Home » রাজনীতি » পৌর নির্বাচন :: ক্ষমতাসীনরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে

পৌর নির্বাচন :: ক্ষমতাসীনরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Municipal 1111রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি আকারেপ্রকারে বড় হওয়ার কারণে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিতের রক্ষাকবচ হিসেবেই প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থায় নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে নিরন্তর। প্রতিনিধিত্বশীলতার অর্থই হচ্ছে রাষ্ট্র ব্যবস্থাটির উপরে সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব। আর এই প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়ার পথ প্রথমত নির্বাচন এবং পরবর্তীকালে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করার মধ্যদিয়েই। জনগণের গণতন্ত্র এবং তাদের উন্নয়ন বাস্তবায়ন করার কারণেই এর যে পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে তার বর্তমান পর্যায় এসে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানের প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকতর বিকেন্দ্রায়ন। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা বিকেন্দ্রায়নের মাধ্যমে সমাজের উপর থেকে নিচ এবং কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সবস্তরে গণতন্ত্রের হাত ধরে উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এসব বিচারবিবেচনায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে এবং যতোদিন যাচ্ছে ততোই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটি যথাযথ কারণেই প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। একক বা কতিপয়ের কর্তৃত্ব ভেঙ্গে গণঅংশীদারিত্বমূলক ব্যবস্থা সৃষ্টির জন্য স্থানীয় সরকার বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে এটি দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে এর উল্টোটি। পুরো শাসন ব্যবস্থাটি করে তোলা হয়েছে ক্রমাগত কেন্দ্রীভূত। আর কেন্দ্রীভূত শাসনের মধ্যদিয়ে যে কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্ম নেয় কিংবা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাটি শাসনকে অধিকতর কেন্দ্রীভূত করে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটিতে এ কারণেই ক্রমাগত কোণঠাসা করা হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে সরকার ও প্রশাসন একযোগে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পৌরসভা নির্বাচনসহ পুরো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনকে দলীয় মনোনয়ন এবং প্রতীকে রূপান্তরের মধ্যদিয়ে প্রথম যে দুর্বলতাটি প্রকাশ পেয়েছে তা হচ্ছে এর মধ্যদিয়ে প্রকৃতার্থে এবং বাস্তবে বিশাল সংখ্যক মানুষকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এ কথাটি মনে করার কোনো কারণ নেই যে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবারই আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে আওয়ামী, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত বা অপরাপর রাজনৈতিক দলের উপরে। যাদের এদের উপরে আস্থা ও বিশ্বাস নেই কিংবা যারা দলনিরপেক্ষ মানুষদের নির্বাচিত দেখতে চান স্থানীয় সরকারে, তাদেরও জোর করে ওই ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে এই জোর এবং প্রাণান্তকর প্রচেষ্টাটি কেন? এর পেছনে বড় ধরনের মতলববাজী কাজ করেছে। আর সে মতলববাজীটি হচ্ছে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থাকে তৃণমূল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া।

পৌরসভা নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে জোর গলায় বলা হচ্ছে। এই ‘শান্তিপূর্ণ’ শব্দের অর্থ খুজে পাওয়া এই দুর্ভাগা দেশে খুবই মুশকিল। তবে সামগ্রিকভাবে যা দেখা গেছে তাতে বলা যায় – ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যাপক কারচুপি এবং ভোট লুণ্ঠন’এর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই অবিশ্বাস্য এবং নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। আইনশৃংখলা বাহিনীসহ প্রশাসনের সহযোগিতার বিষয়টি যেমন আছে তেমনি বিরোধী দল প্রতিরোধের সেই শক্তি ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বাইরে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজিত রেখে ভেতরে কি হয়েছে তা বিচারবিশ্লেষণ না করলে নির্বাচনটিকে অতিঅবশ্যই শান্তিপূর্ণ বলতেই হবে। আর শান্তিপূর্ণ না হলে বেলা আড়াইটার মধ্যে নির্বিঘ্নে ভোট গণনা শুরু হয় কিভাবে? আগের দিন রাতে সিল মারার অভিযোগ উঠেছে কেমন করে? আর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত অবাধে সিল মারার দৃশ্যই বা কোথা থেকে এসেছে? শান্তিপূর্ণ যদি হয়েই থাকে তাহলে এতো অনিয়মকারচুপির অভিযোগই বা উঠছে কেন?

ভোটারের ভোটদানের যে ক্ষতিয়ান আমরা পাই তাতে ৭৪টি পৌরসভায় ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়া কতোটা বাস্তবসম্মত। এই নির্বাচনে ৭৩ দশমিক ৯২ শতাংশ ভোট পড়েছে। ২০১৪’র মে মাসে অনুষ্ঠিত প্রশ্নবোধক উপজেলা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৬৩ শতাংশের মতো। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ব্যাপক ভোট কারচুপি প্রত্যক্ষ করা গেলেও ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে ৪৪ শতাংশ।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, যেসব জাতীয় নির্বাচন অর্থাৎ সংসদ নির্বাচনে সত্যিকার অর্থেই ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন সেসব নির্বাচনের ভোটারের ভোটদানের হিসাব যদি দেখা যায় তাহলে নিশ্চয়ই গড়মিলটি খুজে পাওয়া যাবে। ১৯৯১এর নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ১৯৯৬এর নির্বাচনে ছিল ৭৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। ২০০১এর নির্বাচনে ছিল ৭৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং ২০০৮এর নির্বাচনে ছিল ৮৫ দশমিক ২৬ শতাংশ।

তাহলে এই প্রশ্নটি উত্থাপন কি জরুরি নয় যে, ওই সব জাতীয় নির্বাচনের চাইতেও বেশি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হয়েছে এই পৌরসভা নির্বাচনটি? ভোটারের সংখ্যাও কি বেশি ছিল?

পৌর নির্বাচন কেমন হয়েছে তা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম ইতোমধ্যেই হয়েছে এবং আরও প্রশ্নের জন্ম নিতে পারে। তবে সে সব দিকে না গিয়ে ওই নির্বাচনের ফলে সার্বিকভাবে কি কি ক্ষতিগুলো হয়েছে তা বিচারবিশ্লেষণের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন নয়, সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থাটিরই চরম এবং সীমাহীন ক্ষতি হয়ে গেছে। কারো কারো কাছে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাটিই অর্থহীন মনে হতে পারে। তবে বর্তমান সরকারের অধীনে ভবিষ্যতে যে কোনো নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার প্রশ্নটি অর্থহীন বলে একটি ধারণার জন্ম ইতোমধ্যেই হয়েছে। এটা শুধু বিরোধী পক্ষের মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিস্তারিত হচ্ছে। অবশ্য বর্তমান ক্ষমতাসীনরা এটাই বরাবর চেয়ে এসেছে। ২০১৪এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন থেকেই ক্ষমতাসীনরা সাধারণ্যের মনোজগতে এমন একটি মনস্তাত্বিক ধারণার জন্ম দিতে চায় যে, ভোটের আর প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন উন্নয়নের। তাদের মনে ধারণাটি তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক মনস্তাত্বিক কারণে। আর তা হচ্ছে ক্ষমতার বাইরে গেলে পরিস্থিতি কি দাড়াবে তেমনই এক ভয়াবহ ভীতি। এই ভীতি জন্ম দিয়েছে নির্বাচনী সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করার।

তবে বিএনপির জন্য এই নির্বাচনের শিক্ষা হচ্ছে এই যে, নির্বাচন বয়কট আসলে প্রতিবাদ জানানোর কোনো পন্থা নয়। কারণ আপাতঃ পরাজিত হলেও কার্যত দলটি শক্তপোক্ত একটি ভিত্তি পায়।

তবে শুধু ক্ষমতাসীনদের ক্ষেত্রেই নয়, সামগ্রিকভাবে রাজনীতির জন্যও ক্ষতির কারণ হয়েছে বেশ কয়েকটি। আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীসহ পুরো প্রশাসনের উপরে যে ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা তা ভবিষ্যতে আরও প্রকট হবে এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের শাসনের জন্য পুরো বিষয়টি হয়ে দাড়াবে সমস্যাসংকুল। এছাড়া এই নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু নির্বাচনে কারচুপিই নয়, রাজনৈতিক সাংঘর্ষিক বৈরিতার বিষয়টি তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়া এবং বিস্তৃত করা হয়েছে।

এই নির্বাচন সমাজে অন্তর্গত অস্থিরতা, ভারসাম্যহীনতা ও পরিণামে রাজনৈতিক শূন্যতাকে আরও প্রকট এবং ভয়ংকর করে তুলবে। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়েও উগ্রবাদ, জঙ্গীবাদ এবং চরমপন্থার বিস্তার লাভ সহজতর হতে পারে। যারা সংক্ষুব্ধ, বিক্ষুব্ধ হয়েছে, বিতাড়িত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের মধ্যে সৃষ্ট প্রতিরোধপ্রতিহিংসার মনোবৃত্তি যে সুস্থ, স্বাভাবিক পথে হবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ সুস্থ রাজনৈতিক পন্থার অনুপস্থিতিই উগ্রপন্থার জন্ম দেয়। তবে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বিস্তারের যে ধরনধারণ দেখা যাচ্ছে তাতে এ কথাটিই মনে হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে এটি আরও তীব্রতর হবে। ক্ষমতাশ্রয়ী ক্ষমতাবান ও শক্তিমান যে শ্রেণীটির উত্থান ঘটেছে তৃণমূল পর্যন্ত, তারা আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠবে। আর এই ধারায় ক্ষমতাসীনরা আরও বেশি নির্যাতননিপীড়নের পথে যাবে তার সব আলামত স্পষ্ট।

ক্ষমতাসীনদের মনে এই ধারণাটি বদ্ধমূল হয়েছে যে, তাদের প্রভাব কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ ক্রমাগত জোরদার হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টোটাই কিন্তু ঘটছে। পৌর নির্বাচন আবারও প্রমাণ করেছে যে, নির্বাচনী ব্যবস্থার সাথে সাথে জনগণই পরাজিত হয়েছে আপাতত। তবে বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদী নয়। যুগযুগান্তরের শিক্ষা হচ্ছে পরাজিত হয় না জনগণ এবং তাদের অধিকার।।