Home » অর্থনীতি » সুন্দরবন :: জনদাবি উপেক্ষিত হতেই থাকবে

সুন্দরবন :: জনদাবি উপেক্ষিত হতেই থাকবে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis-4সরকার কোন জাতীয় ইস্যুতে কতটা জেদী ও অনমনীয় হতে পারে তার একটি প্রমান রামপালে নির্মানাধীন কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট। সরকার এক্ষেত্রে শুধু অনমনীয়ই নয়, স্পর্শকাতরও বটে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে এর বিরুদ্ধে কোন নাগরিক আন্দোলন সহ্য করতেও সরকার প্রস্তুত নয়। গতমাসে তেলবিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির লংমার্চ পুলিশের লাঠিপেটা ও গ্রেফতারের শিকার হয়। এই প্রজেক্ট নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুরোধউপরোধ অবলীলায় উপেক্ষা করছে সরকার। দেশের রাজনীতিবিদরা, বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল দু’একটি সাদামাটা বিবৃতি দেয়া ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চুপ। ধরেই নেয়া যেতে পারে, সরকার ও বিরোধী দল ভারতের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ককেই বেশি গুরুত্ব দেয় তা দেশের প্রধান বনসম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবার ঝুঁকি থাকলেও!

মূল প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু হয়নি। প্রস্তুতি হিসেবে মাটি ভরাটের কাজ চলছে। যদিও নির্ধারিত জায়গার বিপরীতে পরিবেশগত ছাড়পত্র এখনও মেলেনি। এজন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাথে এখনও বাংলাদেশভারত ফেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানী লিমিটেডের ভূমি ইজারা চুক্তি হয়নি। প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগও পাচ্ছে না সরকার। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ নির্ধারন করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারত নিজস্ব তহবিল থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করবে। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নেবার কথা বলা থাকলেও বিনিয়োগকারী পাওয়া যাচ্ছে না। বছরের শুরুতেই নরওয়ে’র দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। বছরের মাঝামাঝি ফ্রান্সের তিনটি ব্যাংক ও জার্মানীর একটি ব্যাংক পরিবেশগত ঝুঁকির কারন দেখিয়ে প্রকল্প থেকে সরে গেছে।

ম্যানগ্রোভ বনের সকল বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় পরিবেশ অধিদপ্তর নির্দেশিত ‘লাল ক্যাটাগরি’র একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে উঠলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বেএটি কখনই বিবেচনায় নেয়া হয়নি। সূচনায় ভারতীয় বিদ্যুৎ সচিব আশ্বস্ত করেছিলেন, সরকারের জ্বালানী উপদেষ্টা স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা বলেছিলেন, তাতে দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশ বিপর্যয় কোন অবদান রাখবে না। ভারত তার নিজের প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরী করবে। ‘পরিবেশের ক্ষতি হবে না, এমনভাবে করা হবে যাতে পরিবেশ দুষণ না হয়’এসব অর্থহীন বা অর্বাচীন কথা দিয়ে তো আর বিপর্যয়ের আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। পরিবেশের ক্ষতি হবে এই বিবেচনায় ভারতে ২০১২ সালেই দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, ভারতে করলে ক্ষতি হয় এবং বাংলাদেশে করলে কোন ক্ষতি নেই।

স্ববিরোধিতা এমন পর্যায় পৌঁছেছে যে পরিবেশ অধিদপ্তরের জারিকৃত সব শর্তাবলী লংঘণ করে সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি করতে যাচ্ছে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করেই প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে দেয়া অবস্থানগত ছাড়পত্র। ভারতের জাতীয় পরিবেশ আদালত ২০১১ সালে স্বতঃপ্রণোদিত আদেশে বলেছে; ‘সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ নষ্ট হতে বসেছে। এই পরিস্থিতিতে ম্যানগ্রোভের বর্তমান চেহারা কেমন, নদী বা খাঁড়িতে দুষিত ডিজেল ব্যাবহার হয় কিনা, সেখানে বেআইনী ইটভাটা চলছে কিনা, বন এলাকায় অবৈধ হোটেল রেস্তোরা বন্ধ করা হয়েছে কিনা, ইত্যাদি বিষয়ে রাজ্যের অবস্থান জানানো হোক। একই সাথে আদালত সরকারের বক্তব্যের সমর্থনে অবশ্যই স্যাটেলাইট ছবি থাকতে হবে ’। অথচ বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে গত দুই বছরের মধ্যে কয়লা, সার, ক্লিংকার ও তেলের জাহাজ ডুবেছে। এই ঘটনা লাগাতার ঘটলেও দেশের আদালত বা সরকার কাউকেই দায়ী করেনি।

পরিবেশবিদ, জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা পরিস্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের আশংকার কথা। বলছেন সুন্দরবনের জন্য হুমকির কথা, ধ্বংসের কথা। সরকার মানছে না। এর পেছনের রাজনীতি বা গোষ্ঠিগত স্বার্থে আশ্রয় নেয়া হচ্ছে প্রতারনার। কাজ অব্যাহত রেখে প্রকল্প বিরোধীদের সুচিন্তিত মতামত চাওয়া হচ্ছে। গত ২ নভেম্বর পত্রিকায় দেয়া বিজ্ঞাপনে প্রকল্প সম্পর্কে সরকারের অবস্থান পরিস্কার করে দিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে এটিকে সুন্দরবন থেকে নিরাপদ দুরত্বে ও পরিবেশবান্ধব বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের মতে, প্রকল্প নিয়ে ব্যক্তি বা সংগঠন বিবৃতিমূলক তথ্য প্রচার ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, যা দেশের স্বার্থবিরোধী।

প্রকল্পের বিরোধী পক্ষের সকল মতামত ও আশংকা নাকচ করে দেবার পরপরই সরকারী প্রতিনিধি দলের সাথে বিশেষজ্ঞদের রামপাল সফরের আমন্ত্রন ছিল রহস্যজনক ও প্রতারনাপূর্ণ। এধরনের উদ্যোগ স্বাগত জানালেও প্রশ্ন উঠেছিল, এতদিন পরে সরকার কি হঠাৎ করে সমন্বয়ের দিকে এগোচ্ছে? সরকার কি বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনা করতে চায়? তাহলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিষোদগার করছে কেন? এর নেপথ্যের উদ্দেশ্যটি কি? সবচেয়ে জরুরী প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে প্রতিবাদ কি দেশের বিরুদ্ধে যায় কিনা?

এতসব প্রশ্ন নিয়ে রামপাল সফর করে এসে দলের অন্যতম সদস্য বুয়েট অধ্যাপক ও জ্বালানী বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, যা দেখেছেন তাতে তিনি উদ্বিগ্ন। পুরো এলাকায় দ্রুতগতিতে চলছে শিল্পায়ন। পরিবেশ দুষণ তো বটেই তার মূল উদ্বেগ নগরায়ন নিয়ে। তার মতে, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নয়নের বাজার হয়ে ওঠা এলাকাটি সুন্দরবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। বন রক্ষায় সরকারের পরিকল্পনা কি সেটি অবশ্যই দেখাতে হবে বলে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন।

দলের অপর সদস্য জ্বালানী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেছেন, অবশ্যই সর্বাগ্রে সুন্দরবন রক্ষা ও ক্ষতি না হওয়ার বিষয়ে সরকারকে অক্যাট্য তথ্যপ্রমান হাজির করতে হবে। অন্যথায় প্রকল্প বন্ধ করে দিতে হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা না করলেও তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে বন ধ্বংসের বিষয়টি বিবেচনায় না নেয়ার দাবি করেছেন। পরিবেশ সমীক্ষায় এটিকে গ্রামীন বসতি বলে সুন্দরবনকে আমলে নেয়া হয়নি। অধ্যাপক আলম আরও বলেছেন, পরিবেশগত ক্ষতি নিরুপন না করে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সেটি পূরণ করা যাবে না।

এত আশংকা, বিশেষজ্ঞ মতামত উপেক্ষা করে কাকে তুষ্ট করতে ধুন্ধুমার উন্নয়নের কথা বলে সুন্দরবনকে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে? রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নগরায়ন, পাথরঘাটায় জাহাজ নির্মান শিল্প স্থাপন এবং বনাভ্যন্তরের নদীতে একের পর এক জাহাজডুবিতে ফার্নেস তেল, সার, ক্লিংকার ছড়িয়ে পড়াপ্রশ্ন উঠছে, সবটাই কি পরিকল্পিত? সরকারের অবস্থান ও আচরন, বক্তব্যবিবৃতি শুনে মনে হতে পারে বিশাল এই ম্যানগ্রোভের আর প্রয়োজন নেই। এই কথা তো মানতেই হবে, ভারতকে খুশি করার উন্নয়ন মাজেজায় রামপালে বিদ্যুকেন্দ্র তৈরী হচ্ছে, সেই ভারতই তার অংশে সংরক্ষিত বননদীর কাছে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করেনি। শুধু তাই নয়, বন সুরক্ষায় ভারত সরকার কি করছে তার প্রতিবেদনসহ স্যাটেলাইট ছবি তলব করেছে আদালত।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি বনসংলগ্ন জনগোষ্ঠির। সুন্দরবনকে কি নিবিড় পরিকল্পিত টার্গেটে পরিনত করেছে সরকার? তারা সন্দেহ করেন, বনকে কেন্দ্র করে বিশাল সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করে উন্নয়নের নামে ধ্বংসযজ্ঞ ঢেকে দিতে চায় সরকার? এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ফুলবাড়ি কয়লা খনি। এজন্যই বনের ভেতর দিয়ে নৌরুট চালু রেখে প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের সরকার চায় বিশেষ সুবিধে নিতে। নেপথ্যে রয়েছে এশিয়া এনার্জী প্রস্তাবিত ফুলবাড়ি কয়লাখনির উন্মুক্ত খনন। এখান থেকে আহরিত কয়লা দ্রুত পরিবহনের সুন্দরবনের নৌরুট অপরিহার্য। মংলা বন্দর, রেন্টাল পাওয়ার ষ্টেশন ও অন্যান্য শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহে এই রুট চালু রাখা হবে। জাতিসংঘ, ইউনেস্কোসহ জনদাবি এক্ষেত্রে উপেক্ষিত হতেই থাকবে।

সরকারের ভেতরকার সরকারনানা জাতের পরামর্শকরা, যারা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ কর্পোরেট স্বার্থের ধারকবাহক এবং বাজার অর্থনীতির সমর্থক। যে কোন মূল্যে উন্নয়ন এবং উন্নয়নএটি তাদের মূলনীতি। উন্নয়ন জোয়ারে মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশপ্রতিবেশ ধ্বংস তাদের বিবেচ্য নয়। বড় বড় ফ্লাইওভার, সেতু, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রেন্টাল পাওয়ার ষ্টেশনউন্নয়ন মানেই মেগা সাইজের বিলিয়ন ডলার প্রকল্প। এর ফলে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ ভুলেই যাবে পরিবেশ ধ্বংসের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির ব্যাপারটি। আর একেবারেই ভেতরের বিষয়টি সম্ভবত: এই যে, বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে গেলে ভারতের অংশ টিকে থাকবে। এজন্যই কি এটি কোন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, যার আভাস ইতিমধ্যেই ফুটে উঠতে শুরু করেছে? সবচেয়ে বড় আশংকাটি হচ্ছে, স্বপ্ন নাকি দুঃস্বপ্ন বাস্তবায়ন করছি আমরা!