Home » অর্থনীতি » বিলিয়ন ডলারের আইএস এর খিলাফত (পর্ব -১)

বিলিয়ন ডলারের আইএস এর খিলাফত (পর্ব -১)

কলাম লিনচ, ডেভিড ফ্রান্সিস, ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Last 7ইসলামিক স্টেট (আইএস), ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস) কিংবা (ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লেভ্যান্ট (আইএসআইএল)- যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই গ্রুপটি এখন প্রতিনিয়ত আলোচনায় থাকছে। তাদের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। আবার তাদের বিরুদ্ধেও প্রায় পুরো বিশ্বই যুদ্ধে নেমেছে। এমনকি আমেরিকা, রাশিয়া পর্যন্ত তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু আইএসএর যুদ্ধ চলছেই। পাশ্চাত্য শক্তিগুলো এখন মনে করছে, আর্থিক ভিত্তি ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত এই গ্রুপটিকে দমানো সম্ভব নয়। আর আইএসএর আর্থিক ভিত্তি অনেক মজবুত, কয়েক বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি সফল হবে পাশ্চাত্য শক্তি। ফরেন পলিসি সেই বিশ্লেষণই তুলে ধরেছে।

নভেম্বরে সেই লক্ষ্যেই সিরীয় নগরী দি ইজোরের কাছে মার্কিন জঙ্গি বিমান তেলক্ষেত্র, শোধনাগার এবং শত শত ট্যাঙ্কার ট্রাকে হামলা চালানো হয়। ‘অপারেশন টাইডাল ওয়েভ টু’ নামের এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল আইএসের গ্রুপটির লাখ লাখ চরমপন্থী যোদ্ধার বেতন প্রদানের উৎস তাদের কালোবাজার অর্থনীতি এবং চাঁদাবাজি কর ব্যবস্থার উৎসকে গুঁড়িয়ে দেওয়া।

অবশ্য আইএস ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। তারা তাদের ক্রমাগত বিপুল হতে থাকা অর্থনীতিকে নানামুখী করেছে। ২০১৪ সালের টমসন রয়টার্সএর সমীক্ষায় বলা হয়, গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ, তাদের বার্ষিক আয় ২.৯ বিলিয়ন অর্থাৎ দুইশ নব্বই কোটি ডলার।

এই অর্থের বেশির ভাগই সংগৃহীত হয় ‘কর’ আদায়ের মাধ্যমে। তাদের ভূখণ্ডে বসবাসকারীরা এই অর্থ দিয়ে থাকে। এছাড়াও জর্দান থেকে ইরাকে প্রবেশকারী প্রতিটি ট্রাক থেকে ৮০০ ডলার, সমাজকল্যাণ ও বেতন থেকে ৫ ভাগ করে, উত্তর ইরাকের গাড়িচালকদের কাছ থেকে ২০০ ডলার রোডট্যাক্স, রাক্কার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো থেকে লুটের জন্য ৫০ ভাগ কর এবং আলেপ্পোর একই ধরনের স্থানগুলো থেকে ২০ ভাগ কর গ্রুপটি আদায় করে বলে টমসন রয়টার্স সমীক্ষায় বলা হয়। অমুসলিমদেরকেও ‘জিজিয়া’ কর দিতে হয় বলে জানানো হয়।

আল কায়েদা, ইসলামিক স্টেট, তালিবান এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী গ্রুপ পর্যবেক্ষণকারী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ গ্রুপের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী হ্যান্সজ্যাকব স্কিন্ডলার ফরেন পলিসিকে বলেন, ‘তারা একে বলে কর, আমরা বলি চাঁদা।’ তার মতে, অবরোধ, সামরিক ব্যবস্থাসহ নানা কারণে তাদের আর্থিক খাতে কোনো কোনো খাতে কিছু চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে সেটা খুব বেশি নয়।

তিনি বিষয়টিকে ‘বেলুনপ্রতিক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করেন। অর্থাৎ একদিকে চাপ দিলে সেটা অন্যদিকে ফুলে যায়।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক পাওয়াজ গাজগেজ বলেন, আইএস দৈনন্দিন সেবা খাতে বিপুল করারোপ করেছে। আবর্জনা পরিস্কার, হিটিং ওয়েল, বৈদ্যুতিক জেনারেটরও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এমনকি আবাসিক স্থাপনা ভাড়া দেওয়া, সন্তানদের স্কুলে পাঠানোতেও বিপুল কর দিতে হয়। তার মতে, এ ধরনের কর ইসলামিক স্টেটের জন্য ‘একটি ভালো শিল্প।’

টমসন রয়টার্সের মতে, এসব খাত থেকে মাসে ৩০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৪ সালে কর খাত থেকে আয় হয়েছিল ৬০ কোটি ডলার। এই প্রতিবেদন বলা হয়, ওই বছর তেল থেকে মাত্র ১০ কোটি ডলার আয় হয়েছিল। অবশ্য বিভিন্ন বেসামরিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলসম্পর্কিত আয় এর চেয়ে অনেক বেশি।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যে প্রচলিত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে, সেটা ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির অবরোধ বিশেষজ্ঞ এলিজাভেথ রোসেনবার্গ। তার মতে, জঙ্গিরা প্রচলিত ব্যাংকিংব্যবস্থায় লেনদেন না করায় এই অবরোধ ব্যর্থ হতে বাধ্য।

ইসলামিক স্টেট প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ, নারীদের ক্রীতদাসী করা, প্রাচীন পবিত্র ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়াসহ নানা ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ডের জন্য বিশ্ববাসীর কাছে দুঃস্বপ্ন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

কিন্তু গ্রুপটি তার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করে বিপুল আয়ও করছে। তাদের আয়ের বেশির ভাগই আসছে সিরিয়া ও ইরাকের তেলক্ষেত্রগুলো থেকে। এছাড়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা থেকে আনা প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রীর ব্যবসা থেকেও তারা বিপুল আয় করছে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরাকের রাষ্ট্রদূত মোহামেদ আলী আল হাকিমের মতে, প্রত্নসামগ্রীর ব্যবসা থেকে গ্রুপটি বছরে ১০ কোটি ডলার আয় করছে।

আন্তর্জাতিক কালোবাজারে ইরাক ও সিরিয়ার প্রত্নসামগ্রীর বিপুল চাহিদা রয়েছে। এ কারণে গ্রুপটি এই খাতটিকেই তাদের আয়ের অন্যতম উৎসে পরিণত করেছে।।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)