Home » অর্থনীতি » চীন: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩৫)

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩৫)

চীনের পথ নিয়ে সংশয়

আনু মুহাম্মদ

Last-3১৯৭০ সালের মধ্যে চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উচ্ছ্বাস অনেক কমে যায়। পার্টি ও সরকার তখন একদিকে উৎপাদন ও জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বন্ধু সংযোগে বেশি মনোযোগী। ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে চীন তাদের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে প্রেরণের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীকে নিজেদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতার জানান দেয়। সেসময় ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং নিউক্লিয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন বানায়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় ‘বিশেষজ্ঞ’ বিরোধী বৈরী মনোভাব এই সময়ে কমে আসে এবং সরকারি প্রকাশনাতে বিশেষায়ন, বিশেষ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি জ্ঞান, বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হতে থাকে।

উৎপাদন ক্ষেত্রে সুস্থিরভাবও ক্রমে ফিরে আসতে থাকে। চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইএর ভাষ্যমতে, এই বছরে চীনে বিশ্বের সর্বোচ্চ পরিমাণ সুতিবস্ত্র উৎপাদিত হয়, তেল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। স্টীল উৎপাদনেও ঘাটতি কমিয়ে আনে। রাসায়নিক সার উৎপাদন আবার বাড়তে থাকে, কৃষি উৎপাদনও বিপ্লব পরবর্তী সর্বোচ্চ উৎপাদন বছর ১৯৫৭ সালের উৎপাদন সীমা অতিক্রম করে। রেশনিং ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য খাদ্য সংগ্রহ এবং কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, এবং অন্যান্য দেশ থেকে গম আমদানি করে খাদ্য মজুত ৪ কোটি টনে উন্নীত করা হয়।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মাও সেতুং শুধু ‘চেয়ারম্যান মাও’ বলে অভিহিত হতেন না। তাঁর নাম ও চিত্রের ব্যাপক ব্যবহার, তাঁর অবিরাম গুণকীর্তন ছিলো পার্টি ও সরকারের সকল পর্যায়ে সব কথা ও কাজের অংশ। কে কতো বেশি বলতে পারে তা নিয়ে প্রতিযোগিতার অবস্থাও তৈরি হতো অনেকসময়। মাও সেতুং নিজে এর অতি ব্যবহারে অনেক বার বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। ১৯৭০ সালে পার্টি বিবরণীতে এবিষয়ে বলা হয়েছে, ১৮ ডিসেম্বর মাও এডগার স্নোর সাথে আলাপকালে বলেন, ‘ব্যক্তিত্বের প্রতিমূর্তি দাঁড় করানোর প্রয়োজন কিছুটা আছে। কিন্তু সমস্যা হলো এখন এর খুবই বাড়াবাড়ি হচ্ছে। খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতা যেমন চার মহান (মহান শিক্ষক, মহান নেতা, মহান কমান্ডার, মহান কান্ডারী) খুবই বিরক্তিকর।’ তিনি আরও বলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দুটো বিষয় তাঁর খুবই অপছন্দমিথ্যা কথা বলা এবং বন্দীদের সাথে দুর্ব্যবহার।

আগেই বলেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনের মতাদর্শগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সারাবিশ্বের কমিউনিস্ট পার্টি ও বিপ্লবী বিভিন্ন সংগঠন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবও এই সময়েই সংগঠিত হয়, যা বিভিন্ন দেশের বহু পার্টিকে বিশ্ববিপ্লবের প্রধান দিশারী হিসেবে চীনকে গ্রহণে উদ্দীপ্ত করেছিলো। এই সময়ের চীনের চর্চা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের বিপ্লবী দল ও গ্রুপও মাও সেতুং এর নামে উচ্ছ্বাস ও ভক্তি প্রকাশ করেই নিজেদের রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় এর সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত ভারতে ১৯৬৭ পরবর্তী নকশালবাড়ী অভ্যুত্থান ও সশস্ত্র সংগ্রাম।

ভারতে চীনপন্থী ধারার মধ্যেকার ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদীলেনিনবাদী)র নেতৃত্বে এই ‘নকশালবাড়ী আন্দোলন’ নামে পরিচিত সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হয়। চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, জঙ্গল সাওতাল এর প্রধান নেতা ছিলেন। এই আন্দোলনে মূল শ্লোগানই ছিলো ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’। তাঁরা দাবি করতেন চীনের জনযুদ্ধের পথেই তাঁরা ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করবেন। ‘শ্রেণীশত্রু খতম’ শ্রেণী সংগ্রামের একটি প্রধান উপায় হিসেবে গৃহীত হয়েছিলো। অসংখ্য তরুণ এই আন্দোলনে যুক্ত হন, হতাহত হন অনেকে। এই আন্দোলন স্বল্পস্থায়ী হলেও ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের চীনপন্থী ধারার উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ অনুসরণ করতে গিয়ে মহাবিপর্যয়ের সম্মুখিন হয়।

নকশালবাড়ী অভ্যুত্থানের পর এর প্রতি চীনা পার্টির স্পষ্ট সমর্থনই প্রকাশিত হয়েছিলো। চীনে তখন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জোয়ার। রেডিও পিকিং, পিকিং রিভিউ পত্রিকায় বলা হয়, ‘এই আন্দোলন ভারতের বুকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’। এর কিছুদিন পরই পার্টি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কানু সান্যাল ও সৌরেন বসুর নেতৃত্বে একটি দল চীন সফর করেন। তাঁরা মাও সেতুংসহ পার্টি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলতেও সক্ষম হন। কিন্তু যতটুকু জানা যায়, মাও সে তুং তাঁদের চীনকে অন্ধ অনুসরণ না করে দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী মার্কসবাদী লেনিনবাদী শিক্ষার প্রয়োগ করতে পরামর্শ দেন। পরবর্তীকালে এই ধারার প্রতি চীনের কোনো সমর্থন বা পৃষ্ঠপোষকতার খবর পাওয়া যায় না।

বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন দ্বিধাবিভক্ত হবার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন দেশে দেশে তাদের অনুসারী দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করতো, তাদের দেখাশোনা, তদারকি ও তাত্ত্বিক পথনির্দেশনা দিতো। প্রয়োজনীয় বস্তুগত সমর্থন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতাও দান করতো। তারফলে মস্কোপন্থী পার্টিগুলির রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণে জটিলতা ছিলো কম, বিভক্তিও হয়েছে কম। কিন্তু চীনের এই ভূমিকা কখনোই দেখা যায়নি। এরফলে চীনপন্থী দলগুলো কোথাও একক পার্টি হিসেবে কাজ করতে পারেনি। বিভিন্ন গ্রুপ চীন ও মাও সেতুং এর পথ নিয়ে নিজ নিজ ব্যাখ্যা দাঁড় করেছে। তার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বৈরী ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তৈরি করেছে। বারবার পার্টি ভাঙনের শিকার হয়েছে। ‘চীনা পথ’ নিয়ে বহুভাবে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি ও সংশয়।।

(চলবে…)

তথ্যসূত্র

১। Stanley Karnow: Mao and China, Inside China’s Revolution, Penguin, 1972

২। History of the Chinese Communist Party, A Chonology of Events (1919-1990), compiled by the Party History Research Centre of the Central Committee of the Chinese Communist Party Foreign Language Press. Beijing, 1991. P. 351