Home » আন্তর্জাতিক » ভারতকে কেন্দ্র করে শ্রীলঙ্কা-চীন নতুন সমীকরণে

ভারতকে কেন্দ্র করে শ্রীলঙ্কা-চীন নতুন সমীকরণে

প্রকাশকাল – ৭ জুন ২০১৫

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Last 3মহিন্দ্র রাজাপাকসেকে হারিয়ে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যাথ্রিপালা সিরিসেনার আত্মপ্রকাশ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সৃষ্টি বিবেচিত হয়েছিল। এই ঘটনাকে দেখা হয়েছে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে চীনের ভূমিকা ম্লান করে ভারতের উত্থান হিসেবে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে কী নতুন কিছু ঘটছে? অথচ নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ভারত সফরে গিয়ে তিনি দিল্লীর সাথে সম্পর্ক উষ্ণ করার কথা বলেছিলেন। সিরিসেনার পূর্বসূরী রাজাপাকসে প্রবলভাবে চীনের দিকে ঝুঁকেছিলেন। ভারতের চেয়ে তিনি চীনকে গুরুত্ব দিতেন। আর অতি সম্প্রতি বেইজিং সফরে গিয়ে সিরিসেনা কি সে দিকেই ঝুঁকছেন? বেইজিংয়ে সিরিসেনা ও শি জিনপিং দৃঢ়ভাবে দুই দেশের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা নতুনভাবে জানিয়েছেন। সিরিসেনার সাথে বেইজিংয়ে সাক্ষাত প্রসঙ্গে শি বলেছেন, ‘চীন সবসময় শ্রীলঙ্কাকে কৌশলগত অংশীদার বিবেচনা করে, গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যসাধন সম্পন্ন করার জন্য ‘আবারো চীনশ্রীলঙ্কা সম্পর্ক বিকশিত ও ঘনিষ্ঠ’ হওয়াটা কামনা করে’। তিনি আরো বলেন, চীন সবসময়ই এই অঞ্চলে শ্রীলঙ্কার সাথে সম্পর্ককে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করে।

দুই নেতা শ্রীলঙ্কার বাণিজ্যিক রাজধানী কলম্বোয় ১.৫ বিলিয়ন চীনা তহবিলে বন্দর নির্মাণ নিয়ে আলোচনা করেন। অথচ সিরিসেনা সরকার ক্ষমতায় এসেই পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং দুর্নীতির অভিযোগ এনে এর নির্মাণকাজ স্থগিত করেছিলেন। অবশ্য বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ভারতের চাপে সিরিসেনা ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। চীন সেখানে বন্দর নির্মাণ করুক, তা ভারত চায়নি। চীনা সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিউ জিয়ানচাও দুই নেতার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেছেন, উভয় পক্ষ এখন বন্দর প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

রাজাপাকসের চীনা লাইন

অবস্থানগত কারণে চীন, ভারত ও জাপানের বিশেষ নজরে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। রাজাপাকসের আমলে চীনের সাথে শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তিনি চীনা সহায়তা নিতে কোনো ধরনের রাখঢাক করেননি। তামিলদের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযানে চীনই শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল। চীনা সাবমেরিন শ্রীলঙ্কার বন্দরগুলোতে অবস্থান করছিল। দেশটিতে বেশ কয়েকটি চীনা প্রকল্প এগিয়ে যাচ্ছিল। গত বছর শি তার শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ সফরের সময় নতুন সামুদ্রিক ‘সিল্ক রোড’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটা ছিল ভারতকে ঘিরে ফেলা এবং জ্বালানিসমৃদ্ধ এবং পূর্ব চীনে অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে বিদ্যমান বন্দরগুলো নিয়ন্ত্রণের একটা বিশেষ ছক।

স্বাভাবিকভাবেই ভারতের এগুলো পছন্দ হয়নি। আর সিরিসেনা ক্ষমতায় এসেই সব প্রকল্প নতুন করে মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্ত বেইজিংয়ের ‘সামুদ্রিক সিল্প রোড’ এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সংযোগ সাধনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ পরিকল্পনায় মারাত্মক আঘাত বিবেচিত হয়। শ্রীলঙ্কার নতুন পরিকল্পনায় চীনকে এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গেও সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন কেরি শ্রীলঙ্কা সফর করেন। এ সময় দুই দেশ তাদের সম্পর্ক নতুন করে ঘনিষ্ঠ করার ব্যাপারে একমত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা শ্রীলঙ্কা সফর করবেন বলেও আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কেরির সফরের আগে মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী কার্ল ভিনসন কলম্বো পৌঁছে।

এসব কারণে সিরিসেনার আমলে ভারত বিশেষ সুবিধা ভোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে চীন হাল ছাড়ার পাত্র ছিল না। তাদের প্রকল্পগুলো নিয়ে নতুন সরকারের বিরূপ ধারণার মধ্যে চীনের পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহকারী মন্ত্রী বিশেষ দূত হিসেবে ৫৭ ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কা সফর করেন। তাছাড়া ভারতের উদ্বেগ দূর করতে এবং কলম্বো ও বেইজিংয়ের মধ্যে নতুন কৌশলগত সম্পর্ক বিকশিত করতে প্রেসিডেন্ট শি চীন, ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দেন। এসব সত্ত্বেও সিরিসেনা প্রশাসন শ্রীলঙ্কার ডকগুলোতে চীনা জাহাজ ভিড়তে দেয়নি। এই অচলাবস্থার মধ্যে চীনের ‘সবসময়ের বন্ধু’ পাকিস্তানের সাথে চীন ৪৬ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ও অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি করে।

চীনের কাছে মনে হয়েছে, বেইজিংকলম্বো সম্পর্কে যে ক্ষতি হয়েছে, এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া গেছে। তবে কলম্বোকে ছাড়তে চায়নি চীন। এ প্রেক্ষাপটে গত মার্চে সিরিসেনাকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

তবে শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ কিছু ঘটনা নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে রাজাপাকসের পরাজয় ছিল অভাবিত ও অপ্রত্যাশিত। রাজাপাকসে এবং সিরিসেনা উভয়েই পার্লামেন্টে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ফ্রিডম পার্টির সদস্য। রাজাপাকসের মন্ত্রী ছিলেন সিরিসেনা। হঠাৎ করেই তিনি রাজপাকসের বিরোধী ভূমিকায় চলে আসেন, প্রেসিডেন্টও হয়ে যান। কিন্তু জয়ের পর নানা সমস্যায় পড়েছেন তিনি। যেসব অভিযোগ তুলে তিনি জয়ী হয়েছিলেন, সেই স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ইত্যাদি তার বিরুদ্ধেও ওঠছে। মধুচন্দ্রিমা কাটতে শুরু করেছে। শ্রীলঙ্কায় এখন পার্লামেন্টে নির্বাচনের আয়োজন চলছে। আর তাতে ফ্রিডম পার্টির পক্ষ থেকে রাজাপাকসে মনোনয়ন চাচ্ছেন। তিনি যদি সেটা পেয়ে যান, এবং জয়ী হন, তবে দেশটি নতুন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। সিরিসেনা কী আগাম টের পেয়েই এই সফর করলেন?