Home » প্রচ্ছদ কথা » ২০১৫ :: রাষ্ট্র এখন শক্তিমানের মিত্র

২০১৫ :: রাষ্ট্র এখন শক্তিমানের মিত্র

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Coverদুই হাজার পনের খ্রিষ্টাব্দ। বছরটি ছিল দেবদূত শিশুদের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ। কি দেশে অথবা বিদেশে। ২০১৪ এর শেষে ঢাকায় পানির পাইপে পড়ে যাওয়া শিশু জিয়াদের মৃতদেহ আর ভূমধ্যসাগরের কূলে শিশু আয়লান কূর্দীর নিথর দেহ মিলে মিশে একাকার। তফাৎ এই যে আয়লান মরে যাওয়ার পরে ক্ষণিকের জন্য হলেও জেগে উঠেছিল বিশ্ববিবেক, আর বাংলাদেশে বেড়েছে হতাশাবেদনা। জনপ্রতিরোধ হয়ে গেছে স্তিমিত। আর এই ডিসেম্বরের গোড়াতে আরেক শিশু নীরব ম্যানহোলে পড়ে জঞ্জালের মত ভেসে গেছে বুড়িগঙ্গায়। মরে গিয়ে সম্ভবত: বেঁচেছে সে।

শিশু হত্যা নির্যাতন বেড়েছে ॥ ওরাই সবচেয়ে অনিরাপদ

বছর জুড়ে ঘুরে ফিরে একটি প্রশ্ন আসছে একেকটি ঘটনা কেন পুরনো সব বর্বরতাকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে? যখনই রাষ্ট্রিকরাজনৈতিকসামাজিক নানা ঘটনায় জনগণসমাজমিডিয়া প্রতিবাদী ও মুখর হয়ে উঠতে শুরু করে তখনই দৃষ্টি ফেরাতে বা বিভ্রান্ত করতে নতুনতর অঘটনের জন্ম দেয় কারা? পেছনের কারন কি? নাকি সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনায় জনভাবনা আলোড়িত করতেই এসব আয়োজন? উত্তর সকলের জানা না থাকলেও কুশীলবরা জানেন, আরো যারা জানেন তারা সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার নৈতিক সাহস হারিয়ে ফেলে সামিল হয়েছেন জয়গানে।

হত্যাকান্ডগুলির পৈশাচিকতাবর্বরতা ভড়কেচমকে দেয়। মলদ্বারে কম্প্রেসর ঢুকিয়ে, খুঁটির সাথে বেধে পিটিয়ে, জবাই করে ছাদ থেকে ছুঁড়ে, সদ্যজাত শিশু থেকে ১৪ বছরের শিশুদের হত্যা, এমনকি মাতৃজঠরে গুলিবিদ্ধ শিশু, রাষ্ট্রসমাজের বীভৎস চেহারা উন্মোচন করে দেয়। এর মূলে রয়েছে, উচ্চ পর্যায় থেকে নিচ পর্যায় পর্যন্ত অপরাধের দায়মুক্তি ও বিচারহীনতা। ভোটারবিহীন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষবিহীন নির্বাচনী সংস্কৃতি এবং গণতন্ত্রের নামে কর্তৃত্ববাদী শাসন।

চার বছর আগে এক কিশোরকে ডাকাত সাজিয়ে উন্মত্ত জনতার হাতে ছেড়ে দিয়ে পুলিশ মজা দেখেছে। পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় ওই কিশোরকে। এরও উৎপত্তি সেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে। নববর্ষের উৎসবে যৌন সন্ত্রাসকে পুলিশ প্রধান জাষ্টিফাই করেন ‘কতিপয় তরুণের দুষ্টুমি’ হিসেবে, তখন পথেঘাটে, বাসেলঞ্চে যৌন সন্ত্রাসীদের ‘দুষ্টুমি’ বাড়তেই থাকে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত দেড় দশকে ২১ হাজারজন যৌন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৭ হাজারই শিশু। এই পরিসংখ্যানের বাইরে সংখ্যাটি কত অযুত তা জানা যাবে না কখনও। কারন এই সমাজ অনেককাল ধরেই ধর্ষকামীতা, যৌন বিকৃতিসহ নানা উপসর্গে আক্রান্ত।

বাংলাদেশ ২০১৪ শেষ করেছিল শিশু জিয়াদের লাশ নিয়ে, ২০১৫ শেষ করছে ৮ ডিসেম্বর ম্যানহোলে পড়ে যাওয়া আরেক শিশু নীরবের চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে যাওয়া অসম্ভব ভারী বোঝা নিয়ে। মাঝখানে পড়ে থাকছে বছর জুড়ে নিষ্ঠুর খুনের শিকার ২১১টি শিশুর লাশ। যাদের অধিকাংশই কর্মজীবি ও শিশুশ্রমিক। এর সাথে শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য যোগ করলে দাঁড়ায়, গত চার বছরে দেশে নিহত শিশুর সংখ্যা ৯৮৮ জন। ২টি শিশু হত্যার বিচারে আসামীদের মৃত্যুদন্ড হয়েছে, বাকিগুলো এখনও বিচারহীন।

চার বছরে প্রায় সহস্র শিশু এবং দিনে গড়ে প্রায় একটি শিশু নিহত হওয়ার ঘটনা একটি মেসেজই দেয়, রাষ্ট্রটি আর সাধারন নাগরিকদের মিত্র নয়। রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠলে, গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলতে থাকে, কতিপয়তন্ত্র গড়ে ওঠে এবং নাগরিকের সাথে সম্পর্ক দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। এজন্যই অস্থির রাষ্ট্রসমাজ এখন দাঁড়িয়েছে শিশু নারীঅসহায় মানুষের বিপক্ষে। প্রমান, একজন সংসদ সদস্য একটি শিশুকে গুলি করে গ্রেফতার হয়ে অল্পকালে জামিনে বেরিয়ে আসেন। গুলিবিদ্ধ শিশুর পরিবার হয়ে পড়ে নিরাপত্তারহীন।

জাতিসংঘ উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তনীয়। পদ্মা সেতু নিয়ে সীমাহীন উচ্ছাস, বিশ্বব্যাংক ভাইস প্রেসিডেন্টের মন্তব্যঃ অর্থনীতি উড়ন্ত সূচনার পর্যায়ে সবই ইতিবাচক অগ্রগতির জাম্পিং নির্দেশক হিসেবে গবেষণাআলোচনা, বক্তব্যবিবৃতির জন্য খুবই মুখরোচক। কিন্তু এই উড়ন্ত উন্নয়ন কতটা টেকসই, কতটা স্থায়িত্বশীল, কতটা সুষম এবং সহসাই মুখ থুবড়ে পড়বে না, সে প্রশ্নগুলি ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাকবে। আপাতত:কথিত উন্নয়ন জোয়ার দিয়ে সবকিছু যে ঢেকে দেয়া যাচ্ছে না প্রমান হচ্ছে, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতা।

রাষ্ট্রসমাজে যা ঘটছে তা কি পরম্পরাহীন? একদিকে কসমেটিক উন্নয়নের জোয়ার, আরেকদিকে পৈশাচিকতা এগুলি পরম্পরাহীন নয়, বরং কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের অনুষঙ্গ। এজন্যই এত বৈপরীত্য! দু’একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে অপরাধের দায়মুক্তি আর বিচারহীনতা কর্তৃত্ববাদীতার বড় বৈশিষ্ট্য। এ ব্যবস্থায় ক্ষমতাবান মাত্রই বিচারহীনভাবে লুটবে, প্রতিপক্ষ নিশ্চিহ্নকরণে, রাষ্ট্র তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেবে। অপরাধের জন্য লজ্জা পাবে না এবং বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না!

শক্তিমানরা দায়মুক্ত হয়ে নীতিকথা শোনাবে, উপদেশ দেবে, গণতন্ত্রসুশাসনের সবক দেবে, এতে কারো কোন লজ্জা নেই। হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, ডেসটিনির আর্থিক কেলেঙ্কারীর নায়করা নিরাপদ থাকবে, শেয়ারবাজার লুন্ঠনকারীরা বুক ফুলিয়ে বিচরন করবেতারপরেও বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর দাবি করবেন তিনি গরীবের অর্থনীতিবিদ। মিডিয়ায় সাক্ষাতকারে জানাবেন, ব্যাংক জালিয়াতির দরজা এখন বন্ধ। অন্তিমে জনগণ জানবে, দেশ থেকে চলতি বছর আরো ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে।

এই অদ্ভুত বৈপরীত্যের মাঝামাঝি জাতিসংঘ উন্নয়ন সূচক, উন্নয়নের উড়ন্ত সূচনায় জিয়াদ, নীরব, সৌরভসহ নাম না জানা ৯৮৮ শিশুর পিতামাতাস্বজনসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অবস্থান কোথায়? ক্রমাগত দায়মুক্তি উল্লম্ফন, আইনের শাসনহীনতা এবং অপরাধ করে পদপদবীসহ বুক ফুলিয়ে বিচরনের প্রবণতায় রাষ্ট্রসমাজ ক্রমশ হয়ে পড়ছে নৈতিকতাহীন । এজন্যই উন্নয়ন মাজেযায় ঢেকে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে সকল অপকর্ম অবিকল সামরিক স্বৈরাচারের মত।

বছরের শুরুটিই ছিল ধ্বংসাত্মক। ক্ষমতায় যাওয়া বা থাকার বাসনায় প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে প্রথমে সরকার দেশকে অবরুদ্ধ করেছে। এরপর বিএনপিজামায়াত মাসের পর মাস হরতালঅবরোধের নামে পেট্রোল বোমায় ছারখার করেছে দেশ। বন্দুকযুদ্ধক্রসফায়ারে মরেছে মানুষ। গুম হচ্ছে, অপহৃত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে, কাউকে পাওয়া যাচ্ছে ভিনদেশে, এসব নিয়ে চলছে অমানবিক ঠাট্টামশকরা। ঘটনা ঘটছে, নাকি ঘটানো হচ্ছে তা নিয়ে রয়েছে রহস্য, কৌতুহল।

শিশু হত্যা, লেখকব্লগার হত্যাসহ যাবতীয় হিংস্রতার অবসান চাচ্ছে মানুষ, তারপরেও ঘটনা ঘটে চলেছে। বই মেলায়, বাড়িতে, সামনের গলিতেজনাকীর্ণ রাস্তায় খুন হয়ে যাচ্ছেন লেখকরা। পাচারকারীদের শিকার হয়ে ভাগ্যান্বষণে বিদেশ যাত্রা করা মানুষ ভাসছে অথৈ সাগরে। যেন তারা দেশহীন। বিদেশের জঙ্গলে আবিস্কৃত হচ্ছে গণকবর। যে পাচারকারীদের কবলে পড়ে মানুষের এই দশা, তাদের শাস্তির বদলে শাসকদের ভাষায় অসহায় মানুষগুলি হয়ে ওঠে মানসিকভাবে অসুস্থ। এত ঘটনা এবং ঘটনা পরম্পরা, মানুষ ভুলে যাচ্ছে অচিরেই, সময় হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় নিরাময়কারী।

অপরাধঅন্যায়ে ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় শক্তির জোরে যথেচ্ছাচার, অন্যের মতকে দলন এবং পাশবিকতা এখন কোন হীনতা বা লজ্জার বিষয় নয়। এটি হয়ে উঠছে বলদর্পী ও শক্তিমানের পরিচয়। এই ভাবনাগত পরম্পরা নতুন নয়। এক সময় হত্যা করে সদম্ভে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তেমনি খুনীদের দেয়া হয়েছে ইনডেমনিটি। এখনও বিনা বিচাবে, হরতালঅবরোধের নামে মানুষ খুন করছে এবং জায়েজ করার জন্য খেলছে ব্লেইম গেম। এটি কালচারে পরিনত হচ্ছে এবং গড়াচ্ছে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত।

গণতান্ত্রিক বিকাশের বদলে কর্তৃত্ববাদী শাসনকে উন্নয়নের মোড়ক পরিয়ে দেয়া হয়েছে। জনভাবনা, জনমত, ক্ষোভ প্রকাশকে সংকুচিত করে উন্নয়নকে প্রধান্য দেয়ার নিরীক্ষার কালপর্বে আরো অস্থিরতা বাড়ছে। উদাহরন রয়েছে, দেশে দেশে এই নিরীক্ষা সাময়িক সুফল বয়ে আনলেও বিপদজনকভাবে চরমপন্থাকে উৎসাহিত করেছে। ফলে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠার বদলে প্রাতিষ্ঠানিকতায় আঘাত করেছে। কর্তৃত্ববাদীতার মডেলে একক হয়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের ওপর যাবতীয় নির্ভরতা অদৃশ্য ও ছায়া দুষ্টচক্র গড়ে তুলছে। এই চক্রের উৎপীড়নে দুর্বিসহ মানুষ ক্রোধ, ক্ষুব্দতা, অসহায়ত্ব নিয়ে রাষ্ট্রসমাজের ওপর হতাশ হয়ে পড়ছে।

রাষ্ট্রসমাজের শক্তিই হচ্ছে ঐক্যবদ্ধতা ও ঐক্যমত্য। জন্মের পর থেকে বাংলাদেশে ঘটছে উল্টো ঘটনা। জনঅংশগ্রহন ও জনমতকে গুরুত্বহীন করায় রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা তৈরী করছে বিভাজন এবং মাত্রাহীন বৈষম্য। রাজনীতির বিবেচনায়, অর্থনীতির মানদন্ডে, শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এক রাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে উঠছে অনেক রাষ্ট্র। বিভাজন বাড়িয়ে তুলছে প্রতিহিংসা। এটির মোকাবেলা সম্ভব হোত, যদি উদার গণতান্ত্রিক শাসনের ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করা যেত। পৃথিবীর অনেক দেশ এই নজির স্থাপন করেছে।

দুর্ভাগ্য হচ্ছে, জন্মের সময় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির ভেতরকার বিভাজন কোন্দলসহ মৌলিক প্রশ্নগুলির মীমাংসা না হওয়ায় বাংলাদেশকে হাঁটতে হয়েছে রক্তাক্ত পথে। ফলে জনগোষ্ঠির মধ্যে ভিন্নমতাবলম্বীরা পরস্পরকে নির্মূল করার উল্লাসময়তায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে যখনই ক্ষমতাসীন হয়েছে। এজন্য কখনও কাঁচা গণতান্ত্রিক শাসন, একদলীয় শাসন, সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক স্বৈরশাসন কোন শাসনেই এই দেশ জনগণের হয়ে ওঠেনি।

বছরের পর বছর এই দেশ দেখছে হত্যা, নির্মূল, জ্বালাওপোড়াও, ক্রসফায়ারবন্দুকযুদ্ধ, গুমঅপহরন, কতল। ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার মূল হাতিয়ার হিসেবে নৃশংসতাই ব্যবহৃত হয়েছে। দেশে রাজনৈতিক মনন বা মনোজমিন এভাবেই তৈরী হওয়ার কারনে রক্তপাতময়তা হয়ে উঠেছে প্রাত্যহিক ঘটনা। এই অনিবার্যতায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও নারীরা। সেদিক থেকে ২০১৫ কেন, ২০১৬ খুব ব্যতিক্রম হবে এমন আভাস কোথাও দেখা যাচ্ছে কি?

রাষ্ট্রসমাজ ও রাজনীতি গণতান্ত্রিক বিকাশের বদলে কর্তৃত্ববাদী মডেলে উন্নয়ন প্রচেষ্টার যে নিরীক্ষা চালাচ্ছে, অস্থিরতার ক্ষয়িষ্ণু রোগ তাকে আরো কতটা রোগগ্রস্ত করবে? প্রশ্নটি এজন্য যে, উন্নয়নের বিপরীতে বিরাজমান নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক অস্থিরতা অর্জনের সব সূচকে বিপর্যয় নামিয়ে আনতে পারে। কারন শাসকশ্রেনী নিজেরা ভালভাবেই জানে যে, এই উন্নয়ন চেষ্টা যতটা না সাধারন মানুষের ভাগ্যের বদল ঘটাবে, তারচেয়ে পরিনত হবে কতিপয়ের উন্নয়নে।।