Home » বিশেষ নিবন্ধ » জলবায়ু রাজনীতি :: এখন যা ঘটছে (প্রথম পর্ব)

জলবায়ু রাজনীতি :: এখন যা ঘটছে (প্রথম পর্ব)

প্যারিস সম্মেলনে তেমন কোনো সাফল্য নেই

হায়দার আকবর খান রনো

Dis-3প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার কয়েকদিন পরই আবার জমজমাট হয়ে উঠেছিল জাতিসংঘ আয়োজিত আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনকে কেন্দ্র করে। ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধিরা দুই সপ্তাহ ধরে অনেক তর্কবিতর্ক, দরকষাকষি ও কসরতের পর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছিলেন। এ জন্য ৩০ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া সম্মেলনের সময় আর দুই দিন বাড়ানো হয়েছিল। অবশেষে প্যারিসের সময় অনুসারে ১২ ডিসেম্বর রাতে সর্বসম্মতিক্রমে একটা চুক্তিতে পৌছানো সম্ভব হয়েছিল। চুক্তির খসড়াটা নিয়ে প্রত্যেক দেশের প্রতিনিধি দল নিজ নিজ দেশে ফিরে যাবে। নিজ নিজ দেশের কর্তৃপক্ষের দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে। তারপর ২০১৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে জাতিসংঘ কর্তৃক আহূত এই রকম আরেকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে খসড়া চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হবে।

যে খসড়া চুক্তিটি সকল দেশই মেনে নিয়েছে তার মধ্যে আসলে তেমন বড় কোন সাফল্য নেই। তবে এর পাচ বছর আগে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত এই রকম এক সম্মেলন শেষ হয়েছিল কোন চুক্তি বা ঐক্যবদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই। তারও আগে জলবায়ু সংক্রান্ত কোন সম্মেলন কোন সর্বসম্মত চুক্তিতে পৌছাতে পারেনি। সেই দিক দিয়ে এই সম্মেলন সফল হয়েছে বলা যেতে পারে। কিন্তু সেটাকে বিশ্ব নেতাদের কূটনৈতিক সাফল্য বলাই ভালো। কার্যকর কোন কিছু এখনো বাস্তব হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ‘দুই সপ্তাহের আলোচনা ও ব্যাপক দরকষাকষির পর প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে যে চুক্তিটির ব্যাপারে মতৈক্য হলো, তা প্রায় সবারই পছন্দ এমন বাছা বাছা শব্দে ভরপুর। এতে সচেতনভাবেই এক ধরনের নমনীয়তা রাখা হয়েছে’। ফলে পরবর্তীতে যে যার খুশি মতো বেরিয়ে যাবার আশংকা থাকে।

আমরা আরও স্মরণ করতে পারি যে, ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিয়োতো প্রটোকল থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। অথচ ১৯৯৭ সালে কিয়োতো প্রটোকলে স্বাক্ষর দিয়েছিল। ২০০০ সালের নভেম্বরে হেগে যে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন হয়েছিল, সেটা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতৈক্য না হওয়ায় স্থায়ীভাবে সম্মেলন স্থগিত রাখতে হয়েছিল। অন্যান্য সম্মেলনেও দেখা যায় যে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সাথে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর তীব্র মতপার্থক্য থাকে। সেই মতপার্থক্যকে আমরা সাম্রাজ্যবাদের সাথে উন্নয়নশীল দেশসমূহের দ্বন্দ্বরূপে দেখতে পাই। হ্যা, জলবায়ুর মতো আপাতদৃষ্টিতে অরাজনৈতিক বিষয়েও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের দিক আছে। তেমনি কখনো কখনো আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বও প্রতিভাত হয়। হেগের সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার ঘটনাকে আমরা আন্তঃসাম্রাজাবাদী দ্বন্দ্বের পরিণতি বলে ব্যাখ্যা করতে পারি।

জলবায়ুর মতো বিষয়, যার দ্বারা পৃথিবীর সকল মানুষ প্রায় সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে দ্বীপ অঞ্চলের মানুষ বেশি দুর্যোগের মধ্যে পড়বে। এবং এ নিয়ে এমন কি রাজনীতি যা নিয়ে সকল দেশের রাষ্ট্রনায়করা একমত হতে পারছেন না? সেটাই এই নিবন্ধের পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের নানা দিক আছে। বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে যে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে তাহলো, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি। তাত্ত্বিকভাবে সকলেই একমত যে, এটা কমাতে হবে। অন্যথায় গোটা পৃথিবী মানুষের বসবাসের জন্য অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। তাহলে সকলেরই সমভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা। সে জন্য করণীয় কি? সেই সকল গ্যাস যথা কার্বন ডাই অক্সসাইড নিঃসরণ যাতে কম হয় সে জন্য উদ্যোগ নেয়া। জীবাশ্ম অর্থাৎ প্রাকৃতিক তেল, গ্যাস, কয়লা ইত্যাদির ব্যবহার যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস করতে হবে। কিন্তু কে কতোটা করবে, সেটাই বিতর্কের বিষয়। সেই বিতর্কের ফয়সালা কিন্তু এবারের প্যারিস সম্মেলনেও হয়নি। পাশ্চাত্যের ধনী দেশগুলোর কর্পোরেট পুজি গাড়ীর ব্যবসা, তেলের ব্যবসা হ্রাস পাক তা চায় না। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ভবিষ্যত প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু সে তো ভবিষ্যতের কথা। সে জন্য আজকের সর্বোচ্চ মুনাফা তারা কোনো ভাবেই পরিত্যাগ করতে রাজি নয়। আর পাশ্চাত্যের ধনী তথা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্র সেই সব দেশের একচেটিয়া পুজির (যাকে বলা হয় কর্পোরেট পুজি) স্বার্থ রক্ষা করে। তাই কর্পোরেট পুজির ব্যবসায়িক স্বার্থ ও সীমাহীন মুনাফার লালসা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে জলবায়ু সংক্রান্ত তাদের নীতি। জলবায়ু রাজনীতির এটাই হলো আসল কথা।

বিজ্ঞানিরা বলছেন, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির হারকে যেভাবেই হোক কমাতে হবে। তৃতীয় বিশ্বও সেই কথা বলছে। কিন্তু রাজী নয় উন্নত বিশ্ব। এবারের প্যারিস সম্মেলনেও বিতর্কের বিষয় ছিল কবে থেকে কতোটা কমাতে হবে। বেশির ভাগ দেশ বলেছে, অতি দ্রুতই দেড় শতাংশ হারে নামাতে হবে। কিন্তু ধনী দেশের একগুয়েমির কারণেই শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়েছে এই শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে অর্থাৎ ২০৫০ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার দুই শতাংশের নিচে রাখা হবে। এটাকেই বিরাট সাফল্য বলে প্রচার করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত : তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারকে কমিয়ে রাখতে হলে জীবাশ্ম থেকে উৎপন্ন শক্তির বদলে সৌরশক্তি বা অন্য কোন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। নতুন করে প্রযুক্তিগত কাঠামো তৈরির জন্য বিরাট অংকের অর্থ লাগবে। তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সেই অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে না। ধনী দেশকেই সেই টাকা দিতে হবে। কারণ বায়ু দুষণ এবং বাতাসে কার্বন নিঃসরণ ঘটিয়েছে কারা? প্রধানত উন্নত দেশসমূহ।

যে সকল গ্যাস তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে তাকে বলা হয় গ্রীন হাউস গ্যাস। এই পর্যন্ত বায়ুমন্ডলে যতো গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ করা হয়েছে তার চারভাগের এক ভাগই করেছে একটি মাত্র দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর মার্কিন দেশসহ ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশকে যুক্ত করা হয় তাহলে দেখা যাবে, তারা বাতাসে নিঃসরণ করা মোট কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের চার ভাগের তিন ভাগের জন্য দায়ী। বিশ্ব জনসংখ্যার সবচেয়ে গরিব এক পঞ্চমাংশ বাতাসে সেই গ্যাস ছড়িয়ে দিয়েছে খুবই সামান্য পরিমাণ অর্থাৎ মাত্র দুই শতাংশ।

তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবকে মোকাবেলা করার জন্য যে ব্যাপক অর্থের প্রয়োজন, সেই অর্থের যোগান দেয়ার দায়িত্বও পড়ে ধনী দেশসমূহের উপর। কিন্তু এটা হলো যুক্তির কথা। ধনী দেশগুলো যুক্তির কথা শোনে না। এবারের প্যারিস সম্মেলনে ধনী দেশগুলো স্বীকার করেছে যে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের জন্য কারিগরি সাহায্যের জন্য অনুন্নত দেশকে অনুদান দেবে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে একশত বিলিয়ন ডলার অনুদান দেয়ার প্রতিশ্রুতি আছে।

এইটুকই প্যারিস সম্মেলনের সাফল্য। কিন্তু এই সাফল্যে সন্তুষ্ট হতে পারেননি উক্ত সম্মেলনে যোগদানকারী বাংলাদেশের টিমের সমন্বয়কারী অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলিকুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ‘চুক্তিতে অনেক বিষয় অস্পষ্ট আছে, তবু চুক্তি হয়েছে, সেটাই অনেক ভালো। আগে এমন চুক্তিও হতে পারেনি’। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য খুব একটা নতুন কোনো ইতিবাচক বলে অভিহিত করা যাবে না। বিশেষ করে অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি, অভিযোজন ইস্যুগুলো খুব সহজ থাকেনি। বরং বড় দেশগুলো অনেকটাই নিজেদের জায়গা পাকাপোক্ত করে নিয়েছে’।

আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগের পরিচালক ডায়না লিভারম্যান বলেছেন, ‘তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এ সম্মেলনকে বাহবা দেয়ার উপায় নেই। বরং এটি একটি ভুল দিকনির্দেশনা পাবে। কেননা এই সম্মেলনের চুক্তিতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সাল নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে গোটা বিশ্বে প্রতিদিন যেভাবে আরো কার্বন নির্গমন হয়ে পৃথিবীকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে তার তো কোনো সুরাহা হবে না’।

এই ভয়াবহ পরিণতির কথা যে সাম্রাজ্যবাদী দেশের রাষ্ট্রনায়করা জানেন না, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। তবু আপাত মুনাফাই তাদের কাছে অনেক বড়। পুজিপতির কাছে মুনাফাই একমাত্র আরাধ্য দেবতা। মানব জাতির ভবিষ্যত নিয়ে তারা ভাবিত নয়। পরিবেশ বিপর্যয়ও তারাই ঘটিয়েছে এই মুনাফার লালসার কারণে। জলবায়ু বিপর্যয়ের বিষয়টি তাই গোড়া থেকে আরও একটু গভীরে গিয়ে আলোচনা আবশ্যক।।

(চলবে…)