Home » আন্তর্জাতিক » সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী রায়

সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী রায়

ভারতে এখন যা ঘটছে, তা খুবই মারাত্মক কিছুর সূচনা

Last-2ভারতে নরেন্দ্র মোদির উগ্র হিন্দুবাদী সরকারের আমলে অসহিষ্ণুতা নজিরবিহীন গতিতে বাড়তে থাকার প্রতিবাদে দেশটির লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকারসহ সম্মানিত অনেকেই জাতীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার আন্দোলন চালাচ্ছেন। এই আন্দোলনে সামিল হয়েছেন প্রখ্যাত লেখক ও সক্রিয়বাদী অরুন্ধতী রায়ও। এই প্রতিবাদ জানানোর পর প্রথম সাক্ষাতকারটি দেন বিবিসি হিন্দি রেডিও’র সম্পাদক রাজেশ যোশীকে। এখানে এর অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ।

প্রশ্ন : জাতীয় পুরস্কার ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে আপনি এত দেরি করলেন কেন?

অরুন্ধতী রায় : যখনই আমার মনে হলো, মানুষজন এসব লেখককে আক্রমণ করছে, তিনি সাহিত্য একাডেমি অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান করেছেন, আর আপনারা তা গ্রহণ করেছেনবলে অনেক সময় লেখকদের আক্রমণ করার জন্য আমাকে ব্যবহার করতে থাকল, তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম। তারা আমাকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছিল। আমি অনুভব করলাম, এই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করার জন্য আমাকে কিছু করতেই হবে।

প্রশ্ন : যেসব কারণে এই আন্দোলন শুরু হয়েছে, এমন নয় যে এগুলো এই প্রথম ঘটেছে। আগেও হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, হামলা হয়েছে। ফলে এবার এমন কী ঘটল যার কারণে লেখক ও শিল্পীরা তাদের অ্যাওয়ার্ড ফিরিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ হলেন?

অরুন্ধতী রায় : পিটিয়ে মারা, খুন করাএগুলো এখনই ঘটছে এমন নয়। ঠিক কথা। তবে এখন আমরা যা দেখছি, তা হলো একটা মতাদর্শ। চাকাকে গতিশীল করতে এটাই ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বদলে দিচ্ছে, পাঠ্যসূচি বদলে দিচ্ছে, এটা মর্যাদাহানি করে অনেক কিছুকেই ফাঁপা করে তুলছে একটি ভীতিকর ভিশনকে স্থাপন করার জন্য। এছাড়া খুন, পিটিয়ে হত্যার সাফাই গাওয়া হচ্ছে, খুব ভংয়করভাবে সেগুলো সমর্থন করা হচ্ছে। এগুলো আমরা এই প্রথম দেখছি না, তা ঠিক। তবে আমরা একটি বিশেষ ধরনের ঐতিহাসিক বৃত্তের সম্পন্ন হওয়া দেখছি, যেখানে কোনো ধরনের বিরোধিতা ছাড়াই এসব মানুষ একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতায় রয়েছে। তারা নিজেদের মানুষকে প্রতিষ্ঠানগুলোতে বসিয়ে দিচ্ছে, তারা ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলো নতুন করে লিখছে। এটা বিশাল এক মেশিন, যেটাতে নতুন করে যন্ত্রপাতি লাগানো হচ্ছে, নতুন কাজ করানো হচ্ছে। আর এসব হত্যাকাণ্ড স্রেফ খুবই মারাত্মক কিছুর সূচনা।

প্রশ্ন : ‘এসব মানুষ কারা?’

অরুন্ধতী রায় : আমি বিজেপিআরএসএস উভয়কেই একসাথে বুঝিয়েছি। হিন্দুৎভার আদর্শপুষ্ট (কার্যত ১৯২৩ সাল থেকে) সংগঠন দুটি ভারতকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখে।

প্রশ্ন : ১৯২৫ সাল থেকে আরএসএসের অস্তিত্ব রয়েছে। আর নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন গত বছর। অথচ যা কিছু ঘটছে, সবকিছুর জন্য আপনি প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করছেন?

অরুন্ধতী রায় : প্রধানমন্ত্রীকে নয়, যে সিস্টেম চালু করা হয়েছে, আমি সেটার কথা বলছি। অটল বিহারি বাজপেয়ীও আরএসএসএর সদস্য ছিলেন। তবে এবার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এই শক্তির বিরোধিতা করা যাচ্ছে না। কেন্দ্রে নির্ভরযোগ্য কোনো রাজনৈতিক বিরোধিতা নেই। এমন এক প্রেক্ষাপটেই আমার মতে দারুণ একটা ঘটনা ঘটে গেছে। [লেখক, চলচ্চিত্রকারদের পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়াও] রাজনীতি, তবে অন্যভাবে। শিল্পী, লেখকেরা যে দারুণ আন্দোলনটি শুরু করেছেন, আমার মতে, ইতিহাসে এর কোনো নজির নেই।

প্রশ্ন : পক্ষপাতহীনভাবে বললে বলতে হয় প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লা থেকে ভাষণে ১০ বছরের জন্য সাম্প্রদায়িক ইস্যুটি তুলে রাখতে বলেছেন। তার পরও কি যা কিছু ঘটেছে, সেজন্য তাকে দায়ী করা যায়?

অরুন্ধতী রায় : আপনি যখন প্রধানমন্ত্রী হবেন, তখন অন্য অনেক শক্তি আপনার ওপর ভর করবে। আপনার কাছে থাকবে আন্তর্জাতিক অর্থ প্রতিষ্ঠান, বড় ব্যবসায়ী। তারা চায়, বিশেষ ইমপ্রেসন সৃষ্টি করতে, তারা জোর দেবে নির্দিষ্ট কিছু কথা বলতে। তারপর আছে নির্বাচনী এলাকা এবং যারা আপনাকে ক্ষমতায় এনেছে সেই ঝটিকা বাহিনী। তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। আমাদেরকে ধরে নিতে হবে, অনেক সময় অসংলগ্ন কিছু বলা হবে। এই যেমন এখন বলা হচ্ছে ড. অম্বেদকর ছিলেন আরএসএসেরই অন্যতম মহান নেতা। এমনটা কিভাবে হতে পারে? তিনি হিন্দুত্ববাদের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি হিন্দুত্ববাদকে চূড়ান্তভাবে নিন্দা জানাতে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তবে আপনি যেকোনো সময় যেকোনো কিছু বলতেই পারেন, ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কথা।

প্রশ্ন : অটল বিহারি বাজপেয়ি যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখনকার অবস্থার সাথে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করবেন কিভাবে? বাজপেয়ির ক্ষমতায় থাকার সময় খ্রিস্টান মিশনারি, চার্চে হামলা হয়েছে, গ্রাহাম স্টেইন্স ও তার দুই ছেলেকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।

অরুন্ধতী রায় : আর ২০০২ সালে গুজরাতে মুসলিম নির্মূল অভিযান চালানো হয়েছিল। সবার কাছে বিষয়টি পরিস্কার করার জন্য যে কথাটি অবশ্যই বলতে হবে তা হলো, এখানে অবশ্যই পদ্ধতিগত সমস্যা রয়েছে। গণতন্ত্রে যখন কেবল বিজয়ীই পুরস্কার পাবে ধরনের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হবে, তখন এর মধ্যে থাকা ব্যবস্থাটাই ভোট ব্যাংক তৈরির জন্য মানুষজনকে চরমপন্থী করে ফেলতে থাকবে। কংগ্রেস ওই বীজ বুনেছে, আর ফসল তুলছে বিজেপি। এই বীজ অনেক আগের, আরএসএস গঠন হওয়ারও আগের। তিলকের অবস্থান আর গান্ধীর অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য আছে। আমি গান্ধীর ভক্ত নই, সবাই বিষয়টা জানে। এখন যা হবে, তা ইতিহাসের একটা প্রক্রিয়া। এ কারণেই লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিক্ষাবিদেরা যা করছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সবাইকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে সঙ্কুচিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে টেলিভিশন স্টুডিও, মিডিয়ায় আমাদেরকে বিজেপি বনাম কংগ্রেসের সমীকরণে বাক্সবন্দি করা হচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনি কি বলছেন, কংগ্রেস ও বিজেপি একে অপরের পরিপূরক?

অরুন্ধতী রায় : আমরা মনে হয়, অনেক দিক থেকেই কংগ্রেস যা রাতে করে, বিজেপি সেটা করে দিনের বেলায়। একমাত্র যে পার্থক্যটা আছে সেটা হলো প্রকাশ্য আদর্শবাদ, খোলাখুলিভাবে বলা, যা সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণের অর্থ প্রকাশ করে দেয়। আর কংগ্রেস শঠতা ও ভামির আশ্রয় নিয়ে থাকে। চাপের মুখে ভামিটা ভালো কাজে দেয়।

প্রশ্ন : আপনি কি একমত, দাদরিতে এক মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যার সময় যে ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি, দলিতদের হত্যা করা হলে সেই নৃশংসতার বিরুদ্ধে তেমনটা হয় না? আপনিসহ লেখক ও শিল্পীরা দলিত হত্যার বিরুদ্ধে তেমনভাবে প্রতিবাদে নামেন না? দলিতদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার মাত্রাটা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার তুলনায় অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ?

অরুন্ধতী রায় : একেবারে ঠিক। আমি একমত। আমি এ নিয়ে অনেক লিখেছি। যখন কোনো উচ্চবর্ণের হিন্দু বা কোনো মুসলমান বা কোনো দলিত নিহত হয়, তখন প্রতিক্রিয়া হয় ভিন্ন ভিন্ন। দলিতদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা এখনো ঘটে, তবে তার প্রতিক্রিয়া তেমন জোরালো নয়।

প্রশ্ন : তাহলে কেন পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে কেন প্রতিবাদ করেন না?

অরুন্ধতী রায় : না না, … পুরস্কার ফিরিয়ে দিলে কিভাবে তা সহায়ক হবে? এসব বিষয় নিয়ে আমি যা বলেছি, সেগুলো সম্ভবত আপনি পড়েননি। আমার রচনায় আমি দেখিয়েছি, আম্বেদকর বলেছেন, ‘অচ্ছুতদের জন্য হিন্দুবাদ হলো আতঙ্কের একটি বাস্তব কুঠুরী। দলিতদের প্রতি যা কিছু ঘটছে, সেগুলো খুবই মারাত্মক। আমি গান্ধী সম্পর্কে লিখেছিআপনি তার নাম উল্লেখ করলে পুরো বাম ঘরানা হামলা করতে শুরু করবে। আমি মনে করি, আমাকে অভিযুক্ত করা যাবে সবার শেষে (দলিতদের প্রতি সাড়া না দেখানোর বিষয়ে)।।