Home » আন্তর্জাতিক » বিহারে পরাজয় :: চ্যালেঞ্জে মোদি নেতৃত্ব

বিহারে পরাজয় :: চ্যালেঞ্জে মোদি নেতৃত্ব

আসিফ হাসান

Last-5বিহার নির্বাচন ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-নেতৃত্বাধীন সংঘ পরিবারের মধ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চলেছে। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন থেকে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ যে দোর্দণ্ড প্রতাপে সরকার আর দল দাবড়ে বেড়াচ্ছিলেন, তার রাশ বুঝি বিহারের ভরাডুবিতে অবসান হতে চলেছে। মোদি ও অমিত শাহের একনায়কতান্ত্রিক কার্যক্রমের ফলে দেড় বছর ধরে যারা কোনঠাসা রয়েছেন, তারাই এখন সোচ্চার হয়েছেন এই জুটির বিরুদ্ধে। আর বিষয়টি কেবল বিজেপির মধ্যেই সীমিত থাকবে, তাও নয়, বরং ভারতীয় রাজনীতিতেও বিভিন্ন পর্যায়ে সেটা সুস্পষ্টভাবেই অনুভূত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

বিহারে যে ধরনের বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে বিজেপি, তাতে করে আঘাত আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এত দ্রুত আসবে, তা ছিল কল্পনাতীত। বিহার নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার মাত্র দুই দিনের মধ্যে সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী এল কে আদভানি ও সাবেক মন্ত্রী মুরলী মনোহর যোশির মতো বিজেপির বর্ষীয়ন নেতারা প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তাতে সংঘ পরিবারের অনেক কর্মী ও পর্যবেক্ষক বিস্মিত হয়েছেন। বিবৃতিটি ছোট হলেও তাতে ঝাঁজ ছিল তীব্র। এতে সাবেক মন্ত্রী যশোবন্ত সিনহা, হিমাচল প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সন্ত কুমার সই করেছেন। তারা সুনির্দিষ্টভাবে কাউকেই আক্রমণ করেননি, তবে কারা যে টার্গেট, তা নিয়ে কারোরই সংশয় নেই। বিবৃতির শুরুতেই ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দিল্লির নির্বাচনে আম আদমি পার্টির (অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আপ) কাছে ভরাডুরি জের টেনে জোর দিয়ে বলা হয়, ‘দিল্লির শোচনীয় ব্যর্থতা থেকে কোনোই শিক্ষা গ্রহণ করা হয়নি। ’

বিবৃতিটিতে এরপরই তীব্র আঘাত হেনে বলা হয়, ‘বিহার পরাজয়ের জন্য সবাই দায়ীএমন কথা বলে আসলে এটাই নিশ্চিত করা হয়েছে, কারোরই দায়দায়িত্ব নেই। বিজেপির জয়ের সময় যারা কৃতিত্ব নেন, তারা বিহারের বিপর্যয়ের দায় তারা গ্রহণ করতে চাইলেন না। ’ তাদের মতে, সর্বশেষ এই পরাজয়ের মূল কারণ হলো ভুল হিসাব। পরাজয়ের কারণগুলো খতিয়ে দেখার দাবিও তারা জানিয়েছেন। তবে সেই সাথে এ কথাও বলে দিয়েছেন, যারা বিহারের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে, তাদের দিয়ে কোনো অবস্থাতেই পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ করা চলবে না। উল্লেখ্য, বিহার নির্বাচনে পরাজয়ের পরপরই বিজেপির পার্লামেন্টারি বোর্ড জানিয়েছিল, এই ফলাফলের দায়দায়িত্ব সবার। এই মন্তব্যকে লক্ষ করেই বিজেপির মুরব্বিদের এই বিবৃতি।

বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লক্ষ্ণৌতে আরএসএসের এক সিনিয়র নেতা ফ্রন্টলাইনকে বলেন, সংঘ পরিবারের এই সাধারণ উপলব্ধির সৃষ্টি হয়েছে, এই পরিস্থিতি আসলে বিজেপির ভেতরে বৃহত্তর আন্দোলনের সূচনা, যা দলের অভ্যন্তরীণ কৌশল এবং একই সাথে জাতীয় রাজনীতিতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

অবশ্য মোদিঅমিত শাহরাও বসে নেই। মুরব্বিদের বিবৃতির গুরুত্ব লাঘব করার জন্য বিজেপির সাবেক তিন সভাপতি রাজনাথ সিং, নিতিন গাড়করি ও এম. ভেঙকাইয়া নাইডুকে দিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, এতে অমিত শাহের প্রতি সমর্থনও প্রকাশ করা হয়েছে। এই বিবৃতিতে বিহারে পরাজয়ের উদ্বেগ প্রকাশ করার কথা বলা হলেও ‘কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে’ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, মোদির নেতৃত্বে দল লোকসভা নির্বাচনের পর স্থানীয় পর্যায়ের ছাড়াও ঝাড়খ-, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা এবং জম্মু ও কাশ্মিরে জয়ী হয়েছে। সাবেক সভাপতিরা প্রতিশ্রুতি দেন, বিহারের পরাজয় নিয়ে তারা বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করবেন।

আরএসএসের এক কর্মীর মতে, পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, বলা যায় না। তার মতে কারো প্রতি আনুগত্য স্থায়ী কোনো বিষয় নয়। তবে এই দ্বন্দ্ব আগামী মাসেই প্রকট হয়ে দেখা দিতে পারে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বিজেপির সভাপতি হিসেবে অমিত শাহের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। বিজেপির মুরব্বি গোষ্ঠীটি এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবেন।

এমপিদের ভূমিকা : জানুয়ারিতে সভাপতি নির্বাচনে কোন কৌশল গ্রহণ করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। আদভানি ও মুরলী মনোহর যোশির সাথে ঘনিষ্ঠ বিজেপি ও সংঘ পরিবার কর্মীরা মনে করে লোকসভার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপি মুরব্বিদের পদক্ষেপকে সমর্থন করে। এই সংখ্যাটা ১২০ হতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। এই সংখ্যাটি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিহারের নির্বাচনের সময় অমিত শাহ যেসব মন্তব্য করেছেন, বিশেষ করে পাকিস্তান নিয়ে, সেটাকে সহজভাবে নেওয়া হচ্ছে না।

অনেকে আবার এমপিদের মূল্যায়ন না করার বিষয়টিও তুলে ধরছেন। মোদিঅমিত মনোনয়ন দিতে স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করছেন অনেক এমপি। এমন প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী যথাক্রমে শিবরাজ চৌহান ও রমন সিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে এই দুই নেতারই ব্যাপক অনুসারী, শুভাকাক্সক্ষী রয়েছে। তারা যদি বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তবে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে।

তবে ওই লড়াইয়ে কোন পক্ষ জয়ী হবে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য রাজনাথ সিং এবং সুষমা স্বরাজও মোদিঅমিতের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারেন। অনেকেই মনে করছেন, রাজনাথ সিং চেয়েছিলেন বিকল্প শক্তিকেন্দ্রে থাকতে, মন্ত্রী নয়। মোদিই তাকে মন্ত্রী হতে বাধ্য করার মাধ্যমে আসলে বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। তিনি এবার নিজের অবস্থান সংহত করার চেষ্টা করতে পারেন।

এ থেকে অনিবার্যভাবে যা ফুটে ওঠেছে তা হলো, সর্বজয়ী সর্বোচ্চ নেতার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্তৃত্ব ম্লান হয়ে পড়েছে, আর তাতে করে অন্যদের নির্দেশ দেওয়ার সামর্থ্যও কমে আসছে।।

(ফ্রন্টলাইন অবলম্বনে)