনি বলেন, প্যারিসের মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট সংখ্যক উদ্বাস্তু গ্রহণে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কোনো রাজনৈতিক সম্ভাব্যতা পোল্যান্ড দেখতে পাচ্ছে না। হামলাটির অর্থ দাঁড়াচ্ছে অভিবাসী সঙ্কট নিয়ে ইউরোপিয়ান নীতির আরো গভীর পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’

সিরীয় উদ্বাস্তুদের সবচেয়ে বড় সংখ্যাটি রয়েছে লেবানন ও তুরস্কে। সিরীয় সঙ্কট থেকে রক্ষা পেয়ে প্রায় পাঁচ লাখ উদ্বাস্তু, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু, চলতি বছর ইউরোপে গেছে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন। তবে প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে এটা অনেক কম বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ অনেক সীমান্তই অরক্ষিত। জাতিসংঘ হিসাব অনুযায়ী, কেবল অক্টোবরেই ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা থেকে ইউরোপে ঢুকেছে দুই লাখ ১৮ হাজার উদ্বাস্তু।

হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান ১৬ নভেম্বর বলেছেন, ‘সন্ত্রাসীরা’ ইউরোপে প্রবেশ করতে সঙ্কটটিকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তিনি আইন পরিষদ সদস্যদের ‘অ্যাটাক অন ইউরোপ’ শীর্ষক এক বক্তৃতায় বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিত ও সঙ্ঘবদ্ধ উপায়ে অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনের প্রত্যাশায় বাড়িঘর ত্যাগকারী লোকজনের সাথে মিশে গণঅভিবাসনের সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে।’

উগ্র ডানপন্থীদের হুঁশিয়ারি

সস্তা জনপ্রিয়বাদী উগ্র ডানপন্থী গ্রুপগুলো কয়েক মাস ধরেই এই আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিল যে লাখ লাখ উদ্বাস্তুর ভিড়ে ইউরোপে হামলার ষড়যন্ত্রকারীরাও রয়েছে। ফ্রান্সে লি ফ্রন্ট ন্যাশনালের প্রধান ম্যারিন লে পেন ২৩ নভেম্বর টুইটারে বলেন, ‘ইসলামি মৌলবাদকে অবশ্যই বিলীন করে দিতে হবে, চরমপন্থী মসজিদগুলো অবশ্যই বন্ধ করে দিতে হবে, গোঁড়া ইমামদের অবশ্যই বহিষ্কার করতে হবে।’ পরে তিনি ‘ফ্রান্সে এখনই অভিবাসী পুরোপুরিভাবে বন্ধ করার’ দাবি জানান। ব্রিটেনে উগ্র ডানপন্থী ইউনাইটেড ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টির (ইউকেআইপি, ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলটি ৩৮ লাভ ভোট পেয়েছে) নেতা, ইউরোস্কেপটিক নাইজেল ফারাগ ২৩ নভেম্বর বলেন, ইইউ ‘আমাদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে’ ফেলে দিয়েছে। তিনি ইউরোপিয়ান সীমান্তমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ধারণা বাতিল করারও আহ্বান জানিয়েছেন। নেদারল্যান্ডসে জনমত জরিপে বর্তমানে এগিয়ে থাকা পিপলস পার্টি ফর ফ্রিডম অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসির প্রধান গ্রিট উইলডার্স দেশের সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার জন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আর বেলজিয়ামে ফ্লেমিশ বিচ্ছিন্নতাবাদী ভ্লামস বেলাঙ পার্টির শীর্ষ স্থানীয় নেতা ফিলিপ ডেবিনতার তার ১২,৮০০ টুইটার ফলোয়ারকে ‘সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়াই অভিবাসী ও আইএসআইএলের অনুপ্রবেশ বন্ধ করার একমাত্র সমাধান’ শীর্ষক গ্রুপে যোগ দিতে বলেছেন।

ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের রাজনীতিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যাথু গুডউইন আলজাজিরাকে বলেন, ‘প্যারিস হামলা চরম ডানপন্থী এজেন্ডাঅভিবাসী প্রশ্নে জাতীয় নিরাপত্তা, পরিচিতি ও গণ উদ্বেগের মতো ইস্যুগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে। তিনি আরো বলেন, ‘ইউরোপিয়ান ডানপন্থী দলগুলোর ভাষায় আমি বলব, ২০১৫ সালের শুরু থেকে এবং উদ্বাস্তু সঙ্কটের মধ্যে তারা এর মধ্যেই তাদের বিপুল সমর্থন দেখতে পাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, সীমান্ত সৃষ্টি, বাইরের সীমানা কঠোর করা, শেঙেন ভিসার অস্তিত্বের প্রকাশ্য সমালোচনা এং ইইউ শ্রমিকদের জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে অবাধে চলাচলের বিরুদ্ধে আরো জোরালো অবস্থান নেবে।’ তার মতে, ‘ইউরোপ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আরো রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করবে।’

ক্রমবর্ধমান বিদেশীভীতি

অনেকে ইউরোপজুড়ে ক্রমবর্ধমান বিদেশীভীতিতেও আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। তাদের কেউ কেউ আইএসআইএল এবং এ ধরনের গ্রুপের নিপীড়ন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আশ্রয় পেতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছে না। অ্যাকশন বাই ক্রিশ্চানস ফর অ্যাবোলিশন ফর টরচারের আশ্রয় বিষয়ক প্রধান ইভ শাহশাহয়ানি আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, ইউরোপে অভিবাসী ও বিদেশীদের অবস্থান আরো কঠিন হয়ে পড়তে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স ও ইউরোপের চরমপন্থী গ্রুপগুলো সুযোগটি লুফে নেবে, আর এটা নতুন কোনো যুক্তিও নয়। তবে তারা যে ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে সেটা খুবই বিপজ্জনক : সন্ত্রাসবাদী থেকে চলে যাচ্ছে মুসলিম এবং মুসলিম থেকে আরব এবং আরব থেকে অভিবাসী।’

গত জুনে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছিল, সিরিয়া যুদ্ধ বর্তমানে বিশ্বের এককভাবে বৃহত্তম বাস্তুচ্যুতকারী ঘটনা। এই যুদ্ধের কারণেই জার্মানি ও সুইডেনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আশ্রয় প্রার্থীর আবেদন জমা পড়েছে। ফাউন্ডেশন ফর স্ট্যাটেজিক রিসার্চের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ব্রুনো টেরট্রেইস বলেন, ‘আমি যেটার আশঙ্কা করছি তা হলো অভিবাসী স্রোত, বিশেষ করে সিরিয়া থেকে, পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার অযৌক্তিক দাবি ওঠবে।’

নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ায় যে জনমত দেখা যাচ্ছে, সেটা বাস্তব হয়ে পড়লে কেবল ভাবাবেগ নয়, নীতিতেও প্রভাব পড়বে। কেণ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গুডউইন বলেন, ‘সপ্তাহজুড়ে আমরা যা দেখেছি, তাতে মনে হচ্ছে, উগ্র ডানপন্থীরা নির্বাচনে লাভবান হতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।’