Home » বিশেষ নিবন্ধ » বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড :: সরকারের হাত লম্বা

বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড :: সরকারের হাত লম্বা

হায়দার আকবর খান রনো

Dis-1অনেক বিলম্বে হলেও চারজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন করে প্রানদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এ কথা ঠিক যে, বিএনপিজামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকলে এই বিচার হতো না। বরং যাদের ফাসি দেয়া হলো তারাই ক্ষমতায় থাকতেন। ১৯৯৬২০০১ সালের আওয়ামী লীগের শাসনামলেও এই বিচারের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কারণ ১৯৯৫৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সাথেই মৈত্রী স্থাপন করে একত্রে আন্দোলন করেছিল। তাহলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক। যে সরকারের যখন যেভাবে সুবিধা হয়, তখন তারা সেভাবে ব্যবহার করেন। তার মানে অবশ্য এই নয় যে, যুদ্ধাপরাধের যে বিচার প্রক্রিয়া চলছে, সে সম্পর্কে আমি প্রশ্ন উত্থাপন করছি। না, মোটেও তা নয়। বরং বিএনপি বিভিন্ন সময় মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে যে সকল প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, সেটাই তার প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র ও জামায়াত প্রীতি ফুটিয়ে তুলেছে। সাকা চৌধুরীর ফাসি কার্যকর হলে তারা যে বক্তব্য দিয়েছেন, হয়তো নিজ দলের নেতার ফাসি হয়েছে বলে কিছু একটা বলতে হয়, তাই তারা বলেছেন। তেমন জোরালো প্রতিবাদ করেননি। হয়তো তাই। বিএনপি নিজেকে মধ্যপন্থী বুর্জোয়া দল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও তা ক্রমাগত দক্ষিণে সরে গেছে।

বিএনপি অথবা কোন কোন বিদেশী সংস্থা এই বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানের নয় ইত্যাদি বলে সমালোচনা করেছে। আমি বরং উল্টো বলবো, এখন যে যুদ্ধাপরাধীর বিচার চলছে তা নুরেমবার্গ ট্রায়াল বা টোকিও ট্রায়ালের তুলনায় অনেক বেশি স্বচ্ছ, মানসম্পন্ন এবং আসামীর প্রতি যথেষ্ট উদার। টোকিও ট্রায়ালে অন্যতম জুরি বা বিচারক ছিলেন বাঙ্গালী বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল। টোকিও ট্রায়ালে জাপানের প্রধানমন্ত্রীসহ ৯শজনকে প্রানদণ্ড দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল বলেছিলেন, একজনকেও শাস্তি দেয়া যায় না। সমগ্র বিচার ব্যবস্থাকেই তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সেই তুলনায় আমাদের দেশে যে বিচার প্রক্রিয়া চলছে, তা অনেক বেশি স্বচ্ছ ও মানসম্মত।

কিন্তু প্রশ্ন অন্যখানে। বিচার শুরু করা বা না করার ব্যাপারটি ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক। ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল তিনটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর (বাংলাদেশের ড. কামাল হোসেন, ভারতের সরণ সিং ও পাকিস্তানের আজিজ আহমদ) সম্মেলন শুরু হয়েছিল ৫ এপ্রিল থেকে এবং যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছিল তাতে ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। সেখানে ‘ফরগেট এ্যন্ড ফরগিভ’এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। আরও বলা হয়েছিল – ‘বাঙ্গালী নোজ হাউ টু ফরগিভ’। হয়তো সেদিনের বাস্তবতায় এটাই ছিল রাজনৈতিক ‘বাধ্যবাধকতা’। যুদ্ধাপরাধ দুই ধরনের। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করাটাই তো মহা অপরাধ। জামায়াত নেতারা প্রকাশ্যেই স্বীকার করছেন যে, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু সে জন্য তো এখন বিচার হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধুর আমলেই দালাল আইন উঠে গিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় যে অপরাধতাহলো যুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি। সেই বিচারটা কখনই নিষিদ্ধ ছিল না। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা এতকাল সেই বিচারটা শুরু করেননি। এবারই প্রথম বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলো। বিচার করা বা না করার বিষয়টি ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।

আমরা দেখেছি প্রথমে কি ধরনের দোমনা ভাব নিয়ে বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। প্রথমে যে তদন্ত সংস্থা গঠিত হয়েছিল, দেখা গেল তার প্রধান ব্যক্তিই ছিলেন একদা ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মী। হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে এই নিয়োগ দেয়া হয়নি। কিন্তু এতে বিচারের ব্যাপারে সরকারের চরম অমনোযোগিতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের আরও মনে রাখতে হবে যে, সরকারের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস থেকেই কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের উদ্ভব হয়েছিল।

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়া ভালোভাবেই এগিয়ে চলছে এবং যুদ্ধাপরাধীদের কয়েকজনের প্রানদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও এর দ্বারা বলা যাবে না যে, সকল ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার ঠিক মতো হচ্ছে। যে সকল ক্ষেত্রে শাসক দলের সম্মতি নেই, সেই সকল ক্ষেত্রে পুলিশ ভালো মতো তদন্তও করেন না। বিচারও শুরু হয় না। গত বিএনপি আমলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা। জজ মিয়ার মতো ভুয়া আসামী ও ভুয়া তদন্তের কথা আমাদের সকলেরই জানা। এই আমলেও সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর যে সকল মামলা রয়েছে তারও কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না।

পর পর পাচজন ব্লগার, লেখক ও প্রকাশক হত্যার পর এখনো কেন একটিরও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি তা আমাদেরকে দুর্ভাবনার মধ্যে ফেলে। এমনকি কয়েকজন বিশিষ্ট লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এই সকল বিচারের ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বিশিষ্ট লেখক ও অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল যে সরকারের ‘দুবোধ্য রাজনৈতিক সমীকরণের’ কথা বলেছিলেন, সে সম্পর্কে ইতোপূর্বেই ‘আমাদের বুধবারএ আমি লিখেছিলাম। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, ‘সরকার ব্লগার, লেখক, প্রকাশক হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে মোটেও আগ্রহী নয়’। লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজীর অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামও অভিযোগ করেছেন, ওই সকল হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সরকার স্পষ্ট তদন্তের পথ না ধরে রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষকে দোষারোপ করতেই আগ্রহী। তিনি বলেছেন, ‘অনেক সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ এসব মন্ত্রীর কথার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অলিখিতভাবে একটি নির্দেশনা পেয়ে যায়। তখন তারা মন্ত্রীর কথা প্রতিষ্ঠা করতে সে অনুযায়ী কাজ করে’। একই কথা বলেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অনুপম সেন। তিনি বলেছেন, ‘অবিলম্বে দোষারোপের রাজনীতি বন্ধ করে আসল অপরাধীদের খুজে দৃষ্টান্ত শাস্তি দিতে হবে’। লেখক ও দর্শনের অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক অভিযোগ করেছেন, সরকার ‘ব্লেম গেম করছে। এতে প্রকৃত অপরাধী আড়াল হয়ে যাবে’।

যেখানে সরকারের হাত নেই, সেখানে কিন্তু তদন্ত ও বিচার ভালোভাবেই হচ্ছে এবং দ্রুততার সাথেই হচ্ছে। যেমন এই বছর সিলেটে রাজন ও খুলনায় রাকিব নামে যে দুই শিশু নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তার বিচার কার্য খুব দ্রুতই সম্পন্ন হয়েছে। সেটাই তো বাঞ্ছনীয়। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’। ৮ জুলাই রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। মাত্র ১৭ কার্য দিবসের এই হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। রায় হয়েছে গত ৮ নভেম্বর। আমরা সন্তুষ্ট হয়েছিল। খুলনায় ১২ বছরের শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল ৩ আগস্ট। এর বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে ১০ কার্যদিবসে। শিশু রাজন ও শিশু রাকিবের হত্যার যথাক্রমে চার মাস ও তিন মাস পাচ দিনের মাথায় বিচার সম্পন্ন ও রায় ঘোষিত হলো। দুটি মামলায় ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। রাজন হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি কামরুল ইসলাম সউদি আরবে পালিয়ে গেলেও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। খুব ভালো কথা। সরকারের উদ্যোগের ও তৎপরতার অবশ্যই প্রশংসা করতে হয়। কিন্তু সকল ক্ষেত্রে তা হয় না কেন? বিশেষ করে যে সকল ক্ষেত্রে সরকারের বা সরকারি দলের কর্তাব্যক্তিরা বা তাদের আত্মীয়রা জড়িত থাকেন, সেখানে তো এই পুলিশের এই দক্ষতা ও তৎপরতা দেখতে পাই না।

নারায়ণগঞ্জের কৃতি ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীও তো শিশু। তার হত্যার বিচার এখনো শুরু হয়নি কেন? ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি ক্ষোভের সাথে অভিযোগ করেছেন, ‘ত্বকী হত্যার তিন বছর হতে চললো, এখনো পর্যন্ত হত্যার অভিযোগপত্র দিয়ে এর বিচার শুরু করা গেল না কেন? সঙ্গত কারণেই প্রশ্নটি এখন সবার মনেই উত্থাপিত। ত্বকী হত্যার বিষয়টি কি এমনই জটিল যে এর রহস্য ভেদ করা যাচ্ছে না বা এর ঘাতকদের চিহিৃত করা যাচ্ছে না? না, তা নয়। কারণ দুই বছর আগেই ত্বকী হত্যার তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) সংবাদপত্র ও বিভিন্ন টেলিভিশনের মাধ্যমে গোটা দেশবাসীকে জানিয়েছে কারা, কখন, কবে, কোথায়, কেন ও কিভাবে ত্বকীকে হত্যা করেছে। ত্বকীর ঘাতক হিসেবে তারা যাদের নাম উল্লেখ করেছে, তারা সবাই সরকারদলীয় লোক। তাহলে কি এ জন্যই ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র দেয়া হচ্ছে না?’

আমরা আরও জানি যে দুজন ঘাতক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছিল। ত্বকী হত্যার এক বছরের মধ্যেই তদন্ত সম্পন্ন হয় যা তদন্তকারী সংস্থা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশও করেছিল। গত বছর (২০১৪ সাল) ৫ মার্চ তারা সংবাদ মাধ্যমে দেশবাসীকে জানিয়েছিলেন যে, খসড়া অভিযোগপত্র প্রদান করে অচিরেই তা আদালতে পেশ করা হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি। তাহলে কি ত্বকীর বাবার অভিযোগই কি তাহলে সঠিক তদন্তে বেরিয়ে আসা হত্যাকারীরা সরকারি দলের বলেই কি এই বিলম্ব? আদৌ কি তার বিচার হবে?

সরকারি দলের সংসদ সদস্য যখন কিশোরের পায়ে গুলি করে তাকে পঙ্গু করে দেয়, অথবা সংসদ সদস্যের পুত্র যখন ঢাকার রাস্তায় এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে দুই ব্যক্তিকে হত্যা করে অথবা যখন সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তির ভাগ্নে মাতাল হয়ে দামি গাড়ি চালিয়ে মানুষকে চাপা দিয়ে গুরুতর আহত করে, তখন দেখি প্রশাসন বড় ধীরে চলে। জানি না ত্বকীর মামলার মতো এই সকল মামলা কবে শেষ হবে। নাকি মানুষ ধীরে ধীরে ভুলে গেলে, একদিন মামলাই আর থাকবে না।

সকল বিচার প্রক্রিয়াই রাজনৈতিক ইচ্ছাঅনিচ্ছার সাথে যুক্ত। যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া অগ্রসর হচ্ছে। ভালো খবর। দুই শিশু হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে, ছয়জনের ফাসির দন্ডাদেশ হয়েছে। ভালো খবর। কিন্তু যেখানে সরকারের ভিন্ন ধরনের স্বার্থ জড়িত সেখানে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শুরুই হয় না। সেখানে বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে।।