Home » আন্তর্জাতিক » প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৮৫৭ :: পুনঃঅনুসন্ধান (তৃতীয় পর্ব)

প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৮৫৭ :: পুনঃঅনুসন্ধান (তৃতীয় পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো

Last-4বিদ্রোহীরা বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে যে প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, তা ভারতের ইতিহাসে নতুনও বটে। কোন একক রাজা নয়, বরং একটা কমিটি বা কাউন্সিলের হাতে প্রশাসনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। যেমন দিল্লীতে সিপাহী ও নাগরিক প্রতিনিধি নিয়ে প্রশাসনিক কমিটি গঠিত হয়েছিল। এছাড়াও তাতিয়া তোপী, নানা সাহেব, ঝাসির রাণীর মতো ব্যক্তিদের নেতৃত্বের গুণাবলী, সামরিক দক্ষতা ও দেশপ্রেম তাদের চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

এই মহা বিদ্রোহের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট হলো হিন্দু মুসলমান ঐক্য। ১৮৫৭ এর আগেও বাংলায় যেসব সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে সেখানেও হিন্দু মুসলমানের ঐক্য লক্ষ্য করতে পারি।

তবে দুর্বলতা তো ছিলই। অন্যথায় এই মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হলো কেন। মাত্র স্বল্পসংখ্যক সাদা চামড়ার সৈন্য কিভাবে এতোবড় ভারতবর্ষকে দুইশত বছর পরাধীন করে রাখতে পেরেছিল, তাও ভাববার বিষয়। তা ভারতীয় সমাজের মৌলিক দুর্বলতাই প্রকাশ করে।

মহাবিদ্রোহের কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। কোন সমন্বিত স্ট্রাটেজিও ছিল না। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন কেন্দ্র থেকে অভ্যুত্থান ও যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। যদিও স্বাধীন ভারতের শাসক কে হবেন, তা বিদ্রোহীরা নির্ধারিত করতে পেরেছিলেন। শেষ মুগল সম্রাট বাহাদুর শাহ এবং বিদ্রোহীরা বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন। সে যুগে গণতন্ত্রের ধারণা ভারতীয় সমাজে অনুপস্থিত ছিল, তবু বলতে হয় যে, সম্মিলিত লক্ষ্য নির্দিষ্ট ছিল না।

দিল্লীর পতনটি খুব দ্রুত হয়েছিল। মাত্র চারমাসের মধ্যেই পতন হয়েছিল। বৃটিশরা বিভিন্ন জায়গা থেকে সামরিক শক্তি জমায়েত করেছিল, এমনকি চীনের পথে যাওয়া একদল বৃটিশ সৈন্যের পথ ঘুরিয়ে দিল্লীতে আনা হয়েছিল। তবু সৈন্য সংখ্যা বিদ্রোহীদের পক্ষে বেশী ছিল। তাছাড়া জনগণ তো ছিলই। তারপরও দিল্লীর পতনের মূল কারণ নেতৃত্বের দুর্বলতা। সিপাহী ও নাগরিকদের প্রতিনিধি নিয়ে যে কাউন্সিল গঠিত হয়েছিল তা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। সম্রাট বাহাদুর শাহ কেবল নামেই নেতা ছিলেন। অর্থ সংকট, খাদ্য সংকট, এমনকি অস্ত্র সংকটও ছিল। সেই সময়ের পরিস্থিতির উপর মার্কস লিখেছেন, ‘অভ্যুত্থানকারী সিপাহীদের নানা ধরনের মিশ্রিত দলটি, যারা নিজেদের অফিসারদের হত্যা করেছে, শৃঙ্খলা ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে, অথচ এমন কাউকে বের করতে পারেনি যার উপর সর্বোচ্চ কমান্ড ন্যস্ত করা যায়। সেই রকম সংস্থাটির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ সংগ্রাম সংগঠিত করার সম্ভাবনা সর্বাপেক্ষা কম’।

এ কথা ঠিক যে, সামগ্রিকভাবে সামন্তরাই ছিলেন নেতৃত্বে। তারা কৃষকের স্বার্থের অনুকূলে কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দিল্লী বিজয়ের পর বিদ্রোহীরা যে ঘোষণা দেন, তাতে ব্যবসায়ী ও মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের সুযোগসুবিধার ব্যাপারে নানা রকম প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও খাজনা কমানোর কোন অঙ্গীকার ছিল না। এটা নেতৃত্বের মাথায় ছিল না।

এই মহাবিদ্রোহে কৃষক ও কারিগরদের সমর্থন ও কোন কোন ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ থাকলেও, বিদ্রোহের ডাকটি কিন্তু কৃষকদের থেকে আসেনি। কার্ল মার্কস অবশ্য বিষয়টিকে খুব অস্বাভাবিক মনে করেননি। তিনি ফরাসী বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘ফরাসী রাজতন্ত্রের উপর প্রথম আঘাতটি কৃষকদের থেকে আসেনি, এসেছিল অভিজাত শ্রেণী থেকেই। ইংরেজদের হাতে নির্যাতিত, অসম্মানিত, নগ্ন শরীরে বেত খাওয়ার রায়তরা এই বিদ্রোহ করেননি, একই রকমভাবে বিদ্রোহ করেছিল তাদের উর্দিপরা, তাদেরই প্রতিপালিত, পুষ্ট সমর্থিত, প্রশ্রয় পাওয়া একদল সিপাহী’।

সিপাহীদের খুব বেশি আধুনিক অস্ত্র ছিল না। মার্কস এটাকেও চিহিৃত করেছিলেন, ‘বৈজ্ঞানিক অস্ত্রের অভাব ছিল আর এগুলো ছাড়া বর্তমানে একটা সেনাবাহিনীর কোন ভবিষ্যত নাই’।

কোম্পানীর রাজত্বের রাজধানী ছিল কলকাতা। কলকাতা ছিল ইংরেজদের সবচেয়ে বড় ঘাটি। কলকাতা কখনো সিপাহীরা দখল করতে পারেনি। পাশাপাশি কলকাতায় তখন যে মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে মনে সিপাহী বিদ্রোহের পক্ষে থাকলেও প্রকাশ্যে সকলেই ইংরেজ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন বা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই ধরনের জাতীয় সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দিতে পারে হয় শ্রমিক শ্রেণী, না হয় বুর্জোয়া শ্রেণী। শ্রমিক শ্রেণী তখনো জন্ম নেয়নি, নিলেও এবারে ভ্রƒণ বা শৈশব অবস্থায়। অন্যদিকে উদারনৈতিক বুর্জোয়া ভাবাদর্শের একগুচ্ছ ব্যক্তির সমাহার ঘটেছিল প্রধানত বাংলায়। তারা সমাজ সংস্কারে ও জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় বিরাট অবদান রাখলেও রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। তাদের একটি অংশ বৃটিশ শাসনকে আর্শীবাদ বলেও মনে করতেন। বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিকাশ তখনো হয়নি।

এছাড়া কোন কোন দেশীয় রাজা হয় ইংরেজের পক্ষে ছিল অথবা নিরপেক্ষ থেকেছে।।

(চলবে…)