Home » রাজনীতি » সরকার কি এসব নিয়ে ভাবছে?

সরকার কি এসব নিয়ে ভাবছে?

হায়দার আকবর খান রনো

Dis-1প্যারিসে ইসলামী জঙ্গী, উগ্রবাদী দল আইএসএর সন্ত্রাসী হামলা এবং বাংলাদেশে সম্প্রতি সংঘটিত বিদেশী নাগরিক হত্যা এমনকি ধারাবাহিক ব্লগার ও প্রকাশক হত্যা ও হত্যা চেষ্টার মধ্যে একটা গভীর যোগসূত্র আছে। বাংলাদেশে যারা হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, তারা সরাসরি আইএসএর সংগঠনভুক্ত কিনা জানি না। তবে তারা যে একই ভাবাদর্শের অনুসারী, ইসলামী চরমপন্থী এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রত্যেকটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে কি আত্মতৃপ্তি লাভ করছেন তা বোঝা বেশ কষ্টকর। প্রধানমন্ত্রী ও তিনি বার বার বলছেন, ‘আইএস নাই’। এ কথা বলে কোন বিদেশী প্রভূকে আশ্বাস্ত করতে চায় এই সরকার তাও বোধগম্য নয়। অথবা তারা কি জনগণকে দুশ্চিন্তামুক্ত করতে চায়? মনে হয় তেমনটি ভাবা কষ্টকল্পনা মাত্র। কারণ যারা নির্বাচিত নয়, জনগণের কাছে যাদের দায়বদ্ধতা নেই, তারা জনগণের ভালোমন্দ, ভাবনাদুর্ভাবনা নিয়ে কি মাথা ঘামায়? বরং প্রতিটি হত্যা তাদের জন্য একটি অজুহাত এনে দেয়, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির বিরুদ্ধে আক্রমণকে আরও জোরদার করার।

সরকার এই সকল ঘটনাকে যতো হালকা করেই দেখুক না কেন, আসলে এই সকল হত্যাকাণ্ড দেশকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। একই সাথে সরকারের পর্বত প্রমাণ ব্যর্থতাও জনগণের সামনে পরিষ্কার হয়ে দেখা দিয়েছে। চেকপোস্টে পুলিশও আক্রান্ত হয়। সরকার কার্যকরি পদক্ষেপ নেয়ার বদলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ঘাড়ে দোষ চাপাতেই অধিক আগ্রহী।

অল্প সময়ের ব্যবধানে তিন বিদেশী হত্যা, একজন খ্রিস্টান যাজককে হত্যা প্রচেষ্টা, দুই প্রহরারত পুলিশ হত্যা, শিয়াদের ধর্মীয় মিছিলে বোমাবাজি ও হত্যা এ সব একই সূত্রে বাধা। আর তা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে ধর্মের নামে বিভৎস সন্ত্রাসী গ্রুপের বিস্তার লাভ করেছে।

এরা দেশের শত্রু, মানবতার শত্রু, ইসলামেরও শত্রু। ইসলাম কখনই এই রকম সন্ত্রাস অনুমোদন করে না। আত্মহত্যা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ। আত্মঘাতী বোমার দ্বারা যারা সন্ত্রাস চালাচ্ছে তারা কি ইসলামের সেবা করছে নাকি সর্বনাশ করছে?

ইসলামী জঙ্গীবাদ এখন আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশে তারই হাওয়া লেগেছে। তাই বাংলাদেশের সন্ত্রাসী তৎপরতা আর প্যারিসের ঘটনা একই সূত্রে গাথা। এই প্রসঙ্গে মার্কিনসহ পশ্চিমাদের ভূমিকাকেও আড়াল করলে ভুল হবে এবং ওই জঙ্গী মারাত্মক শত্রুকে পরাজিত করা যাবে না। অনেকেরই জানা যে, আল কায়েদার আগের সংগঠন তালেবান একদা মার্কিন প্রশাসনের হাতেই তৈরি হয়েছিল। এটা অনেকের মধ্যেই ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, আইএসও তাদের হাতেই সৃষ্টি। সিরিয়ার আসাদ সরকারকে ফেলে দেয়ার লক্ষ্যে তারা যেমন আসাদ বিরোধী শক্তিকে মদদ দিয়ে চলেছে, তেমনই শিয়া বিরোধী সুন্নী মুসলমানদের জঙ্গী সংগঠন আইএসকে তারাই আসলে লালন করেছিল। অস্ত্র সরবরাহ করেছে মার্কিনের বশংবদ সৌদি রাজতন্ত্র। সহযোগিতা করেছিল তুরস্কের সরকার। আইএসএর বিরুদ্ধে সাহসী লড়াই করে যে বিপ্লবী কুর্দি নারী বাহিনী পশ্চিম কুর্দিস্তান বা রোজাভার জনগণকে রক্ষা করেছিল, মার্কিন প্রশাসন ও তুরস্কের সরকার কিন্তু সেই বিপ্লবী নারী বাহিনী ও মুক্তি সংগ্রামীদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। এটা ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা যে কুর্দিস্থানের বিপ্লবী নারীরা ‘কুবানা’ অঞ্চলকে মুক্ত করেছেন আইএস, আল নাসারা এই ধরনের মুসলিম জঙ্গী বাহিনীকে পরাজিত করে, অপরদিকে সিরিয়ার আসাদ সরকারের সাথেও মোকাবেলা করে। এই ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসন ও আইএস একই রকম ভূমিকা নিয়েছে। কারণ উভয়ই প্রকৃত বিপ্লবীদের ভয় পায়।

প্যারিসের ঘটনার পর এখন ফ্রান্স জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপন করছে, কিভাবে আইএসকে পরাজিত করা যায়। কিন্তু এর আগে মার্কিন বিমান হামলা আইএসকে সামান্যতম আঘাত করতে পারেনি, বরং সাধারণ মানুষকেই হত্যা করেছিল। আসল প্রশ্ন ছিল সিরিয়ায় দখল নেবে কে? কিভাবে আসাদ সরকারের পতন ঘটানো যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আসাদের পতনের জন্য আগ্রহী। সেই জন্যই লেলিয়ে দিয়েছে আইএসকে। অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশের কারণে রাশিয়া আসাদের পক্ষ নিয়েছে। রাশিয়ার কয়েকদিনের বিমান হামলায় সিরিয়ায় আইএসএর ঘাটি বেশ তছনছ হয়ে গিয়েছিল। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা বলে, রাশিয়া নাকি আসাদ বিরোধী ‘গণতান্ত্রিক’ শক্তিকে একই সাথে ধ্বংস করছে।

এই সব মিলে ইরাক ও সিরিয়ায় যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল তাতে মানুষের বেচে থাকাই একটা সঙ্কটের মুখে পড়েছিল। স্রোতের মতো মানুষ দেশ ছাড়তে শুরু করে। অনেকটা ১৯৭১ সালে আমাদের দেশে যা হয়েছিল। প্রাণ বাচানোর জন্য দুই কোটি বাঙ্গালী দেশান্তরীত হয়েছিল। তারা আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। ভারত রাজনৈতিক এবং মানবিক কারণে আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল। ২০১৫ সালেও সিরিয়া থেকে আসা শরণার্থীদের ইউরোপ ও আমেরিকা আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। আমরা মনে করি, যে পাশ্চাত্যের কারণে এই শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি, সেই পাশ্চাত্যকে অবশ্যই এই দায়দায়িত্ব নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী ইউরোপীয়রাই তো সেখানে যুদ্ধ বাধিয়েছে। মিথ্যা অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করেছিল। আবার জঙ্গী সংগঠন তৈরি করেছে তারাই। তাহলে দায়দায়িত্ব কেন তারা নেবে না?

আইএসসহ জঙ্গী সংগঠনগুলো বিধর্মীদের উপর আক্রমণ চালায়। কিন্তু একবারও ইসরাইলের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করে না, এমনকি কথাও বলে না। সৌদি রাজতন্ত্র ও তুরস্ক যাদের শক্তির উৎস সেই সংস্থা কিভাবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যাবে? তবে পশ্চিমা শক্তি যে ফ্রাংস্টাইন তৈরি করেছে সেই দৈত্যটি এখন ইউরোপের অন্যতম কেন্দ্র প্যারিসেই হানা দিয়েছে। সেই উপন্যাসের গল্পের মতোই দৈত্য তার স্রষ্টাকেই হত্যা করেছিল। আইএস এখন মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে ইউরোপে হানা দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে দক্ষিণপন্থী শক্তি জোরদার হয়েছে, মুসলিম বিদ্বেষ তীব্রতর হয়েছে, সঙ্কটে পড়েছেন শরণার্থীরা।

একদা মার্কিন প্রশাসনসহ পশ্চিমারা একদিকে কমিউনিজমকে ঠেকানোর জন্য আল কায়েদা ও তালেবান সৃষ্টি করেছিল, অপরদিকে সোভিয়েত পতনের পর ইসলাম বিরোধী জিহাদ ঘোষনা করেছিল। ইসলামী জঙ্গীবাদকে মদদ দেয়া এবং একই সাথে ইসলাম বিরোধী প্রচারণা পরস্পরবিরোধী মনে হলেও এটাই ছিল তাদের রণনৈতিক কৌশল। সেদিন সাম্রাজ্যবাদ ও কর্পোরেট পুজি বাজারে ছেড়ে দিয়েছিল কতিপয় কলমপেশা বুদ্ধিজীবী বুর্জোয়া প্রচার যাদেরকে পন্ডিত বানিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে তাদেরই বুদ্ধিজীবী স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তার বহুল প্রচারিত গ্রন্থে (দ্য ক্লাস অফ সিভিলাইজেশন এ্যন্ড দ্য রিমেকিং অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অর্ডার) ইসলাম ধর্মকে সবচেয়ে বর্বর, অসহিষ্ণু ও অনুন্নত বলে বর্ণনা করে ঘোষণা করলেন যে, পাশ্চাত্যের সভ্যতা ইসলামী বর্বরদের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। প্যারিসের আইএসএর হামলা কি সত্যকে প্রমাণ করবে না? অন্তত অমুসলিম ইউরোপবাসী তো তাই মনে করবে। এরপর ২০০২ সালে তাদের আরেক বুদ্ধিজীবী নরম্যান পোধোরেজ লিখলেন, ‘হাউ টু উইন ওয়ার্ল্ড ওয়ার ফোর’। তার মতে শীতল যুদ্ধটি ছিল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এবার চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে ইসলামের। সেখানে ইসলামী বর্বরতা ও নরহত্যার বিশদ ও ভয়াবহ বিবরণ আছে। আইএস কি তাই প্রমাণ করছে না? পোধোরেজ এটার নাম দিয়েছিলেন ইসলামোফ্যাসিজম। তিনি এরপর আরেকটি নিবন্ধ লেখেন ২০০৭ সালে দ্য কেইস ফর বোম্বিং ইরান। ইরান আক্রমণের জন্য উস্কানিমূলক যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল।

সাম্রাজ্যবাদের পোষ্য তাত্ত্বিকরা যে জায়গাটা তৈরি করতে চেয়েছিল, সেটা আরও পাকাপোক্ত করলো আইএস। প্যারিসের ঘটনার পর ইউরোপের দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল ও তাত্ত্বিকরা এখন ইউরোপ থেকে মুসলমানদের তাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। আইএস মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য অন্ততঃ এটুকু ‘উপকার’ করতে পেরেছে।

ইতোমধ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এবং রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতাবিবৃতিতে চরম মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। ইউরোপে বসবাসকারী মুসলমানরা এখন আতঙ্কের মধ্যে বাস করছে। প্যারিসের ঘটনাকে অজুহাত করে সিরিয়ায় শরণার্থীদের আশ্রয় না দেয়ার ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। অথচ এই শরণার্থীরা কিন্তু আইএসএর আক্রমণের কারণেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

একদল ধর্মের নামে নারকীয় হত্যা ও সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে আর তারই প্রতিক্রিয়ায় অপরপ্রান্তে চরম দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান ঘটছে। উভয়কেই একই সাথে নিন্দা ও বিরোধীতা করা উচিত। বাংলাদেশ সরকারেরও এমন অবস্থান নেয়া উচিত। কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন সরকার কি এসব নিয়ে ভাবছে?

১টি মন্তব্য