Home » অর্থনীতি » ৬ বছরে কোটিপতির অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ৩৫ হাজার

৬ বছরে কোটিপতির অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ৩৫ হাজার

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis-3একদিকে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বৈষম্য। আবার দারিদ্র্য কমছে। এসব তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের গড়মিল রয়েছে। দারিদ্র্য কমার হার এবং কোটিপতি হওয়ার হারের মধ্যে তুলনা করলে চলবে না। একদিকে কোটিপতি হচ্ছে বিলিয়নিয়ার আর অন্যদিকে জনপ্রতি দরিদ্র মানুষ দিনে দেড় ডলারের বেশি আয় করছে উভয়ের মধ্যে তুলনা করলেও প্রকৃত চিত্র ফুঠে উঠে না। কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে না কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব। ফলে বাড়ছে সীমাহীন বৈষম্য। সেটি সম্পদের ক্ষেত্রেও যেমন সত্য, তেমনি আয়ের ক্ষেত্রেও।

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের ৪০ শতাংশের বেশি এখন কোটিপতিদের দখলে। ৫০ ভাগ লাখপতি আর মাত্র ১০ ভাগ আমানত রয়েছে লাখ টাকার নিচের অ্যাকাউন্টগুলোয়। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের কাছে ৪০ শতাংশের বেশি সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দেশে আয় বৈষম্য বেড়েছে। এতে ধনীগরিবের বৈষম্যও বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৯ সালের মার্চে দেশে ব্যক্তিপর্যায়ে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট ছিল ১২ হাজার ৯১৭টি। ২০১৪ সালের শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬৮৭টিতে। সে হিসাবে ৫ বছরে দেশে ব্যক্তিপর্যায়েই কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বেড়েছে প্রায় ২৭ হাজার ৭৭০টি। অন্যদিকে, ২০০৯ সালের মার্চে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলে ব্যাংকে কোটি টাকার ঊর্ধ্বে অ্যাকাউন্ট ছিল ১৯ হাজার ৬৩৬টি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৭২৭টি। সে হিসাবে ৬ বছরে দেশে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় মিলে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বেড়েছে প্রায় ৩৫ হাজার। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৭৮ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি অ্যাকাউন্টধারী ছিলেন মাত্র পাঁচজন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা ৪৭এ পৌঁছে, যা ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৯৮ জন। তখন তাদের আমানতের পরিমাণ ছিল সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ১০ শতাংশ। এরপর ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪৩এ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতির মোট সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৯৪ এবং ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে কোটিপতির মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৬২। এরপর অক্টোবর ২০০১ থেকে ডিসেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছিল ৮ হাজার ৮৮৭ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরে বেড়েছিল ৫ হাজার ১১৪।

এদিকে কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেও কর আহরণে তার কোনো প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ভ্যাট ও আয়করের সিংহভাগ আসছে মধ্যবিত্তের কাছ থেকেই। ধনীদের মধ্যে কর ফাঁকির প্রবণতা অনেক বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্বচ্ছ লেনদেন ও রেকর্ড রাখার ব্যবস্থা না থাকায় কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এক শ্রেণির করদাতা। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রান্সফার প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে করযোগ্য আয় অন্য অধিক্ষেত্রে স্থানান্তরের কৌশল অবলম্বন করে কর ফাঁকি দেয়। দেশীয় কোম্পানিগুলো কর অবকাশ বা করমুক্ত সহযোগী প্রতিষ্ঠানে করযোগ্য আয় স্থানান্তরের মাধ্যমে কর ফাঁকি দিয়ে থাকে। ভুয়া আয়ব্যয়ের হিসাব দেখিয়ে প্রকৃত আয় গোপন করার মাধ্যমেও কর ফাঁকি দেওয়া হয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক’ প্রকাশিত ফাইনান্সিয়াল সিকিউরিটি ইনডেক্স২০১৫ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে, ১০ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা আমদানিরফতানি পণ্যের মূল্য অবমূল্যায়ন এবং অন্যান্য অবৈধ উপায়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে’।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেনের ‘বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের আকার ও প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের এই ২০ বছরে বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত হয়েছে ২০ শতাংশ মানুষ। মধ্যবিত্তদের ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ বা প্রায় অর্ধেকই বেসরকারি চাকরি করেন। আবার ২০ শতাংশের বেশি সরকারি চাকরি করেন। তবে প্রায় ২২ শতাংশ ব্যবসা করেন। গত দুই দশকে মধ্যবিত্ত জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২০ শতাংশ হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৩ সালে মোট জনসংখ্যার একতৃতীয়াংশ এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হবে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট সুইসের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রকাশিত সর্বশেষ গ্লোবাল ওয়েলথ প্রতিবেদন২০১৫ তথ্যমতে, ২০০০ সালে বাংলাদেশের মানুষের হাতে ৭৮ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ছিল। আর এর ১৫ বছরের মাথায় তা বেড়ে হয়েছে ২৩৭ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। এর আগে বিগত ২০০৫০৬ থেকে ২০১৩১৪ পর্যন্ত মোট ১০টি অর্থবছরে দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আয়কর ফাইল অনুসন্ধান ও তদন্ত করে ১৫ হাজার ৮১৭ মিলিয়ন বা ১ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা কর ফাঁকির সন্ধান পেয়েছে সরকারের কর গোয়েন্দো সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)

কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বেকারত্ব। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বিশ্ব যুব কর্মসংস্থান প্রবণতা, ২০১৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি ১০০ জন উচ্চশিক্ষিত যুবকযুবতীর মধ্যে বেকার ২৬ দশমিক ১ জন। বাংলাদেশি যুবশক্তির সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ বেকার। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্যমতে, দেশে বেকার যুবকযুবতীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সালে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি বেকার যুবকের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ। কিন্তু ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩২ লাখে।

বাড়ছে বৈষম্যও। খানাপর্যায়ের আয়ব্যয় জরিপও বলছে, আয়ের বণ্টন আরও অসম হচ্ছে। গ্রামেও বাড়ছে, শহরেও বাড়ছে। রাজধানীতে আরও বেশি করে। গ্রামাঞ্চলে অসমতা মাপার সূচক অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের ২৮ শতাংশের তুলনায় বেড়ে ২০১০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪৪ শতাংশে। শহরে দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে দশমিক ৪৫ শতাংশে। গত দুই দশকে দেশের সমৃদ্ধি বেড়েছে, কিন্তু তার সুফল অনেক বেশি যাচ্ছে ধনিক শ্রেণীর কাছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখন পর্যন্ত ৪ কোটি মানুষ দরিদ্র। কাজেই আত্মতুষ্টির কারণ নেই। চারভাবে বৈষম্য তৈরি হয়। আয়, ব্যয়, সম্পদ ও সামাজিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। বৈষম্য ও দারিদ্র কমাতে হলে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর ব্যবস্থায় ভারসাম্য বিশেষত ইনডাইরেক্ট নয়, ডাইরেক্ট কর ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল হতে হবে। এছাড়া সামাজিক কর্মকাে সমতা, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার আওতায় প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের নিয়ে আসা সর্বোপরি গরিবদের উৎপাদনমুখী কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি।

গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, মাথাপিছু আয়ের মধ্যে অনেক ফাঁক থাকে। দেশের মোট জাতীয় আয় এবং সে সঙ্গে মাথাপিছু আয় বাড়লেই সব মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ে না। দেশে একজন কোটিপতি তৈরি হলে, তার জন্য এক হাজার মানুষকে গরিব হতে হয়। অর্থনীতির এটাই নিয়ম। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাগরে ভাসমান অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষের আহাজারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দারিদ্র্য কত প্রকট, কর্মসংস্থানের কী দুরবস্থামানুষ কতটা বেপরোয়া হলে এ রকম ঝুঁকি নেয়। দেশজ উৎপাদন এবং জাতীয় আয়ের হিসাবে নানা রকম ফাঁকফোকর আছে। যে আয় দেখানো হয়, তা ভাগ করে দিলেই সবার পকেটে তা পৌঁছায় না। জাতীয় আয়ের হিসাবটা হয় অন্যভাবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্বাস্থ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের অবস্থা বোঝা যায় না। একদিকে দেশজ উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বৈষম্য। শহরে বড় বড় শপিংমল গড়ে উঠেছে। আবার জাকাতের শাড়িলুঙ্গি নেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উল্লম্ফনের খবর শুনে আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে একে রাজনৈতিক প্রচার প্রচারনায় ব্যবহারের কোনই অবকাশ নেই।।