Home » রাজনীতি » প্রতিপক্ষ নিশ্চিহ্নকরণই একমাত্র লক্ষ্য

প্রতিপক্ষ নিশ্চিহ্নকরণই একমাত্র লক্ষ্য

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Coverগণতন্ত্র বিজয় দিবস না হত্যা দিবস এটিকে কেন্দ্র করে বিবাদমান রাজনীতি আবার গনগনে হয়ে ওঠার আশঙ্কায় জনগন রীতিমত আতঙ্কিত। স্মৃতি তো এখনও কাঁচা, ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে দেশকে কিভাবে পেট্রোল বোমা ও বার্ণ ইউনিট, ক্রসফায়ার আর গুপ্তহত্যার জনপদে পরিনত করা হয়েছিল। তিনমাস ধরে জ্বলেপুড়ে খাক হয়েছে মানুষ, পোড়াগুলিবিদ্ধ লাশ ও সম্পদের ধ্বংস্তুপের ওপর ৯০ দিন পার করেছে জাতি। অচলাবস্থা থেকে ফিরে এলেও রাষ্ট্রের সর্বশরীরে দগদগে ক্ষতের দাগ এখনও স্পষ্ট। এই ক্ষত সম্পর্কে ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দলকেউই সচেতন নয়।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাল্টাপাল্টি সমাবেশ অনুষ্ঠানের অনুমতি শেষতক কোন দলকে দেয়া হয়নি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সমাবেশের অনুমতি চেয়ে পুলিশের বরাবরে বিএনপি আবেদন করে ৩১ ডিসেম্বর, আর আওয়ামী লীগ আবেদন করে ২ জানুয়ারি। এটি সত্য হলে ধরে নেয়া যায়, বিএনপির কর্মসূচিতে বাগড়া দেয়া ও ভন্ডুল করার উদ্দেশ্যেই ক্ষমতাসীনরা পরিকল্পিত উপায় বেছে নিয়েছে। ভবিষ্যত রাজনীতিতে এটি আরেকটি খারাপ উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

সরকারের ভাষায় নাশকতা এবং বিএনপির ভাষায় আন্দোলন যাই বলা হোক না কেন, প্রাণ গেছে কিন্তু ওই সাধারন মানুষেরই। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, নাশকতার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে বিচারিক ব্যবস্থার আওতায় সরকার নিয়ে আসেনি। মামলা হয়েছে অসংখ্য এবং অযুত মানুষ এসব মামলার আসামী। মামলায় উল্লেখিত ‘অজ্ঞাতনামা’ বা ‘আরো অনেকে’র আড়ালে যেমন চলছে গ্রেফতার বাণিজ্য, তেমনি আসামীর তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব মামলাগুলো নাশকতা দমন ও ভবিষ্যত প্রতিরোধের বদলে হয়ে উঠছে প্রতিপক্ষ দলনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

এই নিবন্ধটি প্রকাশিত হবার আগেই দেশবাসীর জানা হয়ে যাবে, ৫ জানুয়ারিকে ঘিরে পুনরায় যে আশঙ্কাআতঙ্ক তৈরী হচ্ছে, তা কোন দিকে গড়াচ্ছে এবং কি পরিনতি বয়ে আনবে? দেশের বড় দুই দলের পারস্পরিক সংঘাত এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ নিজেরাই খুঁজে পাচ্ছে না, নাকি খুঁজে পেতে চাচ্ছে না! পরস্পর নিশ্চিহ্নকরণের মধ্যে তারা সমাধান খুঁজছে। দুই দলের সংঘাত ও জিঘাংসা দলীয় সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে রাষ্ট্রের গোটা অবয়বে।

বিএনপির রাজনীতি ও সাংগঠনিক কাঠামো যে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসার প্রাণপন চেষ্টায় রত তারা। এজন্য তারা দল গোছানো এবং তৃণমূলে সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের যে আওয়াজ তুলেছিল, তা অনেকটা ফাঁকা বুলিতে পর্যবসিত হয়েছে। এক্ষেত্রে যে ‘লাউ সেই কদু’ গোছের পুনর্বিন্যাস ঘটেছে। পৌরসভা নির্বাচন তাদের জন্য যে সুযোগ তৈরী করেছিল, সাংগঠনিক দুর্বলতা, সরকারের চণ্ড দমননীতি এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সে সাফল্যের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে।

পৌরসভা নির্বাচনকে যদি তারা দল গোছানো এবং আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে জনগনকে সংগঠিত করার প্রচেষ্টা গ্রহন করে থাকে, তাহলে দলীয় মনোযোগ সে ক্ষেত্রে প্রশ্নবোধক হয়ে থাকবে। এই প্রসঙ্গেও তারা তাদের অবস্থান পরিস্কার করতে পারেননি। বরং মুক্তিযোদ্ধা দলের সভায় খালেদা জিয়া জাতীয় মুক্তি আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ঐতিহাসিক সত্যের অপালাপ করে যে মন্তব্যগুলো করেছেন, তা তাঁর দলের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের অভিযোগকে আরো উস্কে দিচ্ছে। পাশাপাশি গয়েশ্বর রায়ের জঘন্য মন্তব্য এড়িয়ে যাওয়া যেত, যদি না তিনি দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের হতেন।

আওয়ামী লীগ পন করেছে রাজনীতিতে বিএনপিকে কোন স্পেস দেবে না। তারা চাচ্ছে, দল হিসেবে বিএনপির টোটাল ডেসট্রাকশন নিশ্চিহ্ন করে দিতে। এজন্য দেশীয়আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী, জঙ্গীবাদ লালনকারী ও সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করতে সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের এই পাতানো ফাঁদে পা দিতে বিএনপি মুখিয়ে আছে। কথায়বার্তায়, বক্তব্যবিবৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহন সকল ক্ষেত্রেই অনুসরন করছে ক্ষমতাসীনদের ফাঁদ।

সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তারা আওয়ামী লীগের অন্তর্গত বাসনা পূরণ করেছে এবং একটি একক ও প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচনে প্রকারান্তরে সহগামী হয়ে রাজনীতির মূলধারা থেকে প্রায় ছিটকে পড়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে এক ধরনের ন্যাকা ন্যাকা আচরন বিচার চাই, তবে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের এবং স্বচ্ছ। এসব বক্তব্য দিয়ে মূলত: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অভিযোগকেই তারা প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, এই বিচার বিএনপি চায় না।

একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে অসৎ এবং অস্পষ্ট বক্তব্যের কারনে বিএনপি বিচার বিরোধী ভূমিকায় রয়েছে জনমনে এরকম ধারনা দৃঢ়মূল হয়েছে। জানা নেই, পৃথিবীর কোন দেশে জাতীয় নেতৃবৃন্দ ইতিহাসের সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য বা হলোকাষ্ট নিয়ে কোন নেতিবাচক মন্তব্য করে থাকেন। কিন্তু খালেদা জিয়া করেছেন। এর আগে তারেক জিয়া লন্ডনে বসে হরহামেশা মন্তব্য করেছেন। এসব মন্তব্য করে জামায়াতে ইসলাম। তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী যখন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, মুক্তিযুদ্ধর নেতৃত্ব প্রসঙ্গে এবং দলের অর্বাচীনরা শহীদ বুদ্ধিজীবিদের নিয়ে বিকৃত মন্তব্য করে তখন তারা আদর্শিক অবস্থানে জামায়াতের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যান।

দুই দলের পরস্পর নিশ্চিহ্নকরণের হীন রাজনৈতিক প্রচেষ্টা দেশে ধর্মাশ্রয়ী জঙ্গীবাদকে স্পেস তৈরী করে দিচ্ছে। গত দুই দশক ধরে ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দেয়া এই শক্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে জায়গা করে নিয়েছে। সরকারের ভেতরকার সরকার জেএমবি নামে এর উত্থান ও কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটানোর জন্য রাষ্ট্রীয় সমর্থন দিতে শুরু করেছিল। ২০০৪ সালে ৬৪ টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে তারা আত্মপ্রকাশ করেছিল। দেশের একটি ভবনে গড়ে ওঠা প্যারালাল সরকারের সমর্থন এবং একাধিক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রশাসনপুলিশের কর্তা ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এই জঙ্গীগোষ্ঠি দেশব্যাপী অপারেশন চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছিল।

২০০৫ সালে জেএমবি নিষিদ্ধ হয় এবং ২০০৭ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম (বাংলা ভাই) সহ ছয় জঙ্গীর ফাঁসি কার্যকর হয়। কিন্তু জঙ্গীবাদ উত্থানে পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রত্যক্ষ সহায়তার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রসরকারদলের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা তো দুরে থাক, তারা থেকে গেছেন বহাল তবিয়তে। এরপরে বিভিন্ন নামে, নানা ফর্মে একাধিক জঙ্গীগোষ্ঠি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মূলধারার রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলে জঙ্গী ইস্যু একটি নিয়মিত অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। এটিকে দমন এবং জিইয়ে রাখার দোধারী কৌশল অব্যাহত থাকে।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর জঙ্গী দমন ইস্যুতে রাজনৈতিক সক্ষমতা ও অবস্থান সুস্পষ্ট করে আন্তর্জাতিক সমর্থন হাসিলে সরকারের তৎপরতা ছিল লক্ষ্যনীয়। কিন্তু অচিরেই জঙ্গী ইস্যু হয়ে উঠতে থাকে বুমেরাং। দেশীয়আন্তর্জাতিক মহল থেকে ইসলামিক ষ্টেটএর উপস্থিতির দাবি উঠলে সরকার ধারাবাহিক অস্বীকারের পথ বেছে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত করেছেন এবং মন্ত্রীরা স্পষ্ট বলছেন, ‘জঙ্গী রাষ্ট্র বানিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র’। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গত সেপ্টেম্বরনভেম্বর এই নব্বই দিনে ১০ টি হত্যাকাণ্ড, মসজিদউপাসনালয়ে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং আইএস, আল কায়দা ভারতীয় শাখা, আনসার আল ইসলামের এর নাম উচ্চারিত হচ্ছে।

রাজনীতিকে আশ্রয় করে এই দেশে জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটেছে। রাজনীতিকে পক্ষে রাখতে বা প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলতে ধর্মাশ্রয়ী জঙ্গীবাদ নিয়ে খেলাখেলা নীতি মূলধারার রাজনীতিকে হুমকির মুখোমুখি করে দিয়েছে। এই বিপদ বহুমুখী। এর ফলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির বড় উপাদান অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন পাঠানো হয়েছে নির্বাসনে। রাজনীতিকরণের ফলে ধর্ম চর্চার সুকুমার দিকটি বিঘ্নিত হচ্ছে। সকল ধর্মের নিরীহ মানুষরা হরহামেশা আতঙ্কিত থাকছে। সামাজিক সংযোগের ক্ষেত্রগুলোও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে। সামাজিক পূঁজি এবং সামাজিক সম্মিলন বিপন্ন হয়ে পড়তে চলেছে।

দেড় দশক ধরে মূলধারার রাজনীতিতে ক্ষমতা এবং ক্ষমতাই হয়ে উঠেছে একমাত্র এবং সবশেষ কথা। ক্ষমতায় থাকলে যা খুশি করা যায়, যে কোন তত্ত্ব হাজির করা যায়, প্রতিপক্ষ দমনে সবরকম অপকৌশল ব্যবহার করা যায়। সেজন্য এখানে রাজনীতির ভাষা যতটা উন্নয়নশিক্ষাসামাজিক ভাবনামুখী তার চাইতে অনেক বেশি জঙ্গীবাদ ভীতি ও জঙ্গী মোকাবেলামুখী। এজন্য রাজনীতিবিদদের ছাড়িয়ে জাতির মনোজমিনে, ভাবনায় জঙ্গীবাদ বড় জায়গা করে নিচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় শিকার পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ কেন শিখতে পারলো না?

ধর্মাশ্রয়ী জঙ্গীবাদের প্রাথমিক স্তর হচ্ছে, রাষ্ট্র ও মূলধারার রাজনীতিতে হিংসাবিদ্বেষ ছড়িয়ে বিভাজিত করে দেয়া। গণতন্ত্রের বদলে একক কর্তৃত্ববাদী শাসন চালু রেখে সুশাসন অন্তর্হিত করা, জনগনকে হিসেবের মধ্যে না রাখা ও সর্বত্র দলীয়করণের বিস্তার দেড় দশকে এভাবেই প্রাথমিক কাজ সস্পন্ন করেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় স্তরে হত্যা, বোমা হামলা, অপহরণ এসবের মাধ্যমে ভয় ছড়ানো সম্পন্ন করেছে। সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত এলাকায় জঙ্গীবাদ অনুপ্রবেশ করেছে। ২০১৫ সালে সরকারের জিরো টলারেন্স পরিস্থিতির কতটা উন্নয়ন ঘটিয়েছে, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ।

ধর্মাশ্রয়ী জঙ্গীবাদকে রাজনীতির ট্রাম্পকার্ড বিবেচনা করা বা খেলাখেলা নীতির প্রহেলিকা থেকে দেশের বড় দুই দল বেরিয়ে না আসলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, সে সম্পর্কে মন্তব্য করা না গেলেও আশঙ্কা অনেক রকম। পরস্পর নিশ্চিহ্নকরণের রাজনীতি ধর্মাশ্রয়ী শক্তিকে কোথায় নিয়ে এসেছে নিশ্চয়ই বিষয়টি রাজনীতিকদের উপলব্দিতে রয়েছে। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণে জঙ্গীবাদের প্রতি তরুণদের একটি প্যাশন তৈরী হয়েছে, এটি অস্বীকার কোন উপায় নাই। ফলে জঙ্গীগোষ্টিসহ অন্ধকারের অন্যান্য শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে ফিরে আসতে হলে অন্তত: নির্বাচনমুখী গণতন্ত্র চর্চার ধারায় সকল দলমতের স্পেস তৈরী করা ক্ষমতাসীনদের জন্য অত্যন্ত জরুরী।।