Home » আন্তর্জাতিক » ট্রাম্প :: কাঠামোতে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার উদ্ভব

ট্রাম্প :: কাঠামোতে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার উদ্ভব

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Dis-6অভিবাসী কিংবা পর্যটক যেকোনো পরিচয়ে মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার যে আহ্বান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের টিকেট পেতে আগ্রহী রিপাবলিকান দলীয় ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, সেটা রাজনৈতিক দাবানল উস্কে দিয়েছে। সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী ভাবাবেগের প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য আবেদন আমেরিকার ক্ষমতাসীন এলিটদের জন্য রাজনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে।

মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে যুদ্ধ ও হস্তক্ষেপকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনের আমেরিকাকে ‘স্বাধীনতা’ ও ‘গণতন্ত্রে’র ত্রাণকর্তা হিসেবে অভিহিত করা সরকারি দাবিকে চূর্ণ করে দিয়েছে তার এই রূঢ় বাগাড়ম্বরতা। এই গণতান্ত্রিক মুখোস অগোচরে খুলে দিয়েছেন ট্রাম্প।

লুকানো নোংরামিতে এমন প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়বে, এমনটা আশা করেনি এলিটরা। এ প্রেক্ষাপটেই হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি যশ আরনেস্ট বলেছেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব ‘তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুপযুক্ত করে ফেলেছে। ’ তিনি ট্রাম্পের বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্যকে ‘দেশের জন্য ক্ষতিকর’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এটা সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করতে আমেরিকান মুসলিম নেতাদের সাথে ‘অংশদারমূলক কাজ’ করাটা কঠিন করে দিয়েছে।

পেন্টাগনের সরকারি মুখপাত্র পিটার কুক, তিনি সাধারণত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে মন্তব্য করতে চান না তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধ করছে বলে আইএসর ভাষ্যকে জোরালো করে এমন যেকোনো কিছুই আমাদের মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী। ’

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র, শীর্ষ স্থানীয় কংগ্রেসীয় রিপাবলিকান, পল রাইয়ান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা মৌলিক সাংবিধানিক নীতি। এটা এই দেশের অন্যতম মূল ভিত্তি। ’ একইসাথে তিনি ঘোষণা করেন, ট্রাম্প যদি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য রিপাবলিকান নমিনি হন, তবে তিনি তাকে সমর্থন করবেন।

আমেরিকান মিডিয়ায় ট্রাম্পের নিন্দা জানিয়ে অনেক সম্পাদকীয়, কার্টুন ও কলাম লিখেছে। অনেকে হিটলার বা মুসোলিনির সাথে ট্রাম্পকে তুলনা করেছে। সিএনএনে এর জাতীয় নিরাপত্তা সম্পাদক পিটার বারজেন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, ‘ট্রাম্প কি ফ্যাসিস্ট? ’

দক্ষিণপূর্ব মিশিগানের, এখানে লক্ষাধিক মুসলিমআমেরিকানের বাস, বৃহত্তম সংবাদপত্র ডেট্রয়েট ফ্রি প্রেস ‘আমরা একসাথে আছি’ শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় ব্যানার শিরোনাম প্রকাশ করে। এতে ট্রাম্পের বক্তব্যকে এই ভাষায় নিন্দা করা হয় : ‘এটা গোড়ামি ও বর্ণবাদের চেয়ে কম কিছু নয়। এটা আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় ফিরে যাওয়া। ’ ট্রাম্পের ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্নে সরকারি ভাষ্যগুলোতে দুঃখপ্রকাশের পাশাপাশি ‘আমরা যা, এটা তা নয়’ বলে আনুষ্ঠানিকভাবে যা বলা হচ্ছে তা একইসাথে কপটতা ও অসততা। ক্ষমতাসীন শ্রেণী তাদের প্রতিক্রিয়াশীল, নৃশংস ও গণতন্ত্রবিরোধী নীতিগুলো এমনভাবে প্রকাশিত হোক তা পছন্দ করে না।

এই বিলিয়নিয়ারের গলাবাজি সত্যিকারের নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং তার কথায় সেগুলোই সরাসরি প্রতিফলন ঘটেছে। যেসব নীতির কারণে আবু গ্রাইব, ফালুজা, সিআইএ’র গোপন কারাগার এবং গুয়ান্তানামো বে’র সৃষ্টি হয়েছে, ট্রাম্পের বক্তৃতা সেটাই তুলে ধরেছে।

আমেরিকান ক্ষমতাসীন শ্রেণীটি যা করেছে, তারা আসলে সেটাই। সংবিধান, বিল অব রাইটস উদযাপনের হলিডে স্পিচেস, কিংবা ৯ ডিসেম্বর ক্রীতদাস বিলোপকারী ত্রয়োদশ সংশোধনী গ্রহণের ১৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ৯ ডিসেম্বর ওবামার বক্তৃতায় আমেরিকাকে যেভাবে তুলে ধরা হয়, তারা তা নয়।

বিশ্বকে অশান্তিতে ভরে তুলছে তারাই। পৃথিবীর বৃহত্তম তেল ও গ্যাস মজুতের স্থান মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য গত ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র একটার পর একটা যুদ্ধ করে যাচ্ছে। সামাজিক বৈষম্য অসহনীয় পর্যায়ে বাড়তে থাকায় ক্ষমতাসীন এলিটদের শ্রমজীবী শ্রেণীর সবচেয়ে নির্যাতিত অংশের বিরুদ্ধে আরো ব্যাপক সহিংসতা গ্রহণ করতে চাইছে। এই সমাজ এতটাই নৃশংস হয়ে পড়েছে যে, সম্প্রতি প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ১৫ বছরেই দুই লাখ আমেরিকান নিহত হয়েছে। কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও একটি যুদ্ধে আক্রান্ত দেশ।

ট্রাম্পের উত্থানে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক যুক্তি রয়েছে। এ ধরনের ব্যক্তিত্বের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী কার্যক্রমে শীর্ষ স্থানে ওঠে আসাটা এটাই প্রমাণ করে, দেশটির সরকারি কাঠামোতে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার উদ্ভব ঘটছে। তার মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের পরপরই পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, রিপাবলিকান ককাস ও প্রাইমারি ভোটারদের ৬৫ ভাগই মুসলিমদের নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতি সায় দিয়েছে। কেবল এই একটি ঘটনা দিয়েও প্রমাণ করা যায়, ট্রাম্পের প্রার্থিতা কিভাবে মার্কিন সরকারি রাজনৈতিক নীতি আরো ডান দিকে পরিবর্তিত হওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)