Home » অর্থনীতি » ঋণের সুদেই দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব

ঋণের সুদেই দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis-4মাথাপিছু গড় আয় বাড়ছে বা উন্নতি হচ্ছে সত্য, কিন্তু তার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ার পাশাপাশি যদি মাথাপিছু ঋণের পরিমাণও বাড়তে থাকে, তবে তা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হয় না। সম্প্রতি প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে জানা গেল, বর্তমানে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ১৬০ টাকা। অন্যদিকে মাথাপিছু সরকারি ঋণের পরিমাণ ২৬ হাজার ১৫২ টাকা। সবমিলে এইমাত্র যে শিশুটি জন্ম নিল সেও ৩৯ হাজার ৩১২ টাকা ঋণের বোঝা নিয়ে বাংলাদেশের আরেকজন হলো। নিশ্চিতভাবেই এ পরিস্থিতি সুখকর নয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০১৪১৫ অর্থবছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের (পাবলিক সেক্টরে) স্থিতির পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৯০৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ ৭ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। আর জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১৬৯ মার্কিন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ হাজার ১৬০ টাকা। গত বছরের জুনে অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১২ হাজার ৭০০ টাকা। বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ২ লাখ ৭ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে ১১টি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিশ্বব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছে, যার পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৩৪৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’এর এক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধীরে ধীরে মাথাপিছু ঋণ ও সুদ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। তাছাড়া আন্তঃপ্রজন্ম ঋণের বোঝাও বাড়ছে। ২০১৪১৫ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২২ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। যা ২০১৩১৪ অর্থবছরে ছিল ২ লাখ ৩ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। আর ২০১২১৩ অর্থবছরে ছিল ১ লাখ ৮১ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০১৪১৫ অর্থবছরে মোট অপরিশোধিত অভ্যন্তরীণ ঋণ পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। আর ২০১৩১৪ অর্থবছরে মোট অপরিশোধিত বৈদেশিক ঋণ সাড়ে ৮ শতাংশ বেড়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে মোট অপরিশোধিত অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ এখনো বেশি, যদিও সামপ্রতিক সময়ে এ হার কমার প্রবণতা দেখা গেছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দেখায় যে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রতি বছর বাড়ছে, যা দেশের বৈদেশিক সম্পদের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। ২০১৩১৪ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ১২৯ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার ছিল, যার মধ্যে ১০৮ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার আসল এবং ২০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার সুদ হিসাবে পরিশোধ করা হয়। ২০১৪১৫ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি’১৫ পর্যন্ত মোট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৭৯ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়। যার মধ্যে সুদ ও আসল উভয়ই রয়েছে। বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে সরকারের ঋণ বাড়ছে। বাড়ছে অনুন্নয়ন ব্যয়। যা উৎপাদনশীল খাতের বরাদ্দকে সংকুচিত করার মাধ্যমে অর্থনীতিতে উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস করতে পারে বলে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি মত প্রকাশ করে।

সুখী দেশের তালিকায় ভুটানের অবস্থান উপরের দিকেই। জিডিপি প্রবৃদ্ধিও ছিল সন্তোষজনক। কিন্তু অতিমাত্রায় ঋণ নেয়ার কারণে বড় ধরনের ঋণঝুঁকিতে পড়েছে দেশটি। জিডিপিকে ছাড়িয়ে গেছে ঋণের পরিমাণ। ভুটানই শুধু নয়, সরকারি ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে আরো ১৩টি দেশ। আপাতত এ তালিকায় না থাকলেও ঋণগ্রহণে সরকার রক্ষণশীল না হলে এ ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশও।

কোনো দেশ ঋণঝুঁকিতে আছে কিনা, তা নির্ণয় করা হয় তিনটি আন্তর্জাতিক মানদের ভিত্তিতে। জুবিলি অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, কোনো একটি দেশের সরকারি ঋণ যদি জিডিপির ৩০ শতাংশের বেশি হয়, চলতি হিসাবে ঘাটতি ৫ শতাংশ অতিক্রম করে ও সরকারের রাজস্বের ১০ শতাংশের বেশি ঋণ পরিশোধে চলে যায়, তাহলে দেশটি বড় ধরনের ঋণঝুঁকিতে রয়েছে ধরে নেয়া হয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও সরকার যেভাবে বায়ার্স ক্রেডিট নেয়া শুরু করেছে তাতে বিপদ ঘনিয়ে আসার শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গ্রিসের ঋণ সংকটের পর গবেষণাটি করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জুবিলি ডেট ক্যাম্পেইন। এর ভিত্তিতে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিজনেস ইনসাইডার। তাতে ভুটান, কেপভার্দে, ডোমিনিকান রিপাবলিক, ইথিওপিয়া, ঘানা, লাওস, মৌরিতানিয়া, মঙ্গোলিয়া, মোজাম্বিক, সামোয়া, সেনেগাল, তানজানিয়া, উগান্ডাসহ ১৪টি দেশ সরকারি ঋণের কারণে বিপজ্জনক অবস্থানে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কারণে এসব দেশ আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মন্দার কবলে পড়লে গ্রিসের মতো ঋণ পরিশোধে সক্ষমতা হারাবে। পাশাপাশি কোনো কারণে ঋণের সুদহার বেড়ে গেলেও বিপদে পড়বে দেশগুলো।

বৈদেশিক দেনা শোধ করতে না পেরে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে আইসল্যান্ড। বৈদেশিক দেনার দায়ে গ্রিসের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। দেউলিয়া ঘোষণা না করলেও বৈদেশিক ঋণের কারণে নাইজেরিয়া, তানজানিয়া, জিম্বাবুয়েসহ আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ করুণ এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরেও বৈদেশিক ঋণের কারণে এসব দেশের অর্থনীতি এখন মুখ থুবড়ে পড়ছে। তানজানিয়ার অর্থনীতি এখন পুরোটাই বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর। বিদেশী ঋণ না পেলে তাদের পক্ষে উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ পুরো বাজেট করা সম্ভব হয় না। জিম্বাবুয়ের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ তাদের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির কয়েক শত গুণ বেশি। বৈদেশিক ঋণ নির্ভর নাইজেরিয়া এখন সম্পদশূন্য। পাশের দেশ ভারতের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেশি, কিন্তু আয়ের উৎস বেশি থাকায় ঋণ শোধ করতে তাদের তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বাংলাদেশের অবস্থা এক্ষেত্রে স্থিতিশীল হলেও সরকার বর্তমান ধারায় ঋণ নিতে থাকলে যে কোনো সময়ে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ হ্রাস এবং রির্জাভ কমে আসলেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এক্ষেত্রে। সেদিক থেকে দেখলে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি আমরা।

গত পাঁচ বছরে ঋণ ও সুদ পরিশোধে খরচ হয়েছে গড়ে মোট বাজেটের ২২ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ যা বর্তমান বাজেটের প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে অনায়াসে দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। এ ঋণের একটি বড় অংশই সরকারের অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হচ্ছে। যা দেশের মানুষের ওপর ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে।।