Home » অর্থনীতি » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩৬)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩৬)

১৯৭১

আনু মুহাম্মদ

Last 5চীন নিয়ে লেখা সাম্প্রতিক গ্রন্থে মার্কিন প্রশাসনের দীর্ঘসময়ের কর্মকর্তা হেনরী কিসিঞ্জার ১৯৫৬ সালে মস্কোতে মাও সেতুং এর বক্তৃতার কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে মাও বলেছিলেন, ‘এখনও কেউ কেউ এরকম আছেন যারা চীন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন একসাথে দাঁড়াচ্ছে এরকম একটি অবস্থা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন চীনের উচিৎ একটি মধ্যপন্থা গ্রহণ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সেতু হিসাবে কাজ করা। যদি চীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দাঁড়ায় তার অবস্থান সুবিধাজনক ও স্বাধীন মনে হলেও আসলে চীন স্বাধীন থাকতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরযোগ্য নয়, সে কোনোভাবেই বেশি কিছু দেবে না। কী করে সাম্রাজ্যবাদ আপনাকে পুরো খাবার দিতে পারে? দেবে না।’ এই উদ্ধৃতি দিয়ে কিসিঞ্জার লিখছেন, ‘কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি, মাও যাকে বলছেন পুরো খাবার, তা দিতে রাজি থাকে, তাহলে? এই প্রশ্নের উত্তর ১৯৭২ সালের আগে পাওয়া সম্ভব ছিলো না, যখন প্রেসিডেন্ট নিক্সন চীনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।’ আগের পর্বগুলোতে বলা হয়েছে, আসলে এর শুরু হয়েছিলো আরও দুবছর আগে থেকেই।

নানাধরনের যোগাযোগের পর ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে কয়েকজন সাংবাদিকসহ মার্কিন টেবিল টেনিস দল চীন সফর করেন। স্বয়ং চৌ এন লাই এই দলকে অভ্যর্থনা জানান এবং দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন। এই বছরেরই জুলাই মাসের ৭ থেকে ১১ তারিখে চৌএনলাই ও হেনরী কিসিঞ্জার বেইজিংএ সভায় মিলিত হন। ১৬ জুলাই ঘোষণা করা হয যে, প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে ১৯৭২ সালের মে মাসের আগেই চীন সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই বছরের মে ও জুন মাসে রুমানিয়া ও যুগোম্লাভিয়ার নেতৃবৃন্দ চীন সফরে এসে বিপুল সংবর্ধনা লাভ করেন। এই সময়ের মধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মতাদর্শগত বিতর্কে চীনের প্রধান সঙ্গী আলবেনিয়ার সাথে চীনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর প্রধান কারণ চীনের ভূমিকা নিয়ে আলবেনীয় পার্টির সমালোচনা। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে আলবেনিয়ার ৬ষ্ঠ পার্টি কংগ্রেসে চীন কোনো প্রতিনিধি প্রেরণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ২৫ অক্টোবর চীন জাতিসংঘ ভুক্ত হয়। ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাসে রিচার্ড নিক্সন চীন সফরে যান, কয়েকমাসের মধ্যে কিসিঞ্জার আবারো চীন সফর করেন।

১৯৫০ সালে কোরীয় যুদ্ধে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে চীনের দূরত্ব এবং বৈরীতা বাড়তে থাকায় চীন বড় দুই শক্তিরই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। এরই এক পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়তে থাকলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এবং ক্রমশ তাদের সাথে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলো। এর মধ্য দিয়েই চীন জাতিসংঘে তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করলো। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সাথে চীনের দূরত্ব এবং বৈরীতা বাড়তে থাকলো আর যোগাযোগ বাড়তে থাকলো পাকিস্তানের সাথে। এরকম একটি পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হলো। চীন তখন স্পষ্টতই পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র অক্ষশক্তির দিকে অনেকখানি ঝুঁকে আছে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চীনের অবস্থান নির্ধারণ ও তা ঘোষণায় চীনা পার্টির কোনো সভার সিদ্ধান্ত পাওয়া যায না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই যুদ্ধকে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন এটি আভ্যন্তরীণভাবেই সমাধান হবে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি পলিটব্যুরোর সদস্য সত্যমৈত্র জানিয়েছেন, সেসময় পার্টির পক্ষ থেকে চীনের সাথে যোগাযোগ করা হয়, চীনা পার্টির নেতাদের সাথে বৈঠকও হয়। তাঁদেরকেও চীনা পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, পাকিস্তান সরকারের দমনমূলক পদক্ষেপ তাঁরা সমর্থন করেন না, তবে তাঁরা এই পরিস্থিতিকে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই মনে করেন এবং আশা করেন যে, পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে। এর বাইরে বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন সম্পর্কে চীনের আনুষ্ঠানিক নিন্দা বা প্রতিবাদ পাওয়া যায় না, এখানকার চীনপন্থী রাজনৈতিক দল ও গ্রুপগুলোর রাজনৈতিক দায় ও দায়িত্ব সম্পর্কে কোনো মনোযোগেরও খবর পাওয়া যায় না। অথচ বাংলাদেশের চীনপন্থী ধারা থেকে স্বাধীনতার আওয়াজ তোলা হয়েছিলো আরও আগে। এমনকি ১৯৭০ সালে প্রকাশ্য জনসভায় স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছিলো। ঘটনাপ্রবাহ থেকে মনে হয়, চীনের নেতৃবৃন্দের কাছে তখন তাদের ‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থে’ পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করাই ছিলো প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নরম অবস্থানের অভিযোগে এবং বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে যথাযথ ভূমিকা পালন না করবার অভিযোগ নিয়েই চীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মতাদর্শিক সংগ্রাম শুরু করেছিলো। কিন্তু এর কয়েকবছরের মধ্যেই চীনের ভূমিকা যা দাঁড়ালো তা এই অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি অসঙ্গতিপূর্ণ।।

(চলবে…)

তথ্যসূত্র

১। Henry Kissinger: On China, Penguin, 2011.pp 121-22