Home » অর্থনীতি » লিবিয়া :: যুদ্ধ যেখানে শুধুই তেলের জন্য

লিবিয়া :: যুদ্ধ যেখানে শুধুই তেলের জন্য

নিকোলাস লিন, ফরেইন পলিসি ম্যাগাজিন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Last-1লিবিয়ার জীবনরক্ত হলো তেল। দেশটির সত্যিকার অর্থে অন্য কোনো শিল্প নেই, চাকরির আর তেমন উৎস নেই। তেলই সেখানকার একমাত্র ব্যবসা। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, সরকারি বাজেটের ৯৫ শতাংশের বেশি আসে তেল রাজস্ব থেকে। আর প্রায় ৮০ ভাগ লিবীয় সরকারি বেতনের আওতায় থাকায় যদি বলা হয় যে তেলই তাদের খাওয়াচ্ছেপরাচ্ছে, তবে তা অতিরঞ্জিত কিছু বলা হয় না। অন্য কোনো দেশই একটি মাত্র সম্পদের ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল নয়। লিবিয়ার প্রায় পুরোটাই মরুভূমি। আবাদযোগ্য জমির মারাত্মক অভাবের কারণে তারা নিজেদের খাবার নিজেরা উৎপাদন করতে পারে না। ফলে তেল রাজস্ব না থাকলে লিবিয়া নামের দেশটির অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। তেল রফতানি না হলে টাকা আসবে না, টাকা না থাকলে খাবারও জুটবে না।

যুদ্ধ আর গৃহযুদ্ধে লিবিয়ার একমাত্র রফতানি আয়টি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির আমলে যে উৎপাদন হতো, এখন তার এক চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। আর তা থেকে যে আয় হচ্ছে, সেটা নানা হাতে পড়ছে, আসল কাজে লাগছে না।

২০১৪ সালের মে মাস থেকে লিবিয়ায় দুটি প্রতিদ্বন্দ্বি সরকারের অস্তিত্ব রয়েছে। গত বছরের জুনে প্রতিনিধি পরিষদের (এইচওআর) নির্বাচনের সময় ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম, সেইসাথে ইসলামি ও মিলিশিয়া ব্লকগুলো অভিযোগ করেছে, তাদের প্রতিনিধিত্ব যথাযথ হারে হয়নি। এর জবাবে সাবেক পার্লামেন্ট জেনারেল ন্যাশনাল কংগ্রেস (জিএনসি) ত্রিপোলিতে সম্মেলন আহ্বান জানিয়ে দাবি করে, তারাই লিবীয় জনগণের একমাত্র আইনসম্মত প্রতিনিধি। এইচওআরও একই দাবি করেছে। আর আন্তর্জাতিকভাবে এই দুই সরকারের একটি স্বীকৃতি, সেটা হলো পূর্বাঞ্চলীয় নগরী তবরুকের সরকার।

লিবীয় সরকার দুইভাগে বিভক্ত হওয়ায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই খণ্ডিত হয়ে গেছে। উভয় সরকার তাদের নিজ নিজ এলাকায় আলাদা বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা করছে, পৃথক সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে।

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভক্তি ঘটেছে লিবিয়া সরকারের তেল উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ওয়েল কোম্পানিতে (এনওসি)। তেল লিবীয় অর্থনীতির মূল উপাদান হওয়ায় এনওসি ছিল দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। গাদ্দাফির আমলে এর সদর দফতর রাজধানী ত্রিপোলিতে ছিল। কিন্তু গত ডিসেম্বরে তবরুক সরকার নিজেরা আলাদা এনওসি গঠন করে বলেছে, এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই কাজ তেল উৎপাদন ও রফতানি করতে হবে। তাদের যুক্তি হলো, যেহেত আন্তর্জাতিকভাবে তারাই স্বীকৃত সরকার, কাজেই তাদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সবকাজ হতে হবে।

গত মার্চে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কূটনীতিকরা ন্যাশনাল ওয়েল কোম্পানিসহ লিবিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো নিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করে। তাতে বলা হয়, এগুলো স্বাধীন থাকবে, উভয় সরকারের সাথে নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। এই প্রস্তাবটি পাসের সময় দেশটির বেশির ভাগ তেল ও রফতানিকারক বন্দর ছিল তবরুকের নিয়ন্ত্রণে। আবার সব চুক্তি হয়েছিল ত্রিপোলির জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। জাতিসংঘ প্রস্তাবে স্থিতিবস্থা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছিল। তাতে দুই সরকারের মধ্যে আয় সমানভাবে ভাগাভাগি করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, এসব চুক্তির কাগুজে মূল্য যাই থাকুক না কেন, বাস্তবে কোনোই দাম নেই।

নিজস্ব জনবল ও কারিগরি জ্ঞান না থাকায় এনওসি বিদেশী তেল কোম্পানিগুলোকে দিয়েই তেল কূপ অনুসন্ধান, খনন ও উৎপাদনের কাজ করাতো। এনওসি স্রেফ তদারকির কাজ করেই সন্তুষ্ট থাকত। কাজেই এখনো তাকে তেল উত্তোলন, রফতানির কাজ করতে হলে বিদেশী কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হবে।

তবরুক সরকার ত্রিপোলির প্রতিদ্বন্দ্বিদের বাদ দিয়ে নিজেরাই সব তেলরাজস্ব চাচ্ছে। গত আগষ্টে তবরুক সরকার লিবিয়ান তেল কোম্পানির প্রকৌশলী নাগি আলমাগরেবিকে এনওসির নতুন চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে এই আশায় যে, তিনি বিদেশী কোম্পানিগুলোর সাথে তেল চুক্তি নিশ্চিত করতে পারবেন। তিনি উদ্যোগও নিয়েছিলেন। মাল্টায় বিদেশী কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। কিন্তু উপস্থিতি ছিল খুবই সামান্য, বিশেষ করে বড় বড় কোম্পানি তাতে যোগ দেয়নি।

ব্রিটেনের বিপি, ইতালির ইনি, ফ্রান্সের টোটালের মতো বেশির ভাগ বড় কোম্পানিই এখন ত্রিপোলি সরকারের সাথে কাজ করতে আগ্রহী। এদিকে, জাতিসংঘ তবরুক ও ত্রিপোলির মধ্যে সমঝোতার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তেমন অগ্রগতি হাসিল করতে পারেনি। বরং দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

লিবিয়া অনেকগুলো উপজাতি নিয়ে গঠিত। প্রত্যেকেরই আলাদা স্বার্থ রয়েছে। তারা আবার প্রতিনিয়ত দল বদলাতে থাকে। যাদের হাতে শক্তি ও অর্থ থাকে, সাধারণত তাদের পক্ষেই তারা থাকে। তারা আবার অনেক সময় নিজেরা তেল কুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করে মুনাফা লাভের আশায় থাকে। ফলে দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা খুব সহজ কাজ নয়। অর্থাৎ জাতিসংঘ কিংবা ত্রিপোলি কিংবা তবরুক নয়, লিবিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাগ্য চূড়ান্ত পর্যায়ে নির্ভর করছে এসব উপজাতীয় গ্রুপের ওপর। এ কারণেই এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, লিবিয়া সমস্যার সমাধান করতে হলে স্থানীয় উপজাতীয় ও স্থানীয় জনসাধারণকে নিয়েই কিছু করতে হবে। রাজনীতিবিদেরা আসলে কোনো বিষয়ই নয়।।