Home » অর্থনীতি » জনগণের কল্যাণ :: প্রয়োজন গণতন্ত্র আর উন্নয়ন উভয়ই

জনগণের কল্যাণ :: প্রয়োজন গণতন্ত্র আর উন্নয়ন উভয়ই

প্রকাশকাল ২৯ জুন ২০১৫

. সালেহউদ্দিন আহমেদ

Last 2একটি রাষ্ট্রের জনগণের আর্থিক সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় দুটি আবশ্যক জিনিস হলো রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত জনগণের কল্যাণে কার্যক্রম পরিচালনা করা। এ দুটি দিকের মাঝখানে প্রয়োজনীয় স্তর হলো একটি সরকার। রাষ্ট্রের মূল কাঠামো ও নীতির মধ্যেই একটি সরকার জনগণের কল্যাণ এবং জনগণকে সেবা দেয়ার জন্য কাজ করে থাকে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো সে দেশের নাগরিক। রাষ্ট্র এবং নাগরিক পরিবর্তনশীল নয়। কিন্তু, সরকার পরিবর্তনশীল।

বর্তমানে একটি তর্ক দেখা গিয়েছে যে, গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন দুটি একটি অন্যটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই অহেতুক তর্কের হোতারা মনে করেন যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হলে উন্নয়নের ব্যাঘাত ঘটে অর্থাৎ উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাড়ায়। তাদের মতে, প্রথমত, যেকোনো উপায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে হবে, গণতন্ত্র আপাতত দূরে থাক। এটা অনেকটা কিছু অর্থনীতিবিদদের তত্ত্ব Growth first distribution later’এর প্রতিধ্বনি যেটা মোটেও গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব নয়। পাকিস্তান আমলে ষাট দশকের অর্থনীতিবিদরা উপরোক্ত ভ্রান্ত ধারণায় প্রবৃদ্ধির উপরেই বেশী জোর দিয়েছেন, দেশের আপামর জনসাধারণের কল্যাণের উপর নয়। এর ফলস্বরূপ ব্যক্তিগত আয় ও আঞ্চলিক আয়ের চরম বৈষম্য দেখা যায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ এবং এর জনগণ প্রভূত বঞ্চনার শিকার হয়, যার ফলে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন পাকিস্তানের প্ল্যানিং কমিশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুবুল হক ছিলেন প্রবৃদ্ধির উপর গুরুত্ব দেয়ার পক্ষে। পরবর্তীতে তিনি তার পেশাদার জীবনে এই ভুল বুঝতে পেরেছিলেন এবং জাতিসংঘের Human Development Index’এর মূল প্রবক্তা হিসেবে, প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের সার্বিক কল্যাণের উপর জোর দেন।

গণতন্ত্র ও উন্নয়ন দুটি একে অপরের পরিপূরক। মানুষ এবং তার ছায়াকে যেমন পৃথক করা যায় না, তেমনিভাবে গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন অবিচ্ছেদ্য। গণতন্ত্রের মূলভিত্তি হলো জনগণের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে একটি দেশের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। যখনই মানুষ তাদের নিজস্ব বিচার বুদ্ধিতে তাদের জীবনের চাহিদা নিরুপণ করে এবং কিভাবে সেটা অর্জন করবে সেটা নির্ণয় করে তখনই সত্যিকারের উন্নয়ন হয়। গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের মূল ভিত্তিটাই হলো জনগণের অভীষ্ট চাহিদা পূরণ, যেমন প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ (Process)কিভাবে সেগুলো অর্জন করা যায়। শুধুমাত্র অর্জন বা achievementএর ভিত্তি করে কেউ যদি বলেন উন্নয়ন আগে এবং গণতন্ত্র পরে, তবে সেটা হবে নিছক ভ্রান্ত ধারণা। কারণ পদ্ধতিটা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটা নির্ধারিত হয় গণতন্ত্রের মতামতের ভিত্তিতে এবং সেটা সম্ভব হয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে।

সাধারণত উদাহরণ দেয়া হয় যে, পূর্ব এশিয়ার কিছু কিছু দেশ যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর, হংকং, তাইওয়ান এসব দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে গণতান্ত্রিক কাঠামোর কিছুটা বিসর্জন দিয়ে। অপরপক্ষে দেখা যায়, বহু দেশ গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রেখে আর্থসামাজিক উন্নয়নেও অনেক দূর এগিয়ে গেছে। হয়তো বা এই সব দেশে উন্নয়নে সময় লেগেছে একটু বেশী, তবে সেই উন্নয়ন, অনেকটা টেকসই। এসব দেশে রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সরকারের জবাবদিহিতা এবং জনগণের ইচ্ছার অবারিত প্রতিফলনের সাথে সাথে জনগণের আর্থসামাজিক অভীষ্টগুলো যেমন প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এগুলোর অর্জন সম্ভব হয়েছে। প্রথমোক্ত দেশগুলো যেগুলো পুরোপুরি গণতান্ত্রিক পথে না গিয়েও উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে গেছে সেখানে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সরকারের জবাবদিহিতা এবং জনগণের অধিকার প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রথমে উল্লেখিত পূর্ব এশিয়ার দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। সেখানে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রয়েছে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য অংগ, সংসদ এবং বিচার ব্যবস্থা দিন দিন সুসংহত হচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভারত কিছুটা সময় দিলেও ইদানীং টেকসই এবং সার্বিক উন্নয়নে ভারত বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন দুটোই সমানভাবে সেখানে লালন করা হচ্ছে।

যেকোনো দেশেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিবেশ। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রবক্তরা বলে থাকেন যে, রাজনৈতিক সম্ভাব্যতা (political feasibility)এর উপরেই নির্ভর করে অর্থনীতির চাকা। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির পর্যালোচনা করলেই এর যথার্থতা পাওয়া যায়। অমর্ত্য সেন বলেছেন, Indeed, the evidence is overwhelming that growth is helped by the supportiveness of a friendly economic climate rather than by the fierceness of a ruthless political system.

গণতন্ত্রের ফলেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়, সরকারের বিভিন্ন অংগ, সংসদ, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন এবং নির্ভয়ে তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে।

উন্নয়নের মূল লক্ষ্য প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, ব্যবসার প্রসার এগুলো জনগণের জীবনের অপরিহার্য কিছু চাহিদা পূরণ করে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। প্রবৃদ্ধির সাথে দারিদ্র বিমোচনের হ্রাসের সম্পর্ক বহুলাংশে প্রমাণিত। কিন্তু জৈবিক ও দৃশ্যমাণ চাহিদার সাথে মানুষের কিছু মৌলিক চাহিদাও রয়েছে, যেমন কোনো কিছু করা বা পদক্ষেপ নেয়া একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। কোন মানুষ কি চাকুরী করবে, কিভাবে জীবনযাপন করবে সেটা তার অধিকার, বাইরে থেকে যদি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করিয়ে একজন মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়, তার ইচ্ছার বাইরে, তবে সেটা হবে জনগণের মূল নীতির পরিপন্থী এবং গণতন্ত্রের চেতনার বিরুদ্ধে। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয় যে, চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের ফলে একজন মানুষের অভীষ্ট চাহিদা পূরণ হলো (যেমন খাবারের ধরন, চাকুরীর বৈশিষ্ট), কিন্তু সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ একজন মানুষের সৃজনশীলতা, বিবেচনার ব্যবহার এবং তার মতামত প্রকাশের ‘প্রক্রিয়া’কে অবহেলা করা হচ্ছে। এই ‘প্রক্রিয়া’ই হলো গণতন্ত্রের একটি মূল বস্তু। দৃশ্যমাণ বস্তুভিত্তিক চাহিদার সাথে মানুষের আবশ্যকীয় চাহিদা রয়েছে যেমন বাকস্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা, নিজস্ব সংস্কৃতিভাষামূল্যবোধ ব্যবহার করার স্বাধীনতা যেগুলো উন্নয়ন কার্যক্রম এবং লক্ষ্যের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই এগুলোকে নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে ছিল দুটি উদ্দেশ্য : রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। স্বাধিকার শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনীতির ক্ষেত্রে এর অর্থ হচ্ছে জনগণের মতপ্রকাশ, ভোট, কথা ও লিখনীতে প্রকাশ ও চলাফেরার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও স্বাধিকার প্রযোজ্য যার অর্থ হচ্ছে মানুষের ‘সুযোগ’এর ক্ষেত্র অবারিত করা এবং তার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাছাই করার জন্য ‘প্রক্রিয়া’র ক্ষেত্রে কোনও বিঘ্ন সৃষ্টি না করা। সে জন্যই বলা হচ্ছে, গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন পরস্পর বিরোধী নয়, সত্যিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে টেকসই ও কল্যাণমুখী উন্নয়নও সম্ভব হবে। যেমনিভাবে ছায়া মানুষকে অনুসরণ করে। পরিশেষে বলা যায়, মানুষ সামাজিক জীব। অতএব সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বাইরে মানুষের উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং সে জন্যই প্রয়োজন গণতন্ত্র চর্চা ও প্রতিষ্ঠিত করা।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক