Home » বিশেষ নিবন্ধ » প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৮৫৭ :: পুনঃঅনুসন্ধান (শেষ পর্ব)

প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৮৫৭ :: পুনঃঅনুসন্ধান (শেষ পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো

Last-6সিপাহী বিদ্রোহ দমন করার পর বৃটিশ রাজ তাদের কৌশলে কিছু পরিবর্তন আনে। তারা দেখেছিল যে, এই বিদ্রোহে অনেক ভারতীয় রাজা, সামন্ত অংশগ্রহণ করেছিল। বৃটিশ শাসকরা তাদের পলিসিতে যে ভুল ছিল তা বুঝতে পারে। ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর বৃটেনের রাণী ভিক্টোরিয়া ভারতের শাসনভার কোম্পানীর কাছ থেকে তুলে নেবার পর যে ঘোষণা দেন, সেখানে ভারতীয় সামন্তদের সন্তুষ্ট করার জন্য অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। বলা হয়, যে সকল রাজা জমিদার ইত্যাদি সামন্তপ্রভূ বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করা হবে (অবশ্য যারা সরাসরি বৃটিশ নাগরিকদের হত্যা করেছে তাদের ক্ষমা করা হবে না)। তিনি বলেন যে, কেবল পদচ্যুত রাজারাই নয়, ‘জায়গীরদার’ ও ‘ইমানদারদেরকেও’ ভুল পদক্ষেপের কারণে ক্ষুব্ধ করে তোলা হয়েছিল। বৃটিশ শাসকরা উপনিবেশিক শাসনের ভুল সংশোধনের চেষ্টা করেন। ইংরেজ শাসকরা পরবর্তীতে সাবধানী হয়েছিল এবং দেশীয় রাজন্যবর্গ ও সামন্তদের পক্ষে রাখার জন্য সচেষ্ট ছিল।

তাই বলে সাধারণ জনগণকে অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করার জন্য ইংরেজ শাসকরা ক্ষমা করেনি। বরং অভ্যুত্থানে কে কতোটা অংশগ্রহণ করেছে সেই সব বাছবিচার খুব একটা না করে ইংরেজ শাসকরা যে ধরনের বর্বর লোমহর্ষক নিপীড়ন চালিয়েছিল, তাতে আর যাই হোক ঐ ইংরেজদের সভ্য বলা যায় না। কোন কোন জায়গায় রাস্তার দুধারে গাছে গাছে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে সিপাহী ও সাধারণ নাগরিকদের। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের গাছের ডালে ডালে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিল দেশপ্রেমিক সিপাহী ও নাগরিকদের।

সেই সময় ইউরোপে খুব কম লোকই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু ঘৃণা মিশ্রিত ভাষায় কঠোর নিন্দা করেছিলেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। এছাড়াও আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যায় যারা সিপাহী অভ্যুত্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। বৃটিশ চার্টিস্ট আন্দোলনের নেতা আর্নেস্ট জোনস সিপাহী অভ্যুত্থানকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। বৃটিশ বর্বরতার নিন্দা জানিয়েছিলেন রাশিয়ার চার্নিয়েশেভিস্কি, জার্মানীর পত্রিকা iiustriarte Zeitung প্রমুখ। বৃটিশ শাসকরা আজও তাদের কৃতকর্মের জন্য ভারতবাসীর কাছে ক্ষমা চায়নি। অর্থাৎ সেই সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব এখনো রয়ে গেছে এবং এ জন্য পৃথিবীর গণতান্ত্রিক মানুষের কাছে এবং ইতিহাসের কাছে অপরাধী বলেই গণ্য হয়েছে।

চার

আমরা যারা মার্কসের ভারত ভাবনার সঙ্গে পরিচিত তারা জানি যে, ভারতে বৃটিশ শাসন প্রসঙ্গে মার্কস দুটি দিক দেখেছিলেন। একদিকে বৃটিশ শাসকদের নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড, ধ্বংসলীলা, অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নিপীড়ন। সে জন্য মার্কস ছিলেন বৃটিশ শাসনের কঠোর সমালোচক এবং ভারতের স্বাধীনতার ঘোর সমর্থক। ভারত প্রসঙ্গেই তিনি বলেছেন, ‘স্বদেশে যা ভদ্ররূপ নেয় এবং উপনিবেশে গেলেই যা নগ্ন হয়ে আত্মপ্রকাশ করে সেই বুর্জোয়া সভ্যতার প্রগাড় কপটতা এবং অঙ্গাঙ্গী বর্বরতা আমাদের সামনে অনাবৃত’। সেদিনের ভারতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু মার্কস আবার বৃটিশ শাসনের অন্য একট দিকও দেখেছেন। বৃটিশ শাসন অবচেতনভাবে ভারতে এক বিপ্লবের কাজও করে ফেলেছে। গ্রামগোষ্ঠী সমাজ ও তার উপর প্রতিষ্ঠিত এশীয় ধরনের স্বৈরাচার ছিল ভারতের বৈশিষ্ট। এই সমাজ ছিল নিশ্চল। পুজিবাদের স্বার্থে বৃটিশ শাসকরা একে ভেঙ্গে দেয়। মার্কসের ভাষায়, ‘ইংল্যান্ড হিন্দুস্তানে সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে গিয়ে প্ররোচিত হয়েছিল শুধু হীনতম স্বার্থবুদ্ধি থেকে এবং সেই স্বার্থ সাধনে তার আচরণ ছিল নির্বোধের মতো। কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো এশিয়ার সামাজিক অবস্থায় মৌলিক একটা বিপ্লব ছাড়া মনুষ্যজাতি কি তার ভবিষ্যত তৈরী করতে পারে? যদি না পারে, তাহলে ইংল্যান্ডের যতো অপরাধই থাক, সে বিপ্লব সংঘটনে ইংল্যান্ড ছিল ইতিহাসের অচেতন অস্ত্র’।

মার্কস খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন, সিপাহী বিদ্রোহের মধ্যে রয়েছে পুরনো ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার একটা প্রচেষ্টা। বৃটিশ শাসনের মধ্যদিয়ে ভারতে পুনর্জাগরণের সেই সম্ভাবনা মার্কস দেখেছিলেন, যার দ্বারা ভারত বৃটিশকেও তাড়াতে পারবে এবং প্রগতির পথে এগিয়ে যাবে। সেই সম্ভাবনা কি সেদিনের সিপাহী বিদ্রোহের মধ্যে ছিল? না, তেমনটি ছিল না সিপাহী অভ্যুত্থানে। তবু জনগণের বিদ্রোহের প্রতি মার্কসের যে সহজাত সহানুভূতি তার থেকেই তিনি মনে প্রাণে কামনা করছিলেন যাতে বিদ্রোহ বিজয়ী হয় এবং ইংরেজ শাসনের পরাজয় ঘটে। যখন বৃটেনের কাগজে লেখা হচ্ছে, ইংরেজরা দিল্লি পুনর্দখল করেছে, বিদ্রোহীদের পরাজয় ঘটেছে, মার্কস তখন সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ব্যাঙ্গাত্মক ভাষায়। বৃটেনের কাগজে যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা সংঘটিত অত্যাচার ও হত্যার খবর প্রকাশ হচ্ছে, তখন মার্কস বলেছেন, এটা বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। আবার বিদ্রোহ দমনের পর ইংরেজদের বর্বরতাকে মার্কস কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন।

মার্কস যে কল্পনা বিলাসী নন এবং প্রত্যেকটি বাস্তব গণসংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছেন তার আরেকবার প্রমাণ মিললো ১৮৫৭এর সিপাহী বিদ্রোহ প্রসঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বৃটিশের মাধ্যমে ভারতে পুজিবাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, ভারত যুক্ত হয়েছে বিশ্ব বাজারের সঙ্গে আর একই সঙ্গে বিশ্বের জ্ঞান বিজ্ঞানের সঙ্গেও। এতে নতুন বিপ্লবী ভারতের জন্ম হবে। এমনটাই ভেবেছিলেন মার্কস। কিন্তু সে জন্য অপেক্ষা না করেই যে স্বাধীনতার যুদ্ধে শুরু হয়েছিল বিপ্লবী মার্কস তার পক্ষে দাড়িয়েছিলেন।

মার্কস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের মধ্যেও এখনো প্রবণতা, আছে সিপাহী বিদ্রোহকে স্বাধীনতার যুদ্ধ না বলে এটাকে নেহায়েত সামান্তপ্রভূদের বিদ্রোহ বলে কিছুটা খাটো করে দেখার। না, আমরা সেভাবে দেখতে পারি না। সিপাহী বিদ্রোহের দেড়শত বছরের বেশী অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও আমরা যেন গর্ববোধ করতে পারি, আমাদের ইতিহাসের মহান সংগ্রামের অধ্যায়টিকে স্মরণ করে।।

(শেষ)