Home » বিশেষ নিবন্ধ » নূর হোসেনের গডফাদার কি নেপথ্যেই থেকে গেলো

নূর হোসেনের গডফাদার কি নেপথ্যেই থেকে গেলো

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Dis-2মানবতা বিরোধী শীর্ষ দুই অপরাধীর বিচার এবং ফাঁসীর দণ্ড কার্যকরে সৃষ্ট জাতীয় আবেগউচ্ছাসে ধামাচাপা পড়ে গেছে ভয়ঙ্কর এক খুনী ও তার গডফাদারের প্রসঙ্গ। সেদিক থেকে নুর হোসেন অবশ্যই ভাগ্যবান। এক্সট্রাডিশান চুক্তির আওতায় অনুপ চেটিয়ার ভারত ফিরে যাওয়া, আর নুর হোসেনের ফিরে আসা। মিডিয়া কয়েকদিন তুলকালাম করলেও যথারীতি এখন ব্যস্ত দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি ও এর পরবর্তী খুঁটিনাটি রিপোর্ট করা নিয়ে। যেদেশে আসামী গ্রেফতার হলেই রিমান্ড আবেদন হয় সাত থেকে দশ দিনসেই দেশের পুলিশ এগারটি মামলার আসামী নুর হেসেনের রিমান্ড আবেদন করেনি, এরচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনা ২০১৫ সালে আর আছে?

পুলিশ বলছে, রিমান্ডের প্রয়োজন নেই, তাদের সব জানা হয়ে গেছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও রয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট রয়েছে। মামলাটি এখন ট্রায়ালে। সুতরাং রিমান্ডের প্রয়োজন নেই। কি অকাট্য যুক্তি! বাদীপক্ষ বলছে, নুর হোসেনকে রিমান্ডে নিলে সব জানা যাবে। মূল পরিকল্পনা এবং এর সাথে জড়িতদের নাম বেরিয়ে আসবে। চার্জশীটের সাথেও তারা একমত নন। তাদের নারাজি গৃহীত হয়নি। উচ্চ আদালতে যাবার কথা বলছেন তারা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিধ্বনি করেছেন, কাউকে ছাড় দেবেন না। এমনকি সংসদ সদস্য শামীম ওসমান জড়িত থাকলেও আইনের আওতায় আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কিভাবে?

নারায়নগঞ্জে অপহরণ ও খুন হয়েছিল সাতজন। মূল টার্গেট ছিল একজন, কাউন্সিলর নজরুল। এই অপহরণ ও হত্যার আপাত দৃশ্যমান পরিকল্পনাকারী নুর হোসেন আর এক্সিকিউশনার র‌্যাব কর্মকর্তারা। নিহত নজরুল ও নুর হোসেন উভয়ই আওয়ামী লীগ নেতা। দু’জনই শীর্ষ সন্ত্রাসী, কোটিপতি ও বিশাল বাহিনীর নিয়ন্ত্রক। দু’জনের গডফাদার একজনইআঙুল আগেই উঠেছে দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী এক সংসদ সদস্যের দিকে। ছয় কোটি টাকার ডিল ও হত্যাকাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত র‌্যাব অধিনায়ক একজন মন্ত্রীর জামাতা। সেই সূত্রে ঐ মন্ত্রীপুত্রের নাম হত্যাকাণ্ডে উচ্চারিত হয়েছিল। সে সময়ে দায়িত্বরত ডিসি ও এসপি’র প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকাও ব্যাপকভাবে আলোচিত ছিল।

কাকতালীয় হলেও নুর হোসেনের সাথে খুলনার প্রয়াত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের অদ্ভুত মিল রয়েছে। ঘাটের কুলি থেকে এরশাদ শিকদারের উত্থান। এক সময় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে জাতীয় পার্টিতে যোগদান এবং সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করে সে। তারও গডফাদার ছিল একজন সংসদ সদস্য এবং তার অস্ত্রভান্ডারটি ছিল ঐ গডফাদারের কাছে। এরশাদের ফাঁসি হয়ে গেলেও ঐ গডফাদার নিরাপদ রয়ে গেছেন এবং তিনি এখনও সংসদ সদস্য।

কপর্দকহীন না হলেও ট্রাক ড্রাইভার থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী নুর হোসেন জাতীয় পার্টি, বিএনপি হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিল এবং কাউন্সিলরও নির্বাচিত হয়েছিল। তারও গডফাদার প্রভাবশালী এক সংসদ সদস। এরশাদ বা নুর হোসেনের শুরু খুবই সাধারন, কুলি বা ট্রাক ড্রাইভার হিসেবে। বংশ পরিচয় বা উত্তরাধিকার সূত্রে তারা কেউই এমন কোন পরিবারের সদস্য নয়, যার সুবিধা পাবে। এ ধরনের চরিত্রকে হচ্ছে বলির পাঁঠা। ভয়ঙ্কর সব অপরাধ এদের দিয়ে করানো হয়, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে এদের হত্যা বা আইনে সোপর্দ করা হয়। আন্ডারগ্রাউন্ড বা সংগঠিত অপরাধ জগতের সকলেই এটি মানে এবং জানে।

এই হত্যাকাণ্ডের শুরুতে ভারতে পলায়নকালে নুর হোসেনের সাথে গডফাদারের ফোনালাপের যে অডিওটি মিডিয়ায় বাজানো হয়েছিল, এখনও হচ্ছে, তদন্তে সেটিকে কখনও গুরুত্ব দেয়া হয়নি। প্রসঙ্গত: নরসিংদীর মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা লোকমান হত্যায় নিয়োজিত তদন্ত টিম সাত খুনের তদন্ত করেছে। সুতরাং নরসিংদীতে যেমনটি, নারায়নগঞ্জেও খুব একটা হেরফের হয়নি। তদন্তকারীরা ঘটনার পরিকল্পনাকারীকে চিহ্নিত করেনি বা করতে দেয়া হয়নি। এটা খুব বিষ্ময়কর যে, র‌্যাবের মত এলিট ফোর্সের কতিপয় অফিসার একজন কাউন্সিলরের পরিকল্পনায় সাতজন মানুষকে অপহরন ও খুন করে নদীতে ডুবিয়ে দিয়েছে, এর পশ্চাতে বড় কোন পরিকল্পনা নেই বা ক্ষমতাবানরা জড়িত নয়, এটি অন্তত: কেউ বিশ্বাস করে না।

১৯৭৪ সালে সংঘটিত মহসীন হলের সেভেন মার্ডারের পরে দেশজুড়ে আলোড়িত এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী গডফাদারটির নাম দেশবাসীর জানা আছে। কিন্তু তিনি নিজেকে দৃশ্যপট থেকে আড়াল রাখতে পেরেছেন, কারন এটি সব সম্ভবের দেশ। সমস্ত ঘটনার ফেনিফিসিয়ারীও তিনি। তার সাম্রাজ্য আপাতত নিষ্কন্টক। নজরুলনুর হোসেনের মত সন্ত্রাসীরা দৃশ্যপট থেকে বিদেয় নিয়েছে। জুনিয়র ক্যাডারদের মাধ্যমে এলাকায় এখন পূর্ণ আধিপত্য। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের স্নেহের ছায়া এবং তার পরিবারের নিরাপত্তার অঙ্গীকার। র‌্যাবও বিতর্কিত, ফলে ত্বকী হত্যাকাণ্ডের চাপও ভালভাবে সামাল দেয়া গেছে।

কিশোর ত্বকী হত্যায় অভিযুক্ত গডফাদারের ভাইপো। তদন্ত করতে গিয়ে ভাইপো’র টর্চার সেলের সন্ধান পেয়েছিল র‌্যাব। এরপরেই বদলী হয়ে যান র‌্যাবের তৎকালীন সিও। পরের সিও মামলাটির চার্জশীট দেয়ার উদ্যোগ নেন। গডফাদারের প্রচণ্ড চাপ আসে চার্জশীট থেকে ভাইপোর নাম বাদ দেয়ার জন্য। বিষয়টি মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়ে পড়লে নুর হোসেনের মাধ্যমে র‌্যাবকে দিয়ে সাতখুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ফিরে দেখা যাক, ভারতে পলায়নকালে নুর হোসনের সাথে শামীম ওসমানের ফোনালাপ মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে প্রতিক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের দিকে। ঐ সম্মেলনে যে কথাগুলো শামীম ওসমান বলেছিলেন, তার মধ্যে সাতখুন মামলার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমান বলেছিলেন, নুর হোসেনকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে র‌্যাব। তিনি দাবি করেন, এমপি হিসেবে তার ষ্ট্যাটাস সচিব বা মেজর জেনারেল পদবীর ওপরে। অথচ তাকে হুমকি দিচ্ছে অনেক নিচের পদবীর অফিসার। বলেছে, আমরা না বাঁচলে আপনিও বাঁচবেন না। আরো দাবি করেন, তার মৃত্যুর হুমকি রয়েছে। যে কোন দিন একটা বা দুটো গুলিতে তাকে মেরে ফেলা হতে পারে। তার মতে, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রাফিউর রাব্বিকে গুম করে দায় চাপিয়ে দেয়া হতে পারে। এরও আগে শামীম ওসমান মিডিয়ায় দাবি তুলেছিলেন, সাত খুনের ঘটনার দশ মিনিটের মধ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন।

রহস্যময় বিষয় হচ্ছে, সিভিল বা পুলিশিকোন তদন্তে সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের এরকম অভিযোগ আমলে নেয়া হয়নি। সম্ভবত: তার এই বক্তব্যের মধ্যে সাত খুনের অনেক বিষয়ই রয়েছে যা অধিকতর তদন্তের দাবি রাখে। নুর হোসেনকে রিমান্ডে না নেয়া আরেক রহস্য। এই হত্যা মামলার প্রাণ ভোমরা রয়েছে তার কাছে। নারায়নগঞ্জের এসপি বলছেন, রিমান্ডের সুযোগ নেই। কিন্তু আইনজীবিরা, বিশেষ করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল সদস্য শ. ম রেজাউল করিম জানাচ্ছেন, মামলার সুষ্ঠ বিচার ও অভিযোগ প্রমানে পুলিশের পক্ষ থেকে আবেদন করলে আদালত নুর হোসেনকে রিমান্ডে দিতে পারেন। কিন্তু তা হয়নি। এজন্যই কি আদালতে হাজির করার সময় নুর হোসেনের মুখে স্বস্তির হাসি ছিল? সেকি নিশ্চিত ছিল তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।

ভারত থেকে নুর হোসেনকে ফিরিয়ে অনার পর বাদীপক্ষের দাবি অধিকতর তদন্তের। ন্যায় বিচারের স্বার্থেই এটি প্রয়োজন। সাত খুনের মত অর্গানাইজড ক্রাইমের ল্যান্ডমার্ক ধরে বিশ্লেষণ করলে কতগুলি বিষয় পরিস্কার হবে ও প্রশ্ন উঠবে; এক. এই খুন পরিকল্পিতকাকতালীয় যাই হোক না কেন নারায়নগঞ্জসিদ্ধিরগঞ্জে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গডফাদারের। ২০১৩২০১৪ সালে নজরুলনুর হোসেন কি ক্রমশ তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছিল? দুই. সরকারের অঙ্গ বা প্রতিষ্ঠান কি এই খুনের ঘটনায় দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল, যারা নাকি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার সাথে যুক্ত? ব্যক্তির অঙ্গুলি হেলনে পরিচালিত প্রশাসন কি জনগণের বদলে অপরাধীদের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করেছে? তিন. এই ধরনের অর্গানাইজড ক্রাইমের একটি ধারাবাহিকতা ও ইতিহাস থাকে। ২০০৭ থেকে নজরুলনুর হোসেনের সশস্ত্র যুদ্ধে একসময়ে গডফাদারের সেল্টার লাভ করে নুর হোসেন। ২০১১ থেকে গডফাদারের কথিত ছোট ভাই হিসেবে সে এবং নজরুল গড়ে তোলে নারায়নগঞ্জের অপরাধ জগৎ। নজরুল নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলেও ২০১৪ সালের শুরুতে আবার শেল্টার নেয় গডফাদারের। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত নুর হোসেনের প্রকাশিত ক্ষোভ গডফাদারের কানে পৌঁছায়। অন্যদিকে ত্বকী হত্যাকাণ্ডে র‌্যাবের চাপ ও নজরুলনুর হোসেনকে টাইট দেবার জন্য কি সাত খুনের আয়োজন করা হয়? পলায়নকালে নুর হোসেনের আর্তি ছিল, “… ভাই, আপনি আমার বাপ লাগেন, আমার অন্যায় হয়ে গেছে, আমারে বাঁচান..”

এই অর্গানাইজড ক্রাইমের পেছনের ইতিহাস ও ধারাবাহিকতা, পারস্পরিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কানেকশন মামলার সামগ্রিক তদন্তকালে আমলে নেয়া হয়নি বলে ধরে নেয়া যায়। এর সাথে র‌্যাব, পুলিশপ্রশাসন, সংসদ সদস্য ও সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের জড়িত থাকার অভিযোগ এবং ধারাবাহিকতার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে ঘটনার নেপথ্যের কুশীলবরা নিরাপদ থাকছেনএই পারসেপশন নারায়নগঞ্জসহ দেশের মানুষের। সাতখুন সংঘটিত হবার পর থেকে এ পর্যন্ত সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের বক্তব্য গুরুত্ব পায়নি। অন্যদিকে, নুর হোসেনকে কোনরকম জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি, কেন, প্রশ্ন থেকেই গেল।

এই দেশে অনেকগুলি হত্যাকাণ্ডে খুনীদের বিচার নিশ্চিত করা গেলেও নেপথ্যের কুশীলবদের সামনে আনা যায়নি। তারা থেকে গেছে রাজনৈতিক বক্তব্যবিবৃতিতে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সপরিবারে হত্যাকাণ্ড এবং জেলখানায় চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডের মত অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ খুনীদের বিচারের মুখোমুখি এবং শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। জিয়া হত্যার বিচার হয়নি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোড়িত হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্তের সামগ্রিকতায় ব্যর্থতায় সত্যিকারের অপরাধীরা নিরাপদ থেকেছে।

সাতজন মানুষের অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নারায়নগঞ্জের অপরাধ জগতের ধারাবাহিকতার একটি অংশ মাত্র। এর সাথে রাজনীতি, অর্থনৈতিক লাভালাভ, প্রভাব জড়িয়ে আছে। নেপথ্যে গডফাদার রয়েছে এবং সরকারী একটি সংস্থার কর্মকর্তারা অপরাধে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এটি কোন সাধারন ঘটনা ছিল না এবং এর রহস্য উদঘাটনে সরকারের সর্বশক্তি নিয়োগ করা জরুরী ছিল। এখনও সে সুযোগ রয়েছে। যেমনটি বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শামীম ওসমান জড়িত থাকলে আইনের আওতায় আসবে। এই কথাটি যেহেতু তিনি বলেছেন, সে কারনে শামীম ওসমান জড়িত কি জড়িত নন, এটি প্রমানের জন্য মামলাটির অধিকতর তদন্ত প্রয়োজননিশ্চয়ই তিনিও এ ব্যাপারে একমত, এটি জনগণ বিশ্বাস করে।।