Home » রাজনীতি » একক নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রয়োজন গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের চর্চা

একক নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রয়োজন গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের চর্চা

প্রকাশকাল ১৮ মার্চ ২০১৫

হোসেন জিল্লুর রহমান

last 1দেশ এক গভীর সংকটে এ নিয়ে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই। সংকটের গভীরতাও যে ১৯৯৬ ও ২০০৬এর সংকটের মাত্রা অতিক্রম করে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, এ নিয়েও সম্ভবত আর দ্বিমত থাকছে না। একদিকে বিরোধী আন্দোলনের সূত্র ধরে জনজীবন ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত, অন্যদিকে সংকটের রাজনৈতিক চরিত্রকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সরকারের আগ্রাসী দমন কৌশলের পরিণতি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আজ পুলিশি রাষ্ট্রের আবহ নিরন্তরভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের দম্ভোক্তি ও আস্ফালন এবং বিরোধীদের অনড় অবস্থানের যাতাকলে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব আজ তলানীতে ঠেকেছে। আশংকার আরও কারণ এই যে, এই অবস্থার পরিবর্তনের কোন ইংগিত কোথায়ও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছরের মাথায় এ এক নিদারুণ ও অগ্রহণযোগ্য বাস্তবতা।

আজকের সংকটের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট হচ্ছে এটি একমাত্রিক নয়। আতংকিত ও বাধাগ্রস্থ জনজীবন সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক বটে। তবে সংকটের দ্বিতীয় মাত্রাটি নিহিত আছে রাজনৈতিক সরকারের বৈধতার সংকটে। প্রাথমিকভাবে এই বৈধতার সংকট তৈরি হয় বিতর্কিত ও বহুলাংশে জনঅংশগ্রহণ বিবর্জিত ২০১৪এর ৫ জানুয়ারীর জাতীয় নির্বাচনে। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠির এই নির্বাচনী বৈধতার ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে উঠে নির্বাচন পরবর্তী ক্ষমতাসীনদের আচরণে। ৫ই জানুয়ারীর বিতর্কিত নির্বাচনের কিছুদিন পরেই অনুষ্ঠিত হয় পাঁচ পর্বের উপজেলা নির্বাচন। বৈধতার সংকটে পড়া সরকারের বড় সুযোগ ছিল উপজেলা নির্বাচনে গ্রহণযোগ্যতার নূতন মাপকাঠি প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু বাস্তবে ঘটে এর উল্টোটা। বিশেষ করে ৩য় পর্ব থেকে উপজেলা নির্বাচনও হয়ে উঠে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত, যখন আমরা দেখতে পাই আশি দশকের ফেলে যাওয়া কারচুপি ও দখলী নির্বাচনী সংস্কৃতির ব্যাপক প্রত্যাবর্তন। আরও সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি একের পর এক নির্বাচিত বিরোধী দলের মেয়রদের বিতর্কিত অজুহাতে ক্ষমতাচ্যুত করার ধারাবাহিক প্রয়াস।

নাগরিক সমাজের বলিষ্ঠ ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে অগ্রসর পেশাজীবী গোষ্ঠী বা গণমাধ্যম অনেকটা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির পর্যায়ে চলে গেছে। এটা একাধারে যেমন সাহসের সংকট, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিরও সংকট বটে।

বাংলাদেশ তাই আজ যথার্থই এক বহুমাত্রিক সংকটে আটকে যাচ্ছে যেখানে যুক্তিতর্কও সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভংগীর উর্দ্ধে উঠতে পারছে না। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক সংস্থাগুলির সামগ্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে নিরন্তর ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে, যার অবধারিত পরিণতি হচ্ছে নাগরিক অধিকারবোধ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে যাওয়া।

সামগ্রিক বিচারে সংকটের গভীর দিক হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বর্তমানে একদলীয় একনায়কতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ দেখা যাচ্ছে, যা সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। আসলে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার মধ্যে ভিন্নমতের একটি কাঠামোগত অবস্থান আছে। ১৯৯১ সাল থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, কোনো দলই এককভাবে ৭০৮০ শতাংশ ভোট পায়নি। প্রায় সব নির্বাচনেই তা ৩০৪০ শতাংশে রয়ে গেছে। এর মানে রাজনৈতিক ভিন্নমত আসলে সমাজের মধ্যে একটা বাস্তবতা। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে মনে হয়, সম্পূর্ণ একদলীয় বা একনায়কতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত অসঙ্গতি বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে। এক্ষেত্রে নিছকই নেতৃত্বের সংকটকে দায়ী করা যায় না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশকে অনেক ভাবেই এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আজকের সমস্যা হলো, নেতৃত্বের আকাক্সক্ষার সীমানা সংযতভাবে বা বাস্তবতার নিরিখে তৈরি হচ্ছে না। বলা যায়, এটা নেতৃত্বের দক্ষতার সংকট নয়; বরং নেতৃত্বের আকাক্সক্ষার সংকট।

একবিংশ শতাব্দীতে যেখানে দক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রয়োজন, সেখানে নিপীড়নমূলক সংস্থাগুলোর ওপর অধিক নির্ভরশীল হলে সার্বিক দক্ষতা তৈরিতে খুব বেশি এগুনো যাবে না। এখন সেটা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আরেকটি বিষয়, যখনই রাজনৈতিক নেতৃত্বের একক নিয়ন্ত্রণ আকাক্সক্ষার নির্দিষ্ট সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে, তখনই যোগ্যতাকে সে অর্থে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে না। ফলে কোনো দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বে স্তাবক বা তোষামোদকারীরাই প্রতিযোগিতার দৌঁড়ে উৎরে যাচ্ছে। ফলে এখন যোগ্যতার অবমূল্যায়ন কাঠামোগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা কমবেশি সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

আগেই উল্লেখ করেছি, সমাজে ভিন্নমতের উপস্থিতি থাকলেও একক নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জকারীরা সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তা মোকাবিলা করতে পারছে না। এক অর্থে সংকীর্ণভাবে কেবল ক্ষমতা যাওয়ার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে বিরোধী পক্ষ সে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। জনগণ একক নিয়ন্ত্রণ ভেতর থেকে মেনে না নিলেও বিরোধী পক্ষের কর্মকান্ডে তাদের সঙ্গেও সামিল হতে পারছে না। একদিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের তোয়াক্কা না করে নিয়ন্ত্রণমূলক সংস্থার দায়মুক্তির আবদার, অন্যদিকে মামলামোকদ্দমার অপব্যবহার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। রাষ্ট্রের দিক থেকে সব দমনমূলক প্রক্রিয়া জারি আছে। বিশেষভাবে বলতে গেলে, সুবিচারের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়েছে। বলা যায়, সার্বিকভাবে দেশে এখন একটা বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেসব ব্যাখ্যা আসছে তা যেমন জনগণ বিশ্বাস করতে পারছে না; তেমনি বিরোধী পক্ষের যুক্তিগুলোও আস্থায় নিতে পারছে না। এসবের সূত্র ধরে হয়তো চরমপন্থী ধারণাগুলো ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারছে।

এদিকে নাগরিক সমাজেরও একটি সংকট তৈরি হয়েছে। একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কিংবা নাগরিকদের অধিকারবোধ দুর্বল করার যে চেষ্টা চলছে সেটা শেষ বিচারে প্রতিটি নাগরিককেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কিন্তু এর বিপরীতে নাগরিক সমাজের বলিষ্ঠ ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে অগ্রসর পেশাজীবী গোষ্ঠী বা গণমাধ্যম অনেকটা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির পর্যায়ে চলে গেছে। এটা একাধারে যেমন সাহসের সংকট, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিরও সংকট বটে। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে ত্রিমাত্রিক সংকটকে মাথায় রেখে সমাধানগুলো সমাজের সামনে তুলে ধরার যে চ্যালেঞ্জ সেখানে কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাপারও আছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের সংকট রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে এলেও তা সমাজের অন্যান্য অংশকেও স্পর্শ করছে, ভবিষ্যতে আরো করবে। বিশেষভাবে বললে, বর্তমান অনিশ্চয়তা মারণ আঘাত হানছে অর্থনীতির ওপর। বর্তমান পরিস্থিতিতে এমনিতেই অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। আবার সহিংসতা বন্ধ হলেও বৈধতাপ্রসূত সংকট রয়েই যাবে। আর এটা থাকলে নিশ্চিত বলা যায়, অনিশ্চয়তার বিষয়টি অর্থনীতির ওপর কালো ছায়া হিসেবে থেকে যাবে। এবং সেটা প্রবৃদ্ধিসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করবে।

লক্ষণীয়, রাজনৈতিক এই অচলাবস্থা সমাজের মধ্যে এক ধরনের বিশ্বাসহীনতা তৈরি করছে। পুরো সমাজেই অবিশ্বাসের ভয়ংকর চিত্র তৈরি হয়েছে। মানুষ নিজেদের অনেকটা গুটিয়ে নিচ্ছে। বাইরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশিদের মধ্যে বছর দশেক আগে থেকে দেশে ফেরার একটি প্রবণতা শুরু হয়েছিল। এখন এটা কেবল থেমে গেছে তা নয়; বরং চিত্রটা উল্টো হয়ে গেছে। এটাও বাংলাদেশের অগ্রগতি ব্যাহতকরণে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সবচেয়ে বড় কথা, নতুন প্রজš§ প্রচন্ড সংকটে পড়ছে। তাদের ব্যাপকভাবে আশা দেখানো হয়েছিল, ২০০৯ সালে তারা ব্যাপক উদ্দীপনায় ভোট দিয়েছিল, উজ্জ্বল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু তাদের আশার গুঁড়েবালি হলো। এখন তাদের মধ্যে রাজনীতির প্রতি চরম অনীহা জš§ছে। তারপরও সাধারণ মানুষ বাংলাদেশকে ছেড়ে যাবে না। হয়তো যাদের সুযোগ আছে তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা ব্রেইনড্রেন হবে। সে হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখছে সাধারণ মানুষের নিরন্তর পরিশ্রম। এটা এক পর্যায় পর্যন্ত আমাদের টিকিয়ে রাখবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের পরিশ্রম এককভাবে বাংলাদেশকে কাংখিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারবে না। সুতরাং বর্তমান সমস্যার শিগগিরই সমাধান দরকার।

সমাধান অবশ্য বিভিন্নভাবে খুঁজতে হবে। এখানে প্রচুর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রমের প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে সমাজের তরফ হতে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির। আবার রাজনীতিবিদদের শুভ উপলব্ধির দরকার আছে। আসলে এটা ছাড়াও হচ্ছে না। এই উপলব্ধিতে আনার জন্য সত্য কথাগুলো বলা সমাধানের অন্যতম একটি দিক। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোনো সংকট নেই এ বক্তব্যের বিপরীতে সংকট কোথায় আছে, কোন পর্যায়ে আছে, কীভাবে আছে, এর অবয়ব বা চেহারা কেমন তা তুলে ধরা এবং সত্য বলার প্রচেষ্টাটাও সমাধানের অন্যতম পথ। ফর্মুলাগুলো খোঁজার বিষয় নয়; আলোচনার এক পর্যায়ে তা আসবেই। আমার মনে হয়, এবারকার রাজনৈতিক সংকট নব্বই, ছিয়ানব্বই সময়কার তুলনায় অনেক বেশি গভীর। সহজভাবে এই সংকটের মোড় ফেরানো কঠিন। কারণ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়ে বসে আছে। অনড় অবস্থান, দম্ভ, সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা, তোষামোদের মাধ্যমে নিজেদের সুযোগপ্রাপ্তির মানসিকতা পরিহার করে সঠিক বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। নিঃসন্দেহে ২০১৫ সালের সংকট আগের সংকটগুলোর তুলনায় গভীর হওয়ায় এটা সমাধানের প্রচেষ্টাও বেশি হওয়া প্রয়োজন। এর জন্য ধারাবাহিক উদ্যোগ দরকার। এক্ষেত্রে নাগরিক সমাজসহ সমাজের সব পেশার মানুষেরই এগিয়ে আসা জরুরি। একইসঙ্গে যারা সুস্থ রাজনৈতিক মূল্যবোধ লালন করেন তাদেরও সোচ্চার হওয়া দরকার। কারণ, শেষ বিচারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বহুমতের। এর ওপর দাঁড়িয়ে একক নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে কোনোদিনই টেকসই হতে পারবে না।।