Home » আন্তর্জাতিক » সৌদি সামরিক জোট :: তেল আর অন্তরালের নানা খেলা

সৌদি সামরিক জোট :: তেল আর অন্তরালের নানা খেলা

মিকাহ হ্যালপার্ন, অবজারভার নিউজ

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 1আইএসএর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সৌদি আরবের ৩৪টি দেশটি নিয়ে জোট গঠনের কাহিনীর পেছনে আরেকটি কাহিনী আছে। প্রথম উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যে ৩৩টি দেশ রিয়াদের সাথে যোগ দিয়েছে তারা সবাই মুসলিম, তবে সবাই আরব নয়। এরপর যাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, তাদের দিকে আমাদের অবশ্যই নজর দিতে হবে। লেবানন ও ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে সৌদি আরব আমন্ত্রণ জানিয়েছে, কিন্তু ইরান, হামাস ও ইরাককে বাদ দিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন এই গ্রুপটির উদ্দেশ্য ও ভিশনের একটি ক্লু এটা।

আইএসবিরোধী এই কোয়ালিশন চায় ইরানি প্রাধান্য প্রতিরোধ ও ধ্বংস করতে। এই লক্ষ্য সাধনে সৌদি আরবের আরো কয়েকটি শত্রু, কেবল সিরিয়ার আসাদই নয়, রাশিয়া, হিজবুল্লাহ ও ইরাককে আঘাত করাও কোয়ালিশনের মিশন। যুক্তরাষ্ট্রকে শাস্তি দেওয়াও সৌদি পরিকল্পনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, কারণ দেশটি সম্প্রতি পরমাণু চুক্তি করে ইরানকে বৈধতা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গ অনেকটাই ত্যাগ করেছে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রসৌদি সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেকটি ছিল ওয়াশিংটনের পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরে। ওই চুক্তির ফলে ইরানকে আবার বিশ্ব দরবারে ফিরিয়ে আনা হয়, এমনকি ১৫ বছরের মধ্যে তাদেরকে পরমাণু মর্যাদা দেওয়ারও ব্যবস্থা রাখা হয়। চুক্তিটি সুন্নি দেশ সৌদি আরবকে ভয়াবহভাবে অপমানিত করেছে, হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের ভয়ঙ্কর শত্রুকে ক্ষমতা ও সাহস দুটিই দিয়েছে। এই অঞ্চলের ভারসাম্য ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। ইরানের অগ্রযাত্রা থামানোর আশা করছে সৌদি আরব।

ইতোমধ্যেই সৌদি আরব কী করেছে? তারা মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসিকে সমর্থন করছে। তারা ইরান থেকে সরে যাওয়ার জন্য সুদানি নেতাকে প্রলুব্ধ করেছে। ইরানের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের মাধ্যমে সুদানিরা ইরানি অস্ত্রের পরিবহন ও বাণিজ্য রুটটি শেষ করে দিয়েছে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি দিয়েই গাজায় হামাস এবং সিরিয়ায় আসাদের সমর্থক বাহিনীর কাছে অস্ত্র যেত।

সৌদি আরবের রাশিয়াকে আঘাত করতে করতে চায় এ কারণে, ইরানের মতো রুশরাও সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদকে টিকিয়ে রেখেছে। আসাদ হলেন আলাভি বংশোদ্ভূত, আর আলাভিরা হলো শিয়া ইসলামের দূরবর্তী একটি শাখা।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সাথে সামরিকভাবে মোকাবিলার চেয়ে ভালো পন্থা জানা আছে সৌদি আরবের। তারা স্থল ও আকাশে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের আওতার বাইরে থাকবে। এর বদলে সৌদিরা অর্থনৈতিকভাবে উভয় দেশকে আঘাত করবে।

নভেম্বরে অনুষ্ঠিত গত ওপেক সভায় সংস্থার বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী সৌদি আরব তেলের উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে অন্য সদস্যদের রাজি করাতে সক্ষম হয়। তেলের দাম অবাধে কমতে থাকলেও তারা এতে সম্মত হন। গত জুন থেকে তেলের দাম ৪০ ভাগেরও বেশি কমে দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৩৫ ডলার। ওপেক সদস্যরা উৎপাদন হ্রাস এবং দাম বাড়ানো আশা করেছিল। তারা সরবরাহ ও চাহিদার সাধারণ নীতি প্রয়োগ করার আশায় ছিল। সৌদি আরব এই আইডিয়াকে ভয় পায়। কারণ গতবার যখন তারা তেলবাজারকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল, তখন তাদের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, ওই অবস্থা কাটাতে তাদের ২০ বছর লেগেছিল।

তবে তেলের দাম কম রাখার মধ্যে সৌদি আরবের আরেকটি উদ্দেশ্য রয়েছে। এই সৌদি পদক্ষেপের ফলে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অথচ দেশটির তেলউৎপাদনকারী অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য এখন বিপুল মূলধন দরকার। ইরাকও তেল থেকে আরো বেশি রাজস্ব চাচ্ছে। ইরাক এখন শিয়াশাসিত দেশে পরিণত হয়েছে, অপ্রয়োজনীয়ভাবে সুন্নিদের আক্রমণ করছে। এ কারণে তাদের কষ্ট দিতে চাচ্ছে সৌদি আরব।

সৌদি আরবের পরবর্তী শত্রুর তালিকায় রয়েছে রাশিয়া, যে দেশটি বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী। রাশিয়ার আসলেই বিপুল টাকা দরকার। বিশেষ করে ক্রিমীয় ভূমি দখল এবং ইউক্রেনে তাদের কার্যক্রমের ফলে যে অবরোধ সৃষ্টি হয়েছে, সেটা মোকাবিলা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। সৌদি আরব চায়, রাশিয়া তাদের পায়ে আত্মসমর্পণ করুক।

সৌদি আরবকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে সমস্যায় ফেলেছে যে দেশটি সে হলো চীন। যদিও তারা কাজটি করেছে অনিচ্ছাকৃতভাবে। চীনে তেলের চাহিদা অনেক কমে গেছে। কারণ বেইজিং এখন জ্বালানিসাশ্রয়ী ব্যবস্থা এবং এমনকি বায়ু বিদ্যুৎসহ বিকল্প জ্বালানি উৎসে অনেক বিনিয়োগ করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনা অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়েছে, ফলে তাদের তেলের চাহিদাও কমে গেছে।

সৌদি পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রও অক্ষত থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব তেল রিজার্ভের দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু বেসরকারি শিল্প সেই লক্ষ্যের দিকে যেতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রেই তারা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্র থেকে তেল উৎপাদন কর্মসূচি ত্যাগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে তেল উৎপাদনের যে খরচ, তাতে বিপুল লোকসান হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এক ব্যারেল তেল ওঠাতে খরচ হয় ৫০ থেকে ৭০ ডলার। আর সৌদি আরবের তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৩০ ডলার।

বাজার থেকে প্রতিযোগীদের সরিয়ে দেওয়ার কাজটি সফলভাবেই শুরু করতে পেরেছে সৌদি আরব। তারা তেল ক্ষেত্রে প্রবেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে থামিয়ে দিয়েছে। তারা তাদের শত্রুদের পঙ্গু করে দিয়েছে। আর তারা তেলের দাম কমাটাও প্রতিরোধ করতে পারে। তারা জানে, এই দাম আবার বাড়তে থাকবে।

৩৪টি দেশের এই কোয়ালিশন খুব সম্ভবত কেবল আইএসর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যই নয়। এটা হলো বিশ্ব নেতা হিসেবে সৌদি আরবের অবস্থান সুসংহত করার বিষয়। সৌদি আরব এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ইরানকে দেখাচ্ছে, তারা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে।।