Home » আন্তর্জাতিক » গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন – প্যারিস ঘটনার পর কঠিন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ মুসলমানরা

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন – প্যারিস ঘটনার পর কঠিন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ মুসলমানরা

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Dis-4গ্লাসগোর দক্ষিণে বাড়ির কাছে হাঁটার সময় তিনজন মানুষের সামনে পড়ে গেলেন ওমর রাজা। তাকে দেখেই তারা বর্ণবাদী গালিবর্ষণ করতে লাগল। তারা তাকে ‘বজ্জাত পাকি’ বলে গাল দিয়ে ইসলামিক স্টেটকে (আইএস)-এর অর্থদাতা বলেও অভিযুক্ত করল। ‘তিনজনের বিপরীতে আমি ছিলাম একা। তাই পরিস্থিতি শান্ত করতে তাদের থেকে দূরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু হঠাৎ করে পেছন থেকে আক্রান্ত হলাম, ঘাড়টি চেপে ধরল’ রাজাকে লাথি দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তার সাথে যে ব্যাগটি ছিল, সেটি খুলে ভেতরকার সবকিছু ফুটপাতে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। তারপর হামলাকারীরা তাড়াতাড়ি কেটে পড়ল। ‘পুরো ঘটনাটাই ঘটল খুবই দ্রুত,’ তিনি গার্ডিয়ানকে বলেন। শুক্রবার ছিল গ্লাসগো সেন্ট্রাল মসজিদের জুমার নামাজের দিন। তার আগে দিয়ে এই ঘটনা ঘটল। ‘আমি আগেও ঘৃণামন্তব্যের শিকার হয়েছি। কিন্তু কখনো শারীরিকভাবে আক্রান্ত হইনি। নগরীর উত্তর দিকে এ ধরনের অনেক কথা শোনা গেলেও গ্লাসগোর দক্ষিণ দিকটা নানা সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের বলে ধরা হতো। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় প্যারিসে যা ঘটছে, সেটা এই সমাজেও ছড়িয়ে পড়ছে, অনেক মানুষ অর্ধসত্যের ভিত্তিতে কাজ করছে।’ ২৬ বছর বয়স্ক অভিনেতা ও কমেডিয়ান বলেন, তার প্রজন্মের যারা প্রথম পাশ্চাত্য সমাজে পুরোপুরি লীন হতে যাচ্ছেনতারা সমস্যায় হিমশিম খাচ্ছেন, অন্যদিকে তারা তাদের কাঁধে নিজের সম্প্রদায়ের বিপুল দায়িত্বও অনুভব করছেন। ‘আপনি যখন একটা বয়সে আপনার পরিচিতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, তখন আপনি পাশ্চাত্য, স্কটিশ, মুসলিম হলে গেলে বিষয়টা আরো অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে, তখন আপনি কিভাবে সবাইকে খুশি করবেন?’

জানুয়ারির শার্লি হেবদো হামলার পরের মাসগুলোকে ‘অন্ধকার ও আবেগময় সময়’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি আরো বলেন, ‘মুসলিম হিসেবে আপনি শান্ত অপরিবর্তনীয় থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে, কিন্তু আপনাকে বারবার ঠেলে দেওয়া হতে থাকলে তারা [বর্ণবাদীরা] যা চায় সেটা তাদের দিয়ে দিতে চাইতেই পারেন, বিস্ফোরিতও হতে পারেন। আগের প্রজন্মগুলো সবসময় এমন উত্তেজনা দেখেননি।’ প্যারিস হামলা নিয়ে মিডিয়া কভারেজে তিনি খুশি নন। ‘প্যারিসের ধ্বংস ভয়ঙ্কর, তবে দুর্ভাজ্যজনকভাবে মিডিয়া সমর্থন করা নিরাপদএমন একটা ব্র্র্যান্ড সৃষ্টি করেছে। এ কারণে তারা প্যারিসের মতো নগরীকে রোমান্টিকীকরণ করেছে, অথচ সিরিয়া বা ফিলিস্তিনে থাকা আরো বেশি অন্ধকারকে মানুষজন দেখতে চায় না। ‘আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তা হলো যাকে তুমি সমর্থন করতে চাও, তাকে বিপুলভাবে প্রতিফলিত করাটাই আসল কথা। মানুষজন পতাকার মধ্যে তাদের ফটো বদলে দেওয়ার মতো করে কাজটা করছে খুবই ফাঁকা উপায়ে।’

গ্লাসগোর মুদি দোকানদার মোহাম্মমদ নওয়াজ আলী (২৩)-এর সাথে একমত হয়ে বলেন, ‘নিউজ অ্যাপসগুলোতে আপনি প্রথম ছয় বা সাতটি স্টোরি দেখবেন প্যারিস নিয়ে। কোনোটিতে প্যারিসে বেঁচে আছে এমন কাউকে নিয়ে, কিংবা কেউ ধরা পড়েছে কিনা তা নিয়ে। কিন্তু অন্যান্য দেশেও অনেক কিছু ঘটছে। এক দিনেও একই সংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।’ নামাজের পর মসজিদ ত্যাগের পরও একই ধরনের হতাশার অনুভূতি প্রতিফলিত হয়েছে। ‘আমরা কিছু করিনি, অথচ মুসলমানরা আক্রান্ত হচ্ছে। বিশপ ব্রিগসে [পূর্ব ডানবারটনশায়ারে] মসজিদে আগুন দেওয়া হয়েছে, এখানেও এ ধরনের কিছু হয়েছে। বিষয়টা গুরুতর।’

এডিনবার্গভিত্তিক আলেম তালাত ইয়াকুব একই ধরনের জটিলতার প্রতিধ্বনি করলেন, ‘মুসলমান হওয়ার কারণে আমার মনে হয়, খুব তাড়াতাড়িই আমাকে পুরো সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ঘটনার নিন্দা করতেই হবে। অন্য কোনো ধর্মীয় গ্রুপকে এমন কিছু করতে বলা হয় না।’ লন্ডনে পাতাল রেল আসার সময় এক হিজাবধারী নারীকে ধাক্কা দিয়ে লাইনে ফেলে দেওয়ার ঘটনা প্রকাশের পর ইয়াকুব (৩০) বলেছিলেন, মুসলিম নারীরা ফেসবুকে তাকে ট্যাগ করে রাস্তাঘাটে সাবধানে চলাচল করতে বলছে। তিনি বলেন, ‘ভীতি সৃষ্টি এবং কিভাবে চলাচল করা হবে, তা বলাটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো সন্ত্রাসী হামলা হলে প্রতিবারই এমনটা ঘটে।’

লন্ডনের কিংস কলেজের ছাত্র আরিব উল্লাহ (২৩) বলেন, তাকে কথা বলতে না চাওয়ার নিজস্ব অনীহা দূর করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন গণউন্মাদনা চলছে, সেলফসেন্সরশিপ চলছে। আমি রাজনৈতিক ঢামাডোলের শিকার হতে পারি বলে ভয় পাচ্ছি, আমি কোন কথা বলব, তার জের ধরে একঘরে হয়ে পড়ার আতঙ্কে আছি।’ ‘গত ১৫ বছর ধরে আমরা হামলার নিন্দা করে আসছি, আমরা বলে আসছি, ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম, ইসলাম এটা, ইসলাম ওটা। আমি এই মুহূর্তে এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়েছি, যেখানে আমি একটা স্ট্যাটাস [আপডেট] দেওয়ার কথাও চিন্তা করতে পারছি না। কথা আর কী আছেএমন অবস্থা। আপনার জানার কথা, আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।’

কিংস কলেজের আরেক ছাত্র জাওয়াহির ইউসুফ বলেন, এক হিজাবধারী নারী মনে করছে, নিজেকে এখন আগের চেয়েও বেশি দৃশ্যমান লাগছে। ‘আমি যখন ট্রেনে যাই, আমার মনে হতে থাকে, হায় খোদা তারা কি ভাবছে আমি যাচ্ছি…, তারা কী ভাবছে আমিও আছি তাদের সাথে?’

নেতিবাচক বদ্ধমূল ধারণা বা কলঙ্ক আরোপে মানুষজনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণারত পিএইচডি গবেষক মরিয়ম মাহমুদ বলেন, ইসলামি চরমপন্থা সংশ্লিষ্ট ঘটনার পর মুসলিমবিরোধী ঘৃণা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নানা আকারে ঘটনা ঘটে। যেমন দোকান বা ক্যাফের কোনো স্টাফ কিভাবে মানুষজনের সাথে আচরণ করেসে ধরনের অনেক ঘটনাই ঘটে সূক্ষ্মভাবে। এসব বৈরিতার অনেকটাই ঘটে সামাজিক মিডিয়ায়।

দক্ষিণ লন্ডনের শিক্ষক জ্যাক খান বলেন, মুসলিমবিরোধী সংস্কারের বেশির ভাগ ঘটনা তিনি দেখেছেন ফেসবুকের মাধ্যমে। খুব কম বৈরিতাই ঘটে সরাসরি। যারা এটা ঘটায়, তাদের অনেকে প্রায় সময়ই বন্ধু বিবেচনা করা হয়। তিনি বলেন, “তারা যখন ‘এই দেশে আর কোনো মুসলমান থাকতে পারবে না,’ ‘মসজিদগুলো বন্ধ করে দাও’এমন ধরনের পোস্ট দেয়, তখন তারা ভুলে যায় তুমি মুসলমান।” তিনি বলেন, ‘যেসব বন্ধু এমন কাজ করছে, তারা খারাপ মানুষ নয়। তারা সাধারণ মানুষ। তারা তোমার বাড়িতে আসে, তারা তোমাকে সাহায্য করে, তারা তোমার সাথে সুন্দরভাবে কথা বলে। কিন্তু তাদের মনের পেছন দিকেতারা এ কথা বলার অপেক্ষায় থাকে যে, তুমি খারাপ মানুষ।’

জ্যাক খানের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অবস্থার জন্য পাশ্চাত্যের নিজেদের দায়দায়িত্ব এবং বিশেষ করে টনি ব্লেয়ারের ভূমিকা স্বীকার করার ব্যর্থতা। তিনি বলেন, ‘ওই ভামির অবসান না হওয়া পর্যন্ত কারোই উচিত নয়, এই যুদ্ধের জন্য কোনো মুসলিমকে নিন্দা করতে বলা।’