Home » প্রচ্ছদ কথা » রাষ্ট্রপতি বলা যাবে না কিন্তু এরশাদ থাকবে সাথে

রাষ্ট্রপতি বলা যাবে না কিন্তু এরশাদ থাকবে সাথে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Cover২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর সন্ধ্যে এই নিবন্ধটি লেখার সময় বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটে (www.bangabhaban.gov.bd) সাবেক রাষ্ট্রপতিদের তালিকাক্রম ৯ ও ১০ নম্বরে জিয়াউর রহমান এবং ১৩ ও ১৪ নম্বরে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নাম দেখা যাচ্ছে। যাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আর কোন স্বীকৃতি দিতে রাজি নন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং এরকম সম্বোধন তিনি আদালত অবমাননা হিসেবে মনে করছেন। এর মধ্য দিয়ে দেড় দশককালের সামরিক ও কথিত গণতান্ত্রিক শাসনকে আদালতের রায়ের উল্লেখ করে অবৈধ আখ্যায়িত করছেন। যদিও দেড় দশককালের অবৈধ শাসনামলের বিরোধী দলের ভূমিকায় তার দল সরকার পরিচালনায় অংশ নিয়েছে এবং তিনি নিজে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে জাতীয় সংসদে ভূমিকা পালন করেছেন। অবশ্য এই প্রসঙ্গে তিনি বলেননি সেটি বৈধ কি অবৈধ ছিল।

গত ২৬ নভেম্বর গণভবনে একটি সভায় প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, জিয়াউর রহমান ও এরশাদকে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রে দু’জনকেই অবৈধ রাষ্ট্রপতি আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘হাইকোর্টের স্পষ্ট রায় আছে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল সম্পূর্ণ অবৈধ। এরশাদের ক্ষমতা দখল অবৈধ। তাই পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে’। প্রধানমন্ত্রীর মতে, ‘তার মানে জিয়াউর রহমানকে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলা যাবে না। যদি রাষ্ট্রপতি বলা হয় তবে হাইকোর্টের রায়কে লংঘন করা হবে। কারন তার ক্ষমতা অবৈধ। তিনি যেসব মার্শাল ল অর্ডিন্যান্স জারি করেছেন, সংবিধান সংশোধন বা যে সব আইন করেছেন, সব বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। কাজেই এখন সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ বা জিয়াউর রহমান, কেউ কিন্তু সাবেক রাষ্ট্রপতি নন। উচ্চ আদালত যখন এই ঘোষণা দেন, তখন সবাইকে এটা মানতে হবে। আমি সবার জ্ঞাতার্থে এটা জানাচ্ছি’।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মহাজোট সরকারের সাবেক মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জি এম কাদের বলেছেন, ‘এরশাদ যখন মার্শাল ল জারি করেন তখন শেখ হাসিনা স্বাগত জানিয়েছিলেন। জাতীয় পার্টির সমর্থনে তারা ক্ষমতায় এসেছেন অথবা ক্ষমতা বৈধ করেছেন’। তাঁর মতে, ‘কোর্ট একটি সুনির্দিষ্ট সময়কে অবৈধ বলেছেন। এরপর যদি একদিনের জন্য এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকেন, তাহলে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন একটি দৈনিক পত্রিকাকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য তিনি ঠিক মনে করেন না। রায়ে আদালত বলেছিলেন, তারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু তাদের রাষ্ট্রপতি বলা যাবে না এমন নির্দেশনা বা মন্তব্য রায়ে নেই।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অবশ্যই প্রাণিধানযোগ্য। তাঁর এই বক্তব্যের সাথে সকলেই একমত পোষণ করবেন যে, জিয়া এরশাদ উভয়ই অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী ছিলেন। ইতিহাসের একটি বিশেষ সময়ের হত্যাকাণ্ড, অভ্যূত্থানপাল্টা অভ্যূত্থান, কথিত সিপাহী জনতার বিপ্লব ও রক্তপাতময় রাজনীতির বেনিফিসিয়ারী হিসেবে জিয়াউর রহমান শাসন ক্ষমতায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। এর সূচনাটি ঘটেছিল পচাত্তরের মধ্য আগষ্টে যখন জাতীয়আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে দেশের রাষ্ট্রপতি সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন এবং ক্ষমতা গ্রহন করেছিলেন একই দল বাকশালের কেন্দ্রীয় নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং বাকশাল নেতারাই তার ক্ষমতার অংশীদার হয়েছিলেন। পরবর্তীতে জেলখানায় নিহত চারনেতাসহ বাকশালের অনেক নেতৃবৃন্দ সরকারে যোগ না দিলেও হত্যাকাণ্ড ও অবৈধ ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি।

শেখ হাসিনা যাদের অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী বলছেন, তাদের একজন জেনারেল এরশাদ এখনও পর্যন্ত তার ক্ষমতার অন্যতম অংশীদার। ১৯৯৬২০০১ মেয়াদে এরশাদ তাঁর ঐক্যমত্যের সরকারের অন্যতম অংশীদার ছিলেন। ২০০৭ সালে গঠিত মহাজোটের শরিক হিসেবে ২০০৮২০১৩ মেয়াদে সরকার পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গী হয়েছেন। সংসদে অনুগত বিরোধী দলের ভূমিকা ও সরকার পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। সর্বোপরি এরশাদ এখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতকি বলবেন শেখ হাসিনা?

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত জিয়া এরশাদকে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী বলেছেন, পঞ্চম ও যষ্ঠ সংশোধনী বাতিল করেছেন তাদের শাসনামলের একটি অংশকে অবৈধ বলেছেন, এরপরে সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার ওপর তো দায়িত্ব বর্তায় উভয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার। ১৯৯০ সালে গণঅভ্যূত্থানে এরশাদের পতনের পর সে সময়ের পাঁচদল নেতা ও বর্তমান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর দায়েরকৃত রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলাটির অস্তিত্ব কি আছে? থাকলে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে সরকার তো এরশাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।

সুপ্রীম কোর্টের রায়ে এরশাদকে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী বলা হলেও তিনি মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এজন্যই কি অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী হলেও তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিচার শুরু হচ্ছে না? জিয়া এরশাদকে সাবেক রাষ্ট্রপতি বললে যদি আদালত অবমাননা হয়, তাহলে তাদের একজনকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার করলে বুঝি আদালতের নির্দেশ সম্মান করা হয়? আর এদের দ’ুজনকে সাবেক রাষ্ট্রপতি না বলা গেলে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী খন্দকার মোশতাক, বিচারপতি সায়েম ও বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে কি সাবেক রাষ্ট্রপতি বলা যাবে? এ প্রশ্নেরও মীমাংসা হতে হবে।

১৯৭৫ সালে মোশতাকজিয়া এবং পরবর্তীকালে ১৯৮২ সালে ক্যুদেতা হিসেবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে এরশাদ ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রই বদলে দেয়া হয়েছিল। রাজনীতিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে তারা ঢাকতে চেয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে আজ্ঞাবহ করার মাধ্যমে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংবিধান বদলে দেয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রধর্ম এসেছিল। দুর্নীতিকে বিকেন্দ্রীভূত করে গণতন্ত্র ও অর্থনীতির উন্নয়নের নামে সবরকম অনৈতিকতাকে ব্যবহার করে দেড় দশক ধরে তারা দেশ শাসন করেছে। এ সময়কালে রাষ্ট্রপতির হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি দিয়ে এবং আরেক রাষ্ট্রপতির হত্যার বিচারের প্রহসনের মাধ্যমে খুনীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল।

তাদের আমলে বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কাজে লাগিয়ে বাহিনীসমূহের পেশাদারিত্ব নষ্ট করা হয়। অসত্য আর শঠতার ফুলঝুরি ছড়িয়ে উন্নয়নের একটি মিথ্ গড়ে তুলে দেশব্যাপী টাউট রাজনৈতিক গোষ্ঠি গড়ে তোলা হয় সুনিপুনভাবে। অনেক অনামী, অচেনা, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হয়ে ওঠে রাজনীতিঅর্থনীতি ও শাসন ক্ষমতার নিয়ামক। এর সূদুরপ্রসারী ফলাফল এবং প্রভাব এখন জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। মোশতাকজিয়া ও সবশেষ এরশাদের হাতে পূর্ণতা পাওয়া নীতিহীন রাজনীতির এই মডেলটি পরবর্তীকালে কথিত গণতান্ত্রিক শাসকরা কাজে লাগাচ্ছেন অনুপম দক্ষতায়। সম্ভবত: এই জন্যই শুরু থেকে এই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠা বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

এর মূলগত কারন হচ্ছে, নব্বই পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ক্ষমতায় টিকে থাকার বাসনায় জিয়া ও এরশাদীয় কৌশল ব্যবহার করতে গিয়ে বারবার এরশাদের দ্বারস্থ হয়েছে। নিজেদের দলে তো নয়ই, রাষ্ট্র পরিচালনার কোথাওই ন্যায্যতা ও নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়নি। ব্যক্তি, পরিবার ও আত্মীয়তাকে প্র্ধাান্য দেয়া হয়েছে সবস্তরে। সে হিসেবে জিয়া যতটা না তারচেয়েও অনেক বেশি সফল এরশাদ। এই অনৈতিক ও অপরাজনীতির মডেল রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে আক্রান্ত করেছে পরম স্বার্থকতায়।

ধারাবাহিকতাগুলি দেখার মত! মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী দল আওয়ামী লীগ ১৯৮২ সালে এরশাদের অবৈধ ক্ষমতা দখলকে স্বাগত জানিয়েছে। ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসন থেকে তথাকথিত গণতন্ত্র যাত্রায় সঙ্গী হয়েছে এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে। ১৯৯৬ সাল থেকে তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে কখনও ঐক্যমত্যের সরকার নামে, মহাজোটের শরিক হিসেবে, সর্বদলীয় সরকার হিসেবে এবং অনুগত বিরোধী দলের ভূমিকায় এরশাদ সবসময়ই ক্ষমতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশীদার ছিলেন। যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামকে পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার করার ঐতিহাসিক দায় যেমন বিএনপিকে নিতে হবে, পতিত স্বৈরাচারকে পুনর্বাসন ও ক্ষমতার অংশীদার করার দায়ও আওয়ামী লীগকে নিতে হবে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ক্ষমতার রাজনীতির খেলা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছেন এরশাদ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভানুমতির খেল দেখিয়ে এরশাদ সঙ্গ দিয়েছেন পরম কৃতজ্ঞতায়। উইনিং সাইডে খেলার নীতির রাজনীতিতে সব ধরনের নীতিহীনতাই হয়ে উঠেছে আদর্শ। আশির দশকের গোটা সময় জুড়ে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া ছিলেন এরশাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। রাষ্ট্রশক্তির ব্যবহারে তাদের উভয়কে এবং দলকে করা হয়েছে চরম নিপীড়ন। এরপরেও এরশাদকে জোটে ধরে রাখতে বা জোটে পেতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্বের লোভ, নগদ অর্থ, মামলা ও সাজার হুমকি, জেলের ভয়সব মিলিয়ে প্রাণান্তকর চেষ্টা রাজনীতিকে দেউলিয়া করে দিয়েছে। ক্ষমতার খেলায় অপরিহার্যতা প্রমান করে এরশাদ শুধুমাত্র নীতিহীনতা সম্বল করে দুই নেত্রীকে জয় করে নিয়েছেন।

জেনারেল জিয়া সামরিক শাসনের আওতায় রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। রাজনীতিবিদরা এই ঘোষণাকে রেফারেন্স করে বিরোধিতা করলেও দশকের পর দশক জিয়াকে অনুসরন করে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। রাজনীতিকেই ডিফিকাল্ট করে তোলা হয়েছে রাজনীতিকদের জন্য। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই যাত্রায় এরশাদ ছিলেন অপরিহার্য। গণঅভ্যূত্থানে স্বৈরশাসক হিসেবে পতিত হবার পরেও প্রাক্তন শত্রুপক্ষকে পেয়েছেন মিত্র হিসেবে। এক্ষেত্রে তিনি যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গ ছাড়েন তো বিএনপি মুখিয়ে আছে তাকে সঙ্গী করার জন্য।

এই রাজনীতির মূল অনুষঙ্গই হচ্ছে নীতিহীনতা ও ভ্রষ্টাচার। এখানেই পতিত স্বৈরাচার সবচেয়ে উপযোগী হয়ে উঠেছেন। ফলে রাজনীতির এরশাদ এখনও অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির কাছে। আর এজন্যই একদা স্বৈরাচার, রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে অভিযুক্ত হলেও বিচারের মুখোমুখি হবার বদলে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত, গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গী। প্রধানমন্ত্রী তাদের বা তাকে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলুন আর নাই বলুন।।