Home » রাজনীতি » রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদ দিয়ে কী জঙ্গীবাদ দমন সম্ভব?

রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদ দিয়ে কী জঙ্গীবাদ দমন সম্ভব?

হায়দার আকবর খান রনো

Dis -1কর্তৃত্ববাদকে সাধারণত ভয়াবহ শাসন ব্যবস্থা হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করা হয়। গত শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দলিলসমূহে এ ধারার শাসন ব্যবস্থাকে এই ভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাই অনেক তাত্ত্বিক আমাদের মতো দেশের শাসন ব্যবস্থাকে কখনই সেই ধরনের বলতে রাজি নন। আমার মতে, এই রকম সংজ্ঞা নিয়ে তর্ক অথবা কোন সংজ্ঞাকে অতি সংকীর্ণ অর্থে গ্রহণ করা নিতান্তই মুর্খতা। তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সাধারণ সম্পাদক জর্জ ডিমিট্রভ (যিনি পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক বুলগেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন), এ সম্পর্কে সবচেয়ে গভীর আলোচনা করেছেন। তিনি কিন্তু বলছেন, আজকাল প্রায় সকল পুজিবাদী দেশেই কমবেশি ওই কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা দেখা যায়।

পুজিবাদী রাষ্ট্রে দুই ধরনের শাসন ব্যবস্থা দেখা যায়। () বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি, যেখানে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাক স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা তবে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ, কিন্তু শ্রেণী নিরপেক্ষ কখনই নয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, নিয়মিত নির্বাচন। কিছু ত্রুটি থাকলেও তা সর্বসাধারণের নিকট গ্রহণযোগ্য এবং বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষিত হয়।

() সরাসরি কর্তৃত্ববাদী শাসন, যেখানে বিরোধী দলকে ও বিরোধী মতকে গায়ের জোরে দমন করা হয়, নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়, বিচার ব্যবস্থাকে সরকার বা সুনির্দিষ্টভাবে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আজ্ঞাবহে পরিণত করা হয়, প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস প্রকটভাবে দেখা যায়।

বাংলাদেশে এখন যা চলছে তা উপরে উল্লেখিত দ্বিতীয় বর্গের মধ্যেই পড়ে। নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষের উপর চালানো হচ্ছে চরম দমননীতি। গুম, খুন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এখন প্রতিদিনের চিত্র। বিশেষ করে ২০১৪ সালের প্রহসনের নির্বাচনের পর থেকে বর্তমান সরকার ক্রমাগত কর্তৃত্ববাদী শাসকে পরিণত হয়েছে যেখানে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হতে হতে প্রায় শূন্যে রূপান্তরিত হয়েছে। সরকারের জনপ্রিয়তাও শূন্যের কোঠায় গিয়ে দাড়িয়েছে। শূন্য জনপ্রিয়তা গণতান্ত্রিক পথ, পদ্ধতি ও জমিনকে শূন্যে পরিণত করেছে।

কিন্তু এর দ্বারা জনগণের ক্ষোভকে চেপে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষোভ প্রকাশের জন্য জায়গা রাখা হয়। ফলে হঠাৎ করে বিস্ফোরণ ঘটে না। অন্যদিকে জনগণের চাপা ক্রোধ ও ক্ষোভ আকস্মাৎ বিস্ফোরণে পরিণত হতে পারে। কিন্তু জনগণ যদি বিকল্প কোন শক্তির উপর ভরসা করার জায়গা না পায় তাহলে হয়তো কর্তৃত্ববাদ দীর্ঘ সময়ের জন্য চেপে বসে থাকতে পারে। সেই ক্ষেত্রে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটতে পারে সন্ত্রাসী, উগ্রবাদের পথে। সেটাই মূল উদ্বেগের কারণ।

তাছাড়া আরও একটি ভয়ানক উদ্বেগের কারণও তৈরি হয়েছে। এই রকম গণতন্ত্রহীন পরিবেশে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় জঙ্গী ও উগ্রবাদের বিকাশ ঘটতে পারে। হ্যা, রাষ্ট্র ক্ষমতায় না থাকলেও ধর্মের নামে সন্ত্রাসবাদ এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী চরপন্থায় রূপ নিতে পারে এবং নিচ্ছেও তাই, পৃথিবীর অনেক দেশে। তালেবান, আল কায়েদা অথবা সাম্প্রতিক সময়ের ইসলামিক টেস্ট (আইএস) যে রাজনৈতিক প্রবণতার জন্ম দিয়েছে তাকে কর্তৃত্ববাদী চরমপন্থা বলে আখ্যায়িত করা অসঙ্গত হবে না। পরমতকে অস্বীকার এবং একমাত্র সন্ত্রাসই যদি কোন তথাকথিত রাজনৈতিক, সামাজিক ধর্মীয় মতবাদ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ বলে বিবেচিত হয় তাহলে তাকে নিশ্চিতভাবে ধর্মের নামে কর্তৃত্ববাদীতা বলা চলে। সম্প্রতি এই ধর্মীয় জঙ্গীবাদ ভয়ারূপ আত্মপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশেও। এ বছরেই পাচজন ব্লগার, লেখক ও প্রকাশককে হত্যা, একজন ইতালীয় নাগরিক ও একজন জাপানি নাগরিক হত্যা, শিয়া সম্প্রদায়ের উপরে হত্যাকাণ্ড, দিনাজপুরে মন্দিরে ধর্মীয় উৎসবে বোমাবাজি ও হত্যা, ঈশ্বরদীতে খ্রিস্টান ধর্মীয় যাজককে গলাকেটে হত্যাপ্রচেষ্টা ইত্যাদি খুব সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবলী। পাশাপাশি তাদের দৃষ্টিতে যারা ইসলামের শত্রু তাদেরকেও হত্যার হুমকি দিয়ে অজ্ঞাত জায়গা থেকে ইমেইল বা ফোন করেছে। অবশ্যই তাদের এই আচরণ কাপুরুষোচিত। কয়েকদিন আগে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খানকেও প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে। আরও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীও প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন। এরা অন্ধকারের, দৃশ্যমাণ নয় এবং নিঃশব্দ আততায়ী।

ধর্মকে ব্যবহার করে উগ্রবাদী, চরমপন্থী তা ইসলামী, হিন্দু, খৃষ্টীয় অথবা ইহুদী যাই হোক না কেন, তারা নিজ মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় হত্যা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে। এই লেখায় আমি ইসলামি উগ্রপন্থা নিয়ে আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখবো। কারণ আমাদের দেশে তারাই ভয়াবহ বিপদ হিসাবে উপস্থিত হয়েছে। এই বিপদ যতো বাড়বে, ততোই সরকারের জন্য গণতন্ত্র সংকুচিত করার অজুহাত তৈরি হবে। অন্যদিকে সরকার যতো বেশি গণতন্ত্রকে সংকুচিত করবে ততোবেশি করে ধর্মীয় জঙ্গীবাদ আরও হিংস্র রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে।

এই ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন পাশ্চাত্য শক্তির সঙ্গে ইসলামী মৌলবাদের সংঘাত চলছে। একথা তো অস্বীকার করা যাবে না যে, কমিউনিজমকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে মার্কিন প্রশাসন একদা তালেবান ও আল কায়েদা সৃষ্টি করেছিল। এমনকি সোভিয়েত পতনের পরও কমিউনিস্ট ভীতি দূর হয়নি। ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট কার্টারের তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিগনিউ ব্রুঝেনিস্কি একটা বই লিখেছিলেন Out of Control. Global Turmoil on the Eve of the Twenty-First Century. সেখানে তিনি বলছেন, মার্কিন পরাশক্তি যেন আগ্নেয়গিরির উপরে বসে আছে। তিনি বাস্তবটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন ঠিকই। কিন্তু সমাধান কী? তিনি বলছেন, এর থেকে রক্ষা পেতে হলে ধর্মীয় পুনরুত্থানকে সমর্থন করতে হবে। তিনি বিশেষভাবে ইসলামী ও খৃষ্টীয় ধর্মের কথা উল্লেখ করেছেন। অবশ্য একই সময় সাম্রাজ্যবাদের কলমপেশা অন্য কিছু পণ্ডিত ও লেখক (যেমন স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন) ইসলাম বিদ্বেষ প্রকাশ করেছেন।

বর্তমান সময়েও আইএসকে যে তৈরি করেছে পশ্চিমারা প্রায় বছর তিনেক আগে, সেই তথ্যটাও ফাস হয়ে গেছে। ধর্মীয় মৌলবাদকে তারা মদদ দেয় জনগণের মুক্তির সংগ্রামকে বিভ্রান্ত করার জন্য। অবশ্য আইএস তৈরি করা হয়েছিল মূলত সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের লক্ষ্যে। সেই কারণেই আইএস শিয়া বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। বস্তুত তারা ভিন্ন ধর্মমতের সকলেরই বিরুদ্ধ এবং বিরোধীদের খুন, খতম, সন্ত্রাস দ্বারা ধ্বংস করতে চায়।

মধ্যপ্রাচ্যে ও পাকিস্তানে সুন্নিশিয়া সংঘর্ষ থাকলেও এবং রাজনীতিতে তার বহিঃপ্রকাশ থাকলেও বাংলাদেশে কখনো শিয়াসুন্নি বিরোধ দেখা যায়নি। এই প্রথম তাজিয়া মিছিলে ও শিয়া মসজিদে হত্যাকাণ্ড দেখে মনে হয় আইএসএর প্রভাব এই দেশীয় ইসলামী জঙ্গীদের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে।

সরকার বারবার আইএসএর অস্তিত্ব অস্বীকার করে এসেছে। অথচ কিছুদিন আগেও স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশ, র‌্যাব ‘অমুক আইএস কর্মীকে ধরা হয়েছে’ বলে গর্ববোধ করেছিলেন। এখন অস্বীকার করছেন। কেন? কারণটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আইএস আছে স্বীকার করলে ওরা ‘হামলে পড়বে’। ওরা মানে কারা তা স্পষ্ট না করলেও আমরা জানি ওরা হচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। শেখ হাসিনাও তাদেরকে বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু শাক দিয়ে কি মাছ ঢাকা যায়? আইএসএর কোন সাংগঠনিক ইউনিট না থাকলেও একই মতাদর্শের সংগঠন যে তৎপর রয়েছে তা কি গোপন রাখা যাবে?

প্রধানমন্ত্রী বলতে চাইছেন, ষড়যন্ত্র চলছে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। কার বিরুদ্ধে? তিনি বলতে চান, তার বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র। যদি তাইই হয় তাহলে তার রক্ষাকবচ কি? একটাই রক্ষাকবচ আছে। তাহলো জনগণকে সম্পৃক্ত করে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ধর্মের নামে এই উগ্রবাদ, জঙ্গীবাদকে মোকাবেলা ও দমন করা। আর সেই কাজ করতে হলে পূর্বশর্ত হলো দেশে গণতন্ত্রকে প্রসারিত করা, বর্তমানের বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে গণতন্ত্রকে প্রকৃতই উন্মুক্ত করা। কিন্তু সে পথে হাটছেন না প্রধানমন্ত্রী। বরং দমনপীড়ন, বিচার বহির্ভূত হত্যা, মানবাধিকার লংঘন ও গুম হওয়ার ঘটনা যে পর্যায়ে গেছে, তাতে রাষ্ট্রীয় একনায়কান্ত্রিকতা, কর্তৃত্ববাদীতা যেন আরও চেপে বসেছে। কাজেই এক সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা কি পারে আরেক চরম উগ্রপন্থাকে মোকাবেলা করতে?