Home » রাজনীতি » বছর শেষেও ভোট যখন আতংক

বছর শেষেও ভোট যখন আতংক

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Dis 1দেশ আবারও ভোটাতঙ্কে। আতঙ্ক আজ সকালের পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ভোট সংস্কৃতিতে আবার গেড়ে বসছে সহিংসতা, সশস্ত্র মহড়া, ব্যালট ছিনতাই, ভোট ডাকাতি, প্রশাসনিক পক্ষপাত সব মিলিয়ে আতঙ্কে ভোটাররা। ভোট দিতে পারব তো? জীবন নিয়ে টানাটানি পড়বে নাতো? ভোটের পরে জ্বালিয়েপুড়িয়ে মারবে নাতো? এই আতঙ্কের অন্যতম কারন হচ্ছে, নির্জীব নির্বাচন কমিশনের সকল স্তরে নির্লিপ্ততানিয়ন্ত্রণহীনতা। খোলসা করলে নির্বাচন কমিশনসরকারপ্রশাসনআইনশৃঙ্খলা বাহিনীক্ষমতাসীন দল মিলেমিশে একাকার। নির্বাচনী সংস্কৃতিতে ফিরে এসেছে নব্বই পূর্ববর্তীকাল, সেটি স্থানীয় সরকার বা সংসদ নির্বাচনই হোক।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন মনে করিয়ে দিয়েছিল ’৭৩, ’৭৯, ’৮৬, ’৮৮, ’৯৮ এর নির্বাচন এবং সেটি যুক্ত করেছিল জাতীয় নির্বাচনে আরেকটি কলঙ্ক তিলক। ওই সময়েই সুষ্ঠ, অংশগ্রহনমূলক ও উৎসবের নির্বাচন আবার নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কলঙ্ক তিলকটি স্থায়ী হতে চলে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ধারাবাহিকভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে ভূতপূর্ব সিইসি বিচারপতি মসউদ, বিচারপতি রউফ (মাগুরা উপনির্বাচন থেকে), সিইসি বিচারপতি আজিজ সিনড্রোমের কথা।

কিন্তু বর্তমান কমিশন দুর্বলতা, মেরুদণ্ডহীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতার ক্ষেত্রে উল্লেখিত সব কমিশনকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। ২০১৩ সালে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয় ছিল একটি বড় সিগন্যাল। এরও আগে নবম সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বাসনায় পেয়ে বসে আওয়ামী লীগকে। কিন্তু অতীত ট্রেন্ড থেকে মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে, জনগন পুনরায় ভোটে তাদের নির্বাচিত করবে না। সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের পর বার্তাটি তারা পেয়ে যায়। এমত বিশ্বাস থেকে ভোটারবিহীন ও একক জাতীয় নির্বাচনের পথে পা বাড়ায় দলটি।

ক্ষমতাসীনরা সফল হয় এবং অংশ না নিয়ে প্রতিরোধে ব্যর্থ বিএনপি প্রকারান্তরে একক নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগী হয়। পেছনে রেখে যায় নজিরবিহীন সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড যার নমুনা ইতিপূর্বে দেশ প্রত্যক্ষ করেনি। নির্বাচনমুখী দল হিসেবে এখানেই ঐতিহাসিক ভুলটি করে বসে বিএনপি । নির্বাচনে অংশ না নিয়ে প্রতিরোধের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। জামায়াত নির্ভর এই সিদ্ধান্ত যে কতটা আত্মঘাতী ছিল, আজকের বিএনপির চেহারার দিকে তাকালে সেটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ক্ষমতাসীনরা এটিকে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন বলেছিল এবং আলাপআলোচনার ভিত্তিতে আগামী ছয় মাসের মধ্যে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথাও জানিয়ে দিয়েছিল। কিন্ত বিএনপি নেতৃত্ব সরকারের ওপর এজন্য চাপ অব্যাহত রাখা তো দুরের কথা, আরেকটি নির্বাচনের জন্য জন্য জনগনকে সংগঠিত করে লক্ষ্যভেদী আন্দোলন গড়ে তুলতে একেবারেই ব্যর্থ হয়।

প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন এবং প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানে বর্তমান কমিশনের সাফল্য সরকারকে পথ দেখায়। এর পরপরই মার্চে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বলপ্রয়োগে ভোট জয়ের পুরোনো নীতিতে ফিরে যায় বাংলাদেশের নির্বাচন। কারন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সকল দলবেদল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অংশগ্রহন করে থাকে। সুতরাং ওই নির্বাচনে প্রথম দুই দফায় কিঞ্চিৎ বিপর্যয়ের পর ফলাফল অনুকূলে আনতে ক্ষমতাসীনরা মরিয়া হয়ে ওঠে। সিইসি রকিবউদ্দিন এই মরিয়া প্রচেষ্টার অংশ না হয়ে ছুটিতে চলে গিয়েছিলেন এবং ভারপ্রাপ্ত সিইসি মোহাম্মদ আবদুল মোবারক এই মিশন সম্পন্ন করেছিলেন।

উপজেলা নির্বাচনের পরে চলতি বছর এই পৌর নির্বাচন এবং ২০১৬ সালের মার্চএপ্রিল নাগাদ আগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জিতিয়ে আনতে ক্ষমতাসীন দলটি কোন কসুর করবে না। এটি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পৌরসভাগুলির নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের অথর্ব ভূমিকা আরো প্রকট। এবারেই প্রথম স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মার্কা লাগানো হয়েছে, তাও পুরোপুরি নয়, শুধুমাত্র মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে। মার্কাধারী এই নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীদের প্রতি কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদারতা ছিল দেখার মত।

স্থানীয়ভাবে দলের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রন শিথিল হয়ে পড়ায় দলীয় মার্কা লাগানোর পরেও তৃণমূলে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল লক্ষ্যণীয়। বিদ্রোহীদের বসাতে সব অস্ত্র ব্যবহার করেছে আওয়ামী লীগ। তাতেও কাজ হয়নি। প্রশাসনপুলিশকেও কাজে লাগানো হয়েছে। প্রার্থীসমর্থকদের বহিষ্কার করা হয়েছে। অনেক এলাকায় তুলনামূলক জনপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় বিদ্রোহী প্রার্থীরা অবরুদ্ধ ছিলেন। অন্যদিকে বিএনপিও বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার করেছে। তবে তাদের বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে নির্বাচনের কিছু আগে শুরু হওয়া গ্রেফতার অভিযান এড়াতে। তারপরেও সারাদেশে হাজার পাঁচেক কর্মীসমর্থক গ্রেফতার হয়েছে।

স্থানীয় সরকারগুলির নির্বাচনে জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার মূল কারন হচ্ছে, তৃণমূলে রাজনৈতিক অর্থায়নকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে চায় ক্ষমতাসীনরা। সেক্ষেত্রে যত বেশি উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ নিজেদের মুঠোয় রাখা যাবে, ততবেশি রাজনৈতিক অর্থায়ন দলীয় কর্মীদের কাছে যাবে। তারা পরিপুষ্ট হয়ে উঠবে। তাদের আর্থিক তেজী ভাব সংগঠনকে চাঙ্গা রাখবে। অন্যদিকে জেলা পরিষদে দলীয় লোকরাই প্রশাসক রয়েছে এবং বিএনপির সমর্থণে নির্বচিত চার সিটি মেয়রকে বরখাস্তকরন সম্পন্ন হয়েছে।

২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে জেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ সব কাঠামোয় দলীয় লোকদের অবস্থান নিশ্চিত করতে চায় ক্ষমতাসীনরা। দশম সংসদ নির্বাচনে লজ্জাঘৃণাভয় যেমন পরিত্যাজ্য হয়েছে, এক্ষেত্রে ভোটের এই অপসংস্কৃতি বিদ্যমান থাকবে। ধরে নেয়া হয়েছে যে, কোন উপায়ে ভোটে জিতলে কিছুকাল পরে মানুষ ভুলে যাবে এবং জয়ী দলের সাথেই থাকবে। বাঙালীর দীর্ঘকালের শক্তিপ্রীতি ও বিষ্মৃত মনের ওপর আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির অগাধ আস্থা। সেই বিবেচনাতেই বিদ্যমান রাজনীতিতে ভোট কালচারের প্রতি আত্মবিশ্বাসী পরিকল্পনায় হাইকমান্ডের সায় রয়েছে এটি জনগন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে সুষ্ঠ নির্বাচনের ইতিহাস খুব গৌবরদীপ্ত নয়। এক্ষেত্রে ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচন যে কলঙ্ক তিলক স্থাপন করেছিল তা কাটিয়ে উঠতে সময় গেছে দুই দশক। আর এ সময়কালে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন সত্তর দশকে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ থাকলেও আশির দশকে তা হয়ে ওঠে চর দখলের মত রক্তাক্ত ও সহিংস। ফলে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা একেবারেই ধ্বসে গিয়েছিল। সুষ্ঠ নির্বাচন করতে হলে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রজ্ঞা, যোগ্যতা দরকার হয়, নির্বাচন কমিশনের কাঠামোগত স্বাধীনতা ও সাহসীযুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকতে হয় ১৯৯১ সালের আগে সেটি ছিল একেবারেই অনুপস্থিত।

বলা যায়, ক্ষমতাসীন দলগুলি কখনই চায়নি যে, ভোটের মাধ্যমে জনগন তার ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। শাসকশ্রেনী সবসময় ভুগেছে ভোটাতঙ্কে। ১৯৯১ এর আগে কোন সরকার নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনশক্তিশালী যোগ্য করে তুলতে চায়নি। এমনকি প্রতিবেশি ভারতে নির্বাচন কমিশন যত শক্তিশালী হয়েছে, বাংলাদেশে তত পিছিয়েছে। ভোট ডাকাতি, ভুয়া ভোটার তালিকা, জালজালিয়াতি, কালো টাকার ছড়াছড়ি, পেশীশক্তির মহড়া, খুনোখুনি এ দেশের ভোট কালচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

বাংলাদেশের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা অর্জনে নির্বাচন পালন করেছে মূখ্য ভূমিকা। অতীতে নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দিয়েছে দেশের গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যত। কিভাবে নির্বাচন হচ্ছে, কার অধীনে হচ্ছে, কতটা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ হচ্ছে, জাতীয়আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কতটা গ্রহনযোগ্য সব হিসেবই ঘিরে রেখেছে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। সেদিক থেকে বাংলাদেশের জন্মের সাথে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ফলাফল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

১৯৭০ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তান সামরিক জান্তার অধীনে। ফলাফলের ওপর জান্তা, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন প্র্রভাব বিস্তার না করায় কোন বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। জনগন তাদের আকাঙ্খামতামত প্রকাশ করেছিলেন ব্যালটে। ফলে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। সামরিক জান্তা উপমহাদেশের মানদণ্ডে সবচেয়ে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার কৃতিত্ব নিতে পারেনি ফলাফল মেনে না নিয়ে। এই মেনে না নেয়া অখণ্ড পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুঁকে দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

১৯৯০ সালের পর অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও গ্রহনযোগ্য একটি মান অর্জিত হয়েছিল। ২০০৮ সালে হুদা কমিশন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে সব ইতিবাচক অর্জন করেছিল, দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক সরকারের আমলে সেগুলি ভেস্তে যায় এবং ভোট কালচার বদলাতে থাকে। ঐ সময়ে ধারণা তৈরী হয়েছিল যে, নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী, স্বাধীন ও ক্ষমতাসীন দলের আজ্ঞা মানতে অনাগ্রহী। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, বহু ধাপে উপজেলা নির্বাচন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন এবং সবশেষ পৌর নির্বাচন প্রক্রিয়া মানুষের সে আস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে।

অতি সম্প্রতি ব্র্যাক ইনষ্টিটিউট অভ গভার্ণন্সে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের শাসন পরিস্থিতি ২০১৪১৫’ সংক্রান্ত বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছেকেউ সংবিধান লংঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন বাধ্য। কিন্তু অকার্যকর নেতৃত্ব ও নির্বাহী বিভাগের চাপে কার্যত: এমন ব্যবস্থা নেয়ার কোন নজির নির্বাচন কমিশনের নেই। ফলে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন বহু দুরের লক্ষ্য হিসেবে রয়ে গেছে। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব খাটানো, নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও বর্জন কমিশনকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

২০১৫ শুরু হয়েছিল অবরোধ, পেট্রোল বোমার ধ্বংসলীলা, ক্রসফায়ারবন্দুকযুদ্ধ, আগুনে ঝলসানো ও গুলিবিদ্ধ লাশের মিছিল নিয়ে। মাঝখানে গেছে আপাত: শান্ত, ওপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট, এমত পরিস্থিতিতে দিন কেটেছে মানুষের। বছর শেষে পৌর নির্বাচনের ভোটাতঙ্ক ও জঙ্গী আতঙ্ক মানুষকে আবার অনিশ্চয়তার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে আগত বছর নিয়ে চরম অস্বস্তিনাশকতা, চাঞ্চল্যকর হত্যা ও জঙ্গী তৎপরতার আশংকা নিয়ে।।