Home » অর্থনীতি » অপ্রতিরোধ্য অর্থ পাচার

অপ্রতিরোধ্য অর্থ পাচার

এম. জাকির হোসেন খান

Dis-3গত বছরের ২০ জুন সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি)-র ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড২০১৩’ প্রতিবেদনে ২০১২ এর তুলনায় ৬২ শতাংশ বেড়ে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের ৩,১৬২.৭২ কোটি টাকা গচ্ছিত থাকার সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর আগেই আমাদের বুধবারের বিভিন্ন সংখ্যায় ‘কালো অর্থের পাচার’ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। গত ১০ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি কর্তৃক প্রণীত ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোস ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজঃ ২০০৪১৩’ প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০০৪ থেকে ২০১৩ অর্থাৎ এক দশকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে ৫,৫৮৭.৭০ কোটি ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে, যার পরিমাণ ৯৬৬ কাটি ৬০ লাখ ডলার বা প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের বাইরে চলে গেছে। এর আগের বছর পাচার হয় ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে অবৈধ অর্থ প্রবাহ বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। এছাড়া ২০০৮ ও ২০০৯ সালেও অবৈধভাবে পাচার হয় যথাক্রমে ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ও ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে অর্থ পাচার বৃদ্ধির হার হিসাব করলে ২০১৪ সালে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য পরিমাণ দাড়াতে পারে ১৪.০৫ বিলিয়ন ডলারে। এ হিসাবে ২০০৯২০১৪ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচারের সম্ভাব্য পরিমাণ দাড়াতে পারে ৪৮ বিলিয়ন ৩৬৩৯ মিলিয়ন ডলার বা ৩ লাখ ৭৭ হাজার ২৩৮ কোটি টাকায়, যা ২০১৫১৬ অর্থ বছরের বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের তুলনায় প্রায় ২৬ গুণ বেশি। এ পরিমাণ অর্থ দিয়ে সরকার কমপক্ষে ৯৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারতো। আর এ অর্থ দিয়ে ২/৩ টি পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব হতো, বিদেশ থেকে অধিক সুদে ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন পড়তো না।

অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক লেনদেন বা মিসইনভয়েসিং, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে এ অর্থ পাচার হয়েছে বলা হলেও, মূলত বাংলাদেশ থেকে আমদানিরপ্তানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করার মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার করা হয়েছে। গত ১০ বছরে এভাবে পাচার করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৯১৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ২০১৩ সালেই পাচার হয় ৮৩৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে, ১০ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ট্রান্সফার প্রাইজিং (কম মূল্যে আমদানি দাম দেখানো) এবং অন্যান্য অবৈধ উপায়ে আরো প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে। এর প্রধান দায় সরকার এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এবং দুদকের।

আন্তর্জাতিকভাবে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিক, আমলা সহ ব্যবসায়ীদেও সকল অবৈধ অর্থের নিরাপদ জিম্মাদার হিসাবে সুইজারল্যান্ডের ব্যাপক সমালোচনার প্রেক্ষিতে ২০০২ সাল থেকে দেশভিত্তিক জমাকৃত কালো টাকার পরিমাণ প্রকাশ করতে থাকে। এতে দুর্নীতিবাজরা তাদের আমানত উঠিয়ে নিতে শুরু করে এবং ২০০৮ থেকে সুইস ব্যাংকগুলোতে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ কমলেও আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের আমানত বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি অনুযায়ী ৫ হাজার ডলার বেশি অর্থ দেশের বাইরে পাঠানো যায় না। চিকিৎসা বা শিক্ষা ব্যয়ের জন্য বিদেশে টাকা পাঠাতে গেলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। মালয়েশিয়া (সেকেন্ড হোম প্রকল্প ও ব্যবসা), বৃটেন, সুইজারল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র, হংকক, দুবাই, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং আমলারা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কোটি কোটি ডলার জমা করছে। উল্লেখ্য, গত বছরের শেষ প্রান্তিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতার সন্তান অবৈধভাবে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার নিয়ে কানাডায় আটকের খবরও প্রকাশ পেলেও তা ধামাচাপা দেওয়া হয়। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং মন্ত্রীসহ প্রায় ২০জন বাংলাদেশি বড় ব্যবসায়ী নিজ নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে ‘কর স্বর্গ’ বলে পরিচিত যেমন জার্সি দ্বীপ এবং বৃটিশ ভার্জিন দ্বীপসমূহে অর্থ পাচার করা হয় (নিউ এজ, জুলাই ২০১৩)। হুন্ডির মাধ্যমেও বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে ব্যাপকভাবে, অনেকক্ষেত্রে ২৩ দিনের নোটিশে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৩৪ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে পৌছানো যায়। শুধুমাত্র মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ সুবিধার আওতায় ব্যাংকে গচ্ছিত প্রায় হাজার হাজার কোটি টাকার সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা জমাসহ মালয়েশিয়ার ফ্লাট/বাড়ি এবং গাড়ি ক্রয় সহ অন্যান্য খরচ মিলে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়। অনেক ক্ষেত্রে, বহুজাতিক কোম্পানিও কর ফাঁকির মাধ্যমে এর মুনাফা পাচার করে থাকে। প্রশ্ন হলো, দুদক, এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে এসব ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাঠানো হলো? শিল্পোন্নত দেশগুলো ১০০ বিলিয়ন ডলার উন্নয়ন সহায়তা দিলেও উন্নয়নশীল দেশসমূহ থেকে এদের মালিকাধীন বহুজাতিক কোম্পানি সমূহ প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলারের সমাপরিমাণ অর্থ কর ফাঁকির মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যায়।

শুধু তাই নয়, বিতর্কিত ১০ম সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের প্রকাশিত হলফনামায় প্রায় একশত ক্ষমতাসীন মন্ত্রী, এমপি’র জ্ঞাত আয় বহির্ভূত হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজ মেলে, ‘আলাদীনের চেরাগে’ স্বল্প সময়ে কয়েকশ গুণ সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা প্রকাশ পেলেও কেউ জানেনা সেসব অর্থ কোথায়? সেগুলো উদ্ধার না করে দুদক উল্টো ইতিমধ্যে তাদেরকে দুর্নীতির দায়মুক্তি সনদ দিয়েছে। এছাড়াও হলমার্ক, ডেসটিনি, সোনালি ও বেসিক ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেও আয়কর বিভাগের তথ্যমতে এসব টাকার কর প্রদান করা হয়নি। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, শেয়ার বাজার থেকে লুন্ঠনকৃত অর্থ, বিভিন্ন খাতের লাইসেন্স বিক্রি, রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ এবং বিভিন্ন দেশিবিদেশি কোম্পানির সাথে সম্পাদিত চুক্তি থেকে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন ক্ষমতাধর ব্যক্তি বিদেশে পাচার করছে। রাজনীতিবিদ, সরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ একটি শ্রেণী অসম এবং অনৈতিক এ কর ব্যবস্থার উপকারভোগী এবং তারাই প্রকৃত বৈধ/অবৈধ আয় গোপন করে বিদেশে বিশেষকরে ‘করস্বর্গ’ সুবিধাপ্রাপ্ত দেশে অর্থ জমা, বিনিয়োগ ও সম্পদ ক্রয় করে সম্পদের পাহাড় গড়ে সামাজিক বৈষম্য প্রকট করছে।

২০০৯ সালে জাতিসংঘ দুর্নীতিবিরোধী সনদে সাক্ষরকারী দেশ হিসাবে দোহায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বাংলাদেশ দুর্নীতি প্রতিরোধে তথা অনুপার্জিত কালো অর্থ উপার্জন এবং তার পাচার রোধে নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণ সমর্থন করে বলে উল্লেখ করে (প্রথম আলো, ১১ নভেম্বর ২০০৯)। বাস্তবে সরকার বছরের পর বছর কালো বা অপ্রদর্শিত অর্থ উপার্জনকারীদের কর প্রদানকারীর চেয়ে প্রায় একতৃতীয়াংশ হারে (মাত্র ১০ শতাংশ) কর প্রদানের মাধ্যমে অনুপার্জিত আয়কে বৈধ করার সুযোগ প্রদানের ফলে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন এবং তার পাচার বেড়েছে। আর, ‘কালো টাকা উপার্জনের প্রধান উৎস হলো, ঘুষ, চাঁদাবজি, মজুতদারি, চোরাকারবার এবং মাদক ব্যবসা সহ বিভিন্ন অনৈতিক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার সাথে যুক্ত হওয়ায় কালো টাকা সাদা করার নিয়মিত সুযোগ প্রদানের ফলে এর মাধ্যমে যে শুধু অর্থ পাচারের সুযোগ সৃষ্টি হয় তাই নয়, তা সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়নের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তাও বিঘ্নিত করে” (রাজস্ব সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন, ২০০৩)। বর্তমানে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে যে কালো অর্থ উপার্জন এবং পাচারের সংযোগ রয়েছে তা সরকারের প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হয়েছে। অথচ এগুলোর উৎস বন্ধ না করে উল্টো তার দায় বিরোধী রাজনীতিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে প্রধান কারণ ব্যাপক দুর্নীতি হলেও আর্থিক খাতে নিম্ন মানের গভার্নেন্স এবং কার্যকর তদারিকর ঘাটতি; এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যতম। অর্থ পাচারের সুযোগ অবারিত রেখে প্রতিনিধিত্বহীন সরকারের সাধারণ নাগরিকের পরোক্ষ করের বোঝা চাপানো শুধু অনৈতিক নয়, অসাংবিধানিকও বটে। বাংলাদেশ সংবিধানের ২০() অনুচ্ছেদে বলা হয় যে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুর্পাজিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবে না’। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি সহ সরকার নিজে সকল অবৈধ উপার্জন বা দুর্নীতি প্রতিরোধে অবস্থান গ্রহণ করা সরকারের রাজনৈতিক শুধুমাত্র অঙ্গীকার বা ইশতেহারে বর্ণিত কথামালা নয় বরং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।।