Home » আন্তর্জাতিক » জলবায়ু রাজনীতি :: এখন যা ঘটছে (শেষ পর্ব)

জলবায়ু রাজনীতি :: এখন যা ঘটছে (শেষ পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো

Last 6হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ প্রকৃতিকে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে। কিন্তু মানুষও প্রকৃতির মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় থেকেছে। শিল্প বিপ্লব ও পুজিবাদী যুগেই এই সম্পর্ক অন্য রূপ নিয়েছিল। আর বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পুজিবাদ প্রকৃতিকে নির্মমভাবে শোষণ করতে শুরু করে। তার ভয়াবহ বিপর্যয়কর পরিণতি এখন অনুভূত হচ্ছে।

কার্ল মার্কসের চোখেই প্রথম পুজিবাদের এই ধ্বংসাত্মক ভূমিকাটি চোখে পড়েছিল। অবশ্য মার্কসের আগেও অনেক দার্শনিক প্রকৃতিবাদী ছিলেন। তারা প্রকৃতির কোলে ফিরে যাবার আকুতি জানিয়েছেন। মার্কস কিন্তু সেভাবে বলেননি। তবে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের দিকটি তিনিই প্রথম তুলে ধরেছিলেন। মার্কসের সাম্যবাদ কেবল মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণের অবসান ঘটাবে না, প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককেও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলবে। মার্কসের চিন্তার এই দিকটি সম্পর্কে অনেকেই কম জানেন। ১৮৪৪ সালেই যুবক কার্ল মার্কস ‘অর্থনৈতিক ও দার্শনিক ম্যানসক্রিপটস’ গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘এই কমিনিজম পূর্ণ বিকশিত প্রকৃতিবাদরূপে মানবতাবাদের সমান এবং এই কমিউনিজম পূর্ণ বিকশিত মানবতাবাদরূপে প্রকৃতিবাদের সমান। এটাই হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের এবং মানুষের সাথে প্রকৃতির সংঘর্ষের সত্যিকারের সমাধান’।

পুজি গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে তিনি দেখিয়েছেন পুজিবাদ কিভাবে ‘পুনরুৎপাদন ও আহরণের জন্য পৃথিবীকে শোষণ করছে’।

প্রকৃতিকে খুব বেশি শোষণা করলে তার ফল কিন্তু ভালো দাড়ায় না। মার্কস দেখাচ্ছেন শ্রেণী শোষণ ছাড়াও প্রকৃতিকে মাত্রাতিরিক্ত শোষণ থেকে মুক্তির জন্যও পুজিবাদকে উৎখাত করতে হবে। প্রকৃতিকে বেশি করে শোষণ করলে প্রকৃতিও প্রতিশোধ নেয়। এবং এই পর্যায়েও সমাজতন্ত্রের ও সাম্যবাদের আবশ্যিকতা যৌক্তিকভাবে দেখা দেয়। ‘প্রকৃতির দ্বন্দ্ববাদ প্রসঙ্গে’ শীর্ষক অতি মূল্যবান গ্রন্থে ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস বলেছেন, ‘প্রকৃতির উপর আমাদের বিজয় নিয়ে আমরা যেন খুব বেশি আত্মতৃপ্তি ও গর্ববোধ না করি। কারণ এই রকম প্রতিটি বিজয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়। এ কথা সত্য যে, প্রথম বিজয় আমাদের জন্য আশানুরূপ ফল নিয়ে আসে। কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্ষেত্রে ফলটা অন্যরকম হয়। আগের থেকে অনুমান করা যায় না, এমন প্রতিক্রিয়া প্রায়শ প্রথম বিজয়ের ফলাফলকে বাতিল করে দেয়’।

মুনাফার তাড়নায় পুজিবাদ অরণ্য উজাড় করেছে, ভূগর্ভস্থ পানি ও অন্যান্য সম্পদকে নিঃশেষ করেছে, প্রাণী জগতে ভারসাম্য নষ্ট করেছে। এই সবের প্রতিক্রিয়ায় পরিবেশে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা গত শতাব্দীর শেষের দিকেই প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। তখনি প্রথমে নজরে পড়লো প্রকৃতিতে কয়েকটি বিপর্যয়কর পরিবর্তন। সেগুলো হচ্ছে

১। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি, গ্রীন হাউজ প্রভাব, ২। বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে ওজন স্তর ছিদ্র সৃষ্টি, ৩। উষ্ণমণ্ডলীয় অরণ্যের ধ্বংসসাধন ও ৪। স্থানীয় ভিত্তিক পরিবেশ বিপর্যয়, যথা এসিড বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ঝড় ইত্যাদি।

বিংশ শতাব্দীতে গড়ে প্রতি বছর শূন্য দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস করে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯৫ সালেই প্রথম জাতিসংঘের একটি সংস্থা (ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ বা আইপিসিসি স্বীকার করলো যে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষের কার্যক্রম দায়ী। এর আগে এই ভাবে ভাবা হয়নি। যদিও মার্কসএঙ্গেলস ঊনবিংশ শতাব্দীতেই এটি লক্ষ্য করেছিলেন এবং উল্লেখ করেছিলেন। এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরে একটা বই লিখে পরিবেশে ভারসাম্যহীনতার দিকটি এবং তার বিপদের দিকটি উল্লেখ করেছিলেন। ১৯৯২ সালে তিনি যে বইটি লেখেন তার শিরোনাম ছিল ‘আর্থ ইন ব্যালান্স ইকোলজি অ্যান্ড হিউম্যান স্প্রিট’।

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকেই পরিবেশের বিষয়টি আলোচনায় এলো। কিন্তু জাতিসংঘের রিপোর্ট অথবা গোরের গ্রন্থ কোনোটাই প্রধান দুশমনকে চিহ্নিত করতে পারেনি। অর্থাৎ পুজিবাদী লালসাকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। এবং সেটাই স্বাভাবিক। ফলে এক ধরনের খন্ডিত ও উপরসা সমাধানের চেষ্টা হয়েছিল যা এখন পর্যন্ত কোন ফল দেয়নি। বৈজ্ঞানিকরা কিন্তু সতর্ক করে দিয়েছিলেন, এইভাবে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে পৃথিবীর বহু জায়গা মনুষ্য বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে, নানা ধরনের সংকট দেখা দেবে। এন্টারটিকার বরফ গলে সমুদ্র উচ্চতা বৃদ্ধি করবে। অনেক দ্বীপ পানির তলায় ডুবে যাবে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র গর্ভে বিলীন হওয়ার আশংকাও অমূলক নয়।

এত সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চত্যের দেশসমূহ গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃসরণকারী জ্বালানি ব্যবহার, বিশেষত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে রাজি নয়। কারণ তেল, গ্যাস কোম্পানী তাদের প্রভূত লাভজনক ব্যবসা পরিত্যাগ করবে না। অন্যদিকে সেই সকল দেশের জনগণও গাড়ি ফ্রিজ ইত্যাদি ব্যবহারে এমনই অভ্যস্থ যে, তারা এই জীবন পদ্ধতি পরিবর্তন করতে রাজি নয়, যদিও সে জন্য ভবিষ্যত বংশধরকে চরম মূল্য দিতে হবে। এমনকি মানবজাতির অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আমাদের বায়ুমণ্ডলের ওজনস্তরে যে বিরাট ফাক সৃষ্টি হয়েছে, সে জন্যও মানুষের ক্রিয়াকলাপ দায়ী। ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনার ইত্যাদির ব্যবহারের কারণে যে গ্যাস নির্গমন হয়, তা ওজনস্তরে এই ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বায়ুমণ্ডলের ওজন স্তর পৃথিবীকে মহাকাশের জীবনের জন্য ক্ষতিকর প্রাণনাশক রশ্মি থেকে রক্ষা করছে। সেখানে ছিদ্র সৃষ্টি হওয়া যে কতো মারাত্মক তা কি পুজিপতিরা জানেন না? জানেন। তবু ব্যবসার ক্ষতি করে ফ্রিজ বা এয়ারকন্ডিশনার উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করবে না। পাশ্চাত্যের আরামপ্রিয় জনগণও এই সবের ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে না। তারা বর্তমানই বোঝে, ভবিষ্যত দেখে না।

এই কারণেই জলবায়ুর মতো আপাতঃ অরাজনৈতিক বিষয় নিয়ে এতো রাজনৈতিক মতবিরোধ।

যে কথা বলছিলাম, নব্বইয়ের দশকেই প্রথম জাতিসংঘ বিষয়টিকে আলোচনায় আনতে বাধ্য হল। ১৯৯০এর দশক ছিল বিগত সহ¯্রাব্দের সবচেয়ে উষ্ণ দশক। অথচ ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রোটোকল কেবল কিছু ফাকা বুলী উচ্চারণ করেছিল। যেখানে বিজ্ঞানীরা বললেন, আগামী একশ বছরের মধ্যে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের নিঃসরণ পুরোপরি কমিয়ে আনতে হবে, সেখানে কিয়োটো প্রটোকলে বলা হলো, ২০১২ সালের মধ্যে ১৯৯০এর তুলনায় ৫.২ শতাংশ কমানো হবে। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই জায়গা থেকেও নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।

মার্কিন ও পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর দাবি, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকেও প্রাকৃতিক তেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমাতে হবে। তার মানে ধনী দেশের তুলনায় আমরা পিছিয়ে থাকবো। বিগত দুই এক দশকে চীন, ভারত, ব্রাজিল ব্যাপকভাবে শিল্পায়নের পথে গেছে। অতএব তেল জাতীয় জ্বালানির চাহিদা তাদের এখন বেড়ে গেছে।

এ কথা সত্যি যে, এই কারণেও কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের নিঃসরণ বেড়ে গেছে। ১৯৯০ সালে যার পরিমাণ ছিল ২১ বিলিয়ন টন, এখন তা দাড়িয়েছে (২০১২ সালে) ৩৫.৪ বিলিয়ন টন। প্রাকৃতিক জ্বালানি তেল ও তেল জাতীয় পদার্থের ব্যবহারও কমার পরিবর্তে ক্রমাগত বাড়ছে। ১৯৯০ সালে যা ছিল ৭.২ বিলিয়ন টন, দুই হাজার সালে তা দাড়ায় ৮.১ বিলিয়ন টনে এবং ২০১০ সালে ১০.৫ বিলিয়ন টনে।

পরিবেশ বিপর্যয় ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীর রাষ্ট্রনায়কেরা উল্টো পথে হাটছেন। মানব জাতির অস্তিত্ব যে বিপন্ন হতে চলেছে, এটা তারা জেনেশুনেও বিবেচনার মধ্যে নিচ্ছেন না।

পাশ্চাত্য জগতের কর্পোরেট পুজির তাৎক্ষণিক ও সর্বোচ্চ মুনাফার নিরন্তর লালসা ও তাগিদ, অপরদিকে প্রাচ্যের কয়েকটি দেশের নতুন করে শিল্পায়নের তাগিদ সব মিলে যে জলবায়ু রাজনীতি তৈরি হয়েছে, সে সম্পর্কে সজাগ হয়ে বিকল্প রাজনীতির ধারা তুলে ধরতে হবে। যে রাজনীতির মূল কথা হবে, পরিবেশ বাঁচাও, পৃথিবীকে বাঁচাও। এটাই হবে জনগণের রাজনীতি।।