Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩৪)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩৪)

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের প্রেক্ষাপট

আনু মুহাম্মদ

Last-4মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্র তৈরি হয় ৬০ দশকের শেষ দিকে। ৬০ দশকের শুরুতে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে চীন ভারতের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বিরোধপূর্ণ অঞ্চল দখল করেও চীন নিজে থেকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। কিন্তু বিরোধের সমাপ্তি হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মতাদর্শিক বিরোধের সাথে সীমান্ত বিরোধ যুক্ত হয় ৬০ দশকের শেষে, এই বিরোধও একপর্যায়ে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করে। সীমান্তের কোথাও কোথাও উত্তেজনা দেখা দেয়, দুই দেশেরই সৈন্য তৎপরতা দেখা যায়। এই সময়ে এশিয়ার চীন সংলগ্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব বলয় বৃদ্ধিতে মরিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নও তার মোকাবিলায় সামরিক রাজনৈতিক বিভিন্নমুখি পদক্ষেপ নিয়ে সক্রিয়। এই পটভূমিতে চীনসোভিয়েত ইউনিয়ন বিরোধ ছিলো যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বশক্তির জন্য বিরাট আশির্বাদ। চেকোশ্লোভাকিয়ায় সোভিয়েত সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি সুবিধা দেয়। চীনের জন্যও তা নতুন যুক্তি যোগ করে।

ভিয়েতনামে মার্কিনী আগ্রাসনের ভয়াবহতা তখন বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আওয়াজ আরও বিস্তৃত করেছে। ভিয়েতনামে হোচি মিনএর নেতৃত্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী দানবের বিরুদ্ধে দুর্বল নারীপুরুষ শিশু বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী অবিস্মরণীয় যুদ্ধ পরিচালনা করছে গ্রামে শহরে পথে ঘাটে। বিশাল শক্তিধর অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন সামরিক বাহিনী ভিয়েতনামের কিশোর তরুণ গেরিলা যোদ্ধাদের হাতে তখন প্রতিনিয়ত কাবু হচ্ছিলো। এই পরিস্থিতিতে চীনসোভিয়েত বিরোধ ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, পরাক্রমশালী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইএ ভিয়েতনাম যাদের ওপর প্রধান ভরসা করছিলো, দিনে দিনে তারাই মতাদর্শিক বিরোধ রাজনৈতিক ও সামরিক বৈরীতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সেকারণে ভিয়েতনামের নেতৃবৃন্দ বারবার সমঝোতার চেষ্টা করতে থাকে। হোচিমিন মৃত্যুবরণ করেন ১৯৬৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চৌএনলাই, কোসিগিনসহ চীন সোভিয়েত দুপক্ষের নেতৃবৃন্দই হ্যানয়ে উপস্থিত হন। ভিয়েতনামের উদ্যোগে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনাও শুরু হয়। সীমান্ত সংঘর্ষ থামানো সম্ভব হলেও রাজনৈতিক বিরোধ বাড়তেই থাকে। এর মধ্যেই চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্নমুখি তৎপরতা শুরু করে। চীনও সাড়া দেয়।

এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ছে। বেশিরভাগ দেশে তার আধিপত্য নিশ্চিত করবার প্রধান অবলম্বন ছিলো সেসব দেশের মার্কিন প্রভাবিত সেনাবাহিনী। ইন্দোনেশিয়ায় সুকার্ণো সরকারকে উচ্ছেদ এবং প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করে সিআইএর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় জেনারেল সুহার্তোর নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল করে ইন্দোনেশীয় সেনাবাহিনী। পাকিস্তানে সেনাশাসনের ওপর প্রথম থেকেই ভর করে ছিলো যুক্তরাষ্ট্র। জেনারেল আইয়ুব এবং পরে জেনারেল ইয়াহিয়া বরাবরই তাদের হাতের মুঠোতেই। মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনেও তখন উগ্র মার্কিনপন্থী সরকার। ইরানের শাহানশাহ ছিলেন উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ক্ষমতার খুঁটি। কোরিয়া ও ভিয়েতনামের একাংশ তখন তাদের দখলে। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের এই অগ্রযাত্রায় তাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন এই দুই বড় সমাজতান্ত্রিক শক্তি। এই দুই শক্তিকে একসাথে মোকাবিলার সাধ্য সাম্রাজ্যবাদের ছিলো না। সুতরাং যখন দুইএর সম্পর্কে ফাটল দেখা দিলো তখন সেই ফাটলে প্রবেশে তারা আর দেরি করেনি। এখানেই পরবর্তী আরও বহুদশকের জন্য সাম্রাজ্যবাদের বিজয় নিশানের খুঁটি পোতা হলো।

১৯৬৮ সাল থেকেই মার্কিন নেতৃবৃন্দ চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে চীনের নামে স্তুতি শুরু করেন। ১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট নিক্সন হেনরী কিসিঞ্জারকে চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য যা কিছু করা দরকার তা করতে নির্দেশনা দেন। কিসিঞ্জার তখন ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রধান পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা। এর পাশাপাশি কূটনৈতিক অন্যান্য পথেও কাজ শুরু হয়। একই বছর ২২ এপ্রিল মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব সরকারের ভাষ্যে প্রথম চীনকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৯৭০ সালের ১৩ অক্টোবর কানাডার সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ঐসময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে চীনের আগ্রহ বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে তখন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান ও রুমানিয়া।

বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের জন্য ভিয়েতনাম যুদ্ধ তখন ছিলো একটি বিশাল অনুপ্রেরণা ও শক্তির উৎস। ভারতের বাংলায় সে সময়ই শুরু হয় চারু মজুমদারের নেতৃত্বে সশস্ত্র সংগ্রাম। পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে একটানা লড়াইএর তুঙ্গে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গণহত্যার মোকাবিলায় বাংলাদেশে শুরু হয় সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ।।

(চলবে…)

তথ্যসূত্র

১। Stanley Karnow: Mao and China, Inside China’s Cultural Revolution, US, 1972. (Chapter: ‘Rejoining the World.’)