Home » আন্তর্জাতিক » প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৮৫৭ :: পুনঃঅনুসন্ধান (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৮৫৭ :: পুনঃঅনুসন্ধান (দ্বিতীয় পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো

Last-5শোনা যায়, এই বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল এক ধরনের ধর্মীয় অনুভূতি থেকে। ইংরেজ শাসকরা এনফিল্ড রাইফেল নামে এক ধরনের রাইফেলের প্রচলন করে, যার কার্তুজ দাত দিয়ে ছিড়ে বন্দুকে পুরতে হতো। রটনা হয়েছিল যে, ঐ কার্তুজে শুকর ও গরুর চর্বি মেশানো আছে। এতে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্পদায়ের সিপাহীরা ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠেন। এবং এর থেকেই বিদ্রোহের সূত্রপাত। বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক সূত্রপাতের জন্য হয়তো এটাকে কারণ হিসেবে চিহিৃত করা যেতে পারে। কিন্তু বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল আরও গভীরে। আগেই বলেছি সিপাহীদের মধ্যে স্বাধীনতা স্পৃহা ও বৃটিশ বিরোধী ঘৃণা কাজ করছিল। সিপাহী বিদ্রোহ সর্বভারতীয় জাতীয় চরিত্র লাভ করেছিল। সিপাহী বিদ্রোহের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি উল্লেখ করা যাক।

১১ মে ১৮৫৭ মিরাট সেনানিবাসের ভারতীয় সৈন্যরা বৃটিশ অফিসারদের হত্যা করে দিল্লীর দিকে রওনা হন। দিল্লী গ্যারিসনের ভারতীয় সৈন্যরা তাদের সঙ্গে যোগদান করেন। দিল্লী বিদ্রোহীদের দখলে চলে আসে। দিল্লীর মোগল বাদশা দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে বাধ্য করা হয় বিদ্রোহীদের পক্ষে অবস্থান নিতে এবং বৃদ্ধ বাদশাকে সারা ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা করা হয়। বাহাদুর শাহকে সারা ভারতের ঐক্যের ও স্বাধীনতার প্রতীক রূপে ধরা হয়েছিল। এতে বৃটিশ বিরোধী হিন্দু মুসলমান জনতা ও সিপাহীদের ঐক্যমত ছিল। দিল্লীর মুসলমান উলেমারা বৃটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে পবিত্র ধর্মযুদ্ধ বলে ফতেয়া দিয়েছিলেন।

সিপাহী অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে উত্তর ভারতের আলিগড় (২১ মে), বেরিলি (৩১ মে), লক্ষ্ণৌ (৩১ মে) এবং কানপুর (৪ জুন) বৃটিশ শাসনমুক্ত হয়।

প্রত্যেকটি মুক্ত শহরে এক ধরনের প্রশাসন চালু করা হয়। বেরিলিতে প্রশাসনিক প্রধান হয়েছিলেন লিয়াকত আলী। পটনায় অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পীর আলী।

দিল্লীতে সিপাহীদের ছয়জন ও নগরীবাসীর চারজন নিয়ে একটি কমিটি (জলসা) গঠন করা হয়েছিল, যারা প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন।

এই মহা বিদ্রোহে যারা প্রধান নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন নানা সাহেব, তাতিয়া তোপি, আজিমুল্লাহ খান, আহম্মদ উল্লাহ, ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাই প্রমুখ। তারা আমাদের জাতীয় বীর এবং আজও তাদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

১৪ সেপ্টেম্বর দিল্লীর পতন ঘটে। বৃটিশরা বিভিন্ন স্থান থেকে গোরা সৈন্য এবং বৃটিশ অনুগত ভারতীয় সৈন্য জড়ো করে দিল্লীর উপর আক্রমণ চালায়। দিল্লীর স্বাধীনতা যোদ্ধা ভারতীয় সৈন্যের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল আশেপাশের গ্রামবাসীরাও। তবু দিল্লীর পতন রোধ করা যায়নি। পাঁচদিন যুদ্ধের পর দিল্লীর পতন হয়। বাহাদুর শাহকে বন্দী করে রেঙ্গুনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁর দুই পুত্রকে তখনি হত্যা করা হয়। দিল্লী বিজয়ের পর সেখানে ইংরেজরা যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তার বীভৎসতার কথা বোম্বের বৃটিশ গভর্নর এলফিনস্টোন পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

দিল্লীর পতন হলেও লক্ষ্ণৌ, কানপুর ইত্যাদি শহর তখনো দেশপ্রেমিক সিপাহীদের দখলে ছিল। অন্ততঃ এই দুই শহর দখল পাল্টা দখলের জন্য ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে কয়েকবার তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। এই সকল যুদ্ধে তাতিয়া তোপির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। গোয়ালিয়ারের রাজা বৃটিশের পক্ষে থাকলেও তার সৈন্যরা তাতিয়া তোপির সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন এবং কানপুরে বৃটিশ বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।

১৮৫৮ সালের ১১ মার্চ লক্ষ্ণৌর পতন ঘটে। ১৮৫৮ সালের মে মাসে বেরিলির পতন ঘটে। বিদ্রোহীদের প্রধান ঘাটিগুলির পতন ঘটার পর যুদ্ধের পরিস্থিতি শত্রুপক্ষ অর্থাৎ ইংরেজের অনুকূলে চলে যায়। এই মহা বিদ্রোহে এক তরুণী রাজকন্যা, ঝাসি রানী লক্ষীবাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ক্ষুদ্র দেশীয় রাজ্য ঝাসিতে রাজত্ব করছিলেন লক্ষীবাই। ঝাসির জনগণ বৃটিশ বিরোধী অভ্যুত্থানের প্রয়াস গ্রহণ করেন এবং কয়েকজন বৃটিশকে হত্যা করেন। এই অজুহাতে বৃটিশ সেনাপতি ঝাসি দখলের জন্য ঘেরাও করলে লক্ষীবাই স্বীয় দুর্গ রক্ষার্থে সামরিক কমাণ্ড গ্রহণ করেন। এক পর্যায়ে তাতিয়া তোপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃটিশ বিরোধী যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ঝাসির রাণী যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হন। তাতিয়া তোপি বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ধরা পড়েন এবং ১৮৫৯ সালের ১৮ এপ্রিল ফাসির মঞ্চে জীবনদান করেন।

১৮৫৮এর মাঝামাঝি দিকেই বিদ্রোহের পরাজয় ঘটেছিল। তারপরও বেশ কিছুদিন পর্যন্ত গেরিলা যুদ্ধ চলছিল। কিন্তু তা বিকাশ লাভ করেনি। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরবর্তীতে ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছিল।

তিন

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধই শুধু ছিল না, ভারতবর্ষের সমগ্র ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম সশস্ত্র গণবিদ্রোহ। কেন্দ্রের শাসনের বিরুদ্ধে বিশেষ অঞ্চলের রাজা বা সামন্তপ্রভূদের বিদ্রোহের ঘটনা বৃটিশ পূর্ববর্তী ইতিহাসে বেশ দেখা যায়, যেমন মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মারাঠিদের (শিবাজীর নেতৃত্বে) বিদ্রোহ ইত্যাদি। কিন্তু ইউরোপের ইতিহাসে যে ধরনের গণবিদ্রোহ, বিরাট আকারের কৃষক অভ্যুত্থানের (যথা জার্মানীতে কৃষক যুদ্ধ) ঘটনা দেখা যায় ভারতবর্ষে তা দেখা যায় না। হেগেল সে জন্য বলেছিলেন, ‘‘হিন্দুদের কোন ইতিহাস নাই’’। অথবা ‘‘একটি পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক শর্তে বিস্তৃত হবার মতো বৃদ্ধিও এদের নাই’’। মার্কস তাঁর ভারত সংক্রান্ত গবেষণায় হেগেলের মতো করে না হলেও বৃটিশ পূর্ববর্তী যুগের নিশ্চল সমাজের কথা বলেছেন। কিন্তু মার্কসবাদী ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব মনে করেন যে, মার্কস বর্ণিত ইতিহাসের চালিকাশক্তি শ্রেণী সংগ্রাম ভারতের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য ছিল এবং ভারতবর্ষের ইতিহাসে শোষিত শ্রমজীবীর অনেক সশস্ত্র সংগ্রামের ঘটনা তিনি তুলে ধরেছেন। তবু একথা সত্য যে, জাতীয় ভিত্তিক মহাবিদ্রোহ ১৮৫৭এর আগে কখনও দেখা যায়নি। এমনকি ১৮৫৭এর মহাবিদ্রোহের উৎসাহী সমর্থক হয়েও মার্কস স্বীকার করেছেন, ‘‘ভারতবর্ষীয় এই বিদ্রোহে ইউরোপীয় বিপ্লবের বৈশিষ্টগুলো পাবার আশা করা নিরর্থক’।

তবু ঐতিহাসিক বিচারে ১৮৫৭এর গণবিদ্রোহ একটি বিরাট তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। অনেকে এটাকে গণবিদ্রোহ বলতে রাজী নন। তারা কেবল ক্ষুদ্র সামন্তদের বা রাজন্যবর্গের বিদ্রোহের বেশী কিছু বলতে রাজী নন। আমার মতে, এই রকম ধারণা সম্পূর্ণই ভুল। এবং মার্কস সঠিকভাবেই এটাকে স্বাধীনতার যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। একথা ঠিক যে, বিদ্রোহ বা সশস্ত্র যুদ্ধের নেতৃত্ব ছিলেন প্রধানত সামন্তরা। যে সকল জমিদার বা সামন্তপ্রভুদের বৃটিশরাজ সম্পত্তিচ্যুত করেছিল, তারা এই বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন। একথা সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে গরীব মানুষ, সাধারণ মানুষ এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত সিপাহীরা যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন, তাও সত্য। বিদ্রোহের সেনানায়কদের অনেকে আবার বেশ উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন, যেমন আজিমুল্লাহ খান (তিনি ইতিপূর্বে দুইবার ইউরোপ ভ্রমণ করেছিলেন, সে যুগে ইউরোপ ভ্রমণকারী ভারতীয়দের সংখ্যা খুব কম ছিল)। অথবা এলাহাবাদে যিনি অভ্যুত্থানের এবং বিদ্রোহীদের প্রশাসনের নেতা ছিলেন, তিনি হচ্ছেন মৌলভী লিয়াকত আলী, একজন স্কুল শিক্ষক ও ওহাবি মতাবলম্বী।।

(চলবে…)