Home » শিল্প-সংস্কৃতি » জেমস বন্ড-এর সেকাল-একাল (শেষ পর্ব)

জেমস বন্ড-এর সেকাল-একাল (শেষ পর্ব)

ফ্লোরা সরকার

Last-6এর আগের পর্বগুলোতে বেন ফোক সম্প্রতি যে তেইশটি (সর্বশেষ ছবিটি বাদ দিয়ে) বন্ড সিরিজের একটা তালিকা করে, নিকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্ট ছবির উপর আলোচনা করেছেন সেসব সিরিজের চৌদ্দটি ছবির উপর আমরা আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি মন্দ থেকে ভালোর ক্রমানুসারে সিরিজগুলো সাজানো হলেও, সময়ের ক্রমানুসারে সিরিজগুলো নিকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্ট হয়নি। অনেক আগে বানানো সিরিজগুলো দেখা গেছে পরবর্তী সময়ের সিরিজের চেয়ে বেশ জনপ্রিয় ছিলো। এর অন্যতম একটা কারণ হতে পারে, যেসব বন্ড সিরিজে যৌনতার উপর অত্যধিক প্রাধান্য দেয়া হয়েছে (বিশেষ করে রজার মুর অভিনীত ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ ছাড়া অন্যান্য সিরিজগুলি) সেগুলো পছন্দের তালিকা থেকে আগে বাদ পড়েছে। তাছাড়া নির্মাণ শৈলী, নান্দনিকতা এবং সর্বোপরি প্রধান চরিত্র জেমস বন্ডের উপযুক্ত প্রতিফলন ইত্যাদি কারণে পছন্দের সিঁড়িতে ওঠানামা করেছে। এবার আমরা অবশিষ্ট সিরিজগুলো উপর আলোপাত করবো।

শেন কনেরির সব থেকে সার্থক অভিনয় দেখা যায় ১৯৬৩ সালে নির্মিত বন্ড সিরিজ ‘ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ’ ছবিতে। ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছে একজন সুন্দরী নারী যিনি ইস্তাম্বুলে অবস্থিত রাশিয়ান দূতাবাসে কাজ করেন এবং যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্যে আবেদন করেন। পাশাপাশি ০০৭ এর নায়ক, জেমস্ বন্ডকে ফটোতে দেখে মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে চান। তারপর থেকে কাহিনী জটিল ওলিগলি দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। যে কাহিনীর সঙ্গে দর্শকও এগিয়ে যেতে থাকে। কাহিনীর জমাট বুননই প্রকৃতপক্ষে ছবিটিকে সার্থক করে তোলে।

রজার মুরকে সব থেকে যৌন আবেদনময়ী হিসেবে আমরা পাই ১৯৭৩ সালে নির্মিত ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ ছবিতে। নায়কোচিত এবং আকর্ষণীয় মুর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই ছবিতে। তাছাড়া তার যৌবনদৃপ্ত মুখায়ব প্রকৃত বন্ড নায়কে রূপান্তরিত করে। ১৯৬২ সালের ‘ড. নো’ ছবিটি যখন মুক্তি পায়, সেই সময়ে ‘বন্ড, জেমস্ বন্ড’ শব্দটা যেন একটা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়ে যায়। বিশেষ করে শেন কনেরির অভিনয় গুনে জেমস্ বন্ড নামটি একটা আইকনে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে।

বন্ড সিরিজের ‘ক্যাসিনো রয়াল’ এর অভিনেতা ড্যানিয়েল ক্রেইজের আবির্ভাবের আগে একমাত্র টিমোথি ড্যালটানকে এই সিরিজের সব থেকে দুধর্ষ নায়ক হিসেবে ধরে নেয়া হয়। তবে এর পেছনে বিশেষ কারণও কাজ করে। কেননা, বাস্তবে টিমোথির বন্ধু খুন হবার পর প্রতিশোধ হিসেবে অনেকটা অতিশয়োক্তি করেই তিনি বন্ড চরিত্রটিকে উপস্থাপন করেন ১৯৮৯ সালে নির্মিত ‘লাইসেন্স টু কিল’ ছবিতে। ফলে পরিচালক ইয়ান ফ্লেমিং এর পরিচিত বন্ড থেকে তাকে বেশ খানিকটা সরে যেতে দেখা যায় এই ছবিতে। অর্থাৎ অতিমাত্রায় দুধর্ষ ভাবে পর্দায় হাজির হন টিমোথি।

২০০৬ সালে নির্মিত ‘ক্যাসিনো রয়াল’এ ড্যানিয়েল ক্রেইজ যেন টিমোথির স্থলাভিষিক্ত হন। এবং পরিচালক মার্টিন ক্যাম্বেলের দক্ষ পরিচালনায় ড্যানিয়েল বন্ড চরিত্রকে আরো সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলেন।

আইরিশ অভিনেতা পিয়ার্স ব্রসন্যান ১৯৯৫ সালে নির্মিত ‘গোল্ডেন আই’ ছবির মাধ্যমে প্রথম বন্ড সিরিজে পদার্পণ ঘটলেও চমৎকার অভিনয় দখ্যতায় উৎরে যান। বিশেষ করে বিশাল বিশাল জাম্প শট, ট্যাংক ধাওয়া করা ইত্যাদি দৃশ্যগুলিতে একেবারে বাস্তবিক অভিনয় দেখাতে সক্ষম হন। তাছাড়া তার আশেপাশের রমনীকুল তো ছিলোই, যা বন্ড সিরিজগুলির অন্যতম আকর্ষণ। বলা হয়ে থাকে সমস্ত বন্ড সিরিজগুলিতে রজার মুর যদি সব থেকে সফল অভিনয় দেখিয়ে থাকেন তাহলে তিনি দেখিয়েছেন ১৯৭৭ সালে নির্মিত ‘দা স্পাই হু লাভড মি’ ছবিতে। থ্রিলার হিসেবেও এই ছবিটি একটি সার্থক ছবি।

১৯৬৯ এ নির্মিত ‘অন হার মেজেসটিস সিক্রেট সার্ভিস’ ছবির সার্থকতা ছিলো পৃথিবী বিখ্যাত অভিনেতা জর্জ লেজেনবির অভিনয়ের কারণে। ছবির গল্পে বন্ডকে খুব অসহায় ভাবে প্রেমে পড়তে দেখা যায়। যে প্রেম লেজেনবির মতো অভিনেতার পক্ষেই দেখানো সম্ভাব।

বন্ড সিরিজের সব থেকে উপরের তালিকায় যে ছবিটিকে রাখা হয় তা হলো ‘গোল্ড ফিঙ্গার (১৯৬৪)’। ছবি হিসেবে বড় মাপের না হলেও, বিনোদন হিসেবে গোল্ড ফিঙ্গারের কোনো তুলনা চলেনা। বন্ড চরিত্রের যত গুনাবলি থাকা প্রয়োজন সব যেন এই একটি ছবিতেই আমরা পেয়ে যাই, বিশেষ করে শেন কনেরির অন্যবদ্য অভিনয়ের কারণে। একশ একগারো মিনিটের এই সিরিজটি ‘ ড.নো’ এর কাহিনীর সঙ্গে যেন মিলিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এটাই একমাত্র সিরিজ যেখানে অযথা যৌনতাকে গুরুত্ব করে তোলা হয়নি। থ্রিলিং এর পাশাপাশি জেমস্ বন্ড মানেই যৌন আবেদনময় নায়ক হিসেবে গন্য করা হয়। অথচ এই ছবিতে সেসব ছাড়াই বিনোদনের অজশ্র পরিসর পরিচালক গাই হ্যামিল্টন দেখিয়ে দেন।

উপন্যাসের জেমস্ বন্ড এক রকমের আকর্ষণীয় এবং পর্দার জেমস্ বন্ড আরেক ধরণের আকর্ষণীয়। উপন্যাসে বন্ডকে কল্পনা করে নিতে হয়। কিন্তু পর্দায় কল্পনার সেই স্থান নেই। জীবন্ত বন্ডকে পর্দার উপর চলতে, ফিরতে দেখা যায়। এই প্রতিফলন দর্শকের মনে দাগ কেটে যায়। জেমস্ বন্ডকে ভালো লাগার প্রধান কারণ, প্রায় প্রতিটা বন্ড সিরিজে চলচ্চিত্রের সব থেকে আকর্ষণীয় নায়কদের এনে হাজির করা হয়। ফলে, কাহিনীর আকর্ষণ ছাড়াও, বন্ড চরিত্রের অভিনেতারাই মূলত জেমস বন্ডকে এতো দীর্ঘকাল থেকে ধরে রেখেছে। আর তাই আমরা এই ২০১৫ সালেও আবার জেমস্ বন্ডকে পর্দায় হাজির হতে দেখি ‘স্পেকট্রা’ ছবির মধ্যে দিয়ে।।