Home » বিশেষ নিবন্ধ » মাহবুব হোসেন :: চলে গেলেন কৃষি অর্থনীতির প্রধান পুরুষ

মাহবুব হোসেন :: চলে গেলেন কৃষি অর্থনীতির প্রধান পুরুষ

মুস্তফা কে মুজেরী

Mahbub Hossain. মাহবুব হোসেনের অকাল প্রয়াণে মন ভারাক্রান্ত। বিশেষ করে খবরটি আমার জন্য বড় শোকের একটি বিষয়। আমি তাকে মাহবুব ভাই বলেই ডাকি। আশির দশক থেকেই তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কাজের সুবাদে তাকে আরো কাছ থেকে দেখেছি। গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ড. মাহবুব যথাযথ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উভয় ক্ষেত্রে তার কৃতিত্ব রয়েছে। বিশেষ করে কৃষি গবেষণায় তার যুগান্তকারী অবদান রয়েছে।

আমাদের গ্রামীণ সমাজে ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব নিয়ে তিনি যে গবেষণা করেছেন, সেটিকে বলা হয় পাথব্রেকিং ওয়ার্ক। এখনো এটিকে একাডেমিক ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে ‘রেফার’ করা হয়। ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকার সঠিক চিত্র তিনিই গবেষণার মাধ্যমে প্রথম তুলে ধরেছেন। কৃষিতে প্রযুক্তি বিকাশের আর্থসামাজিক, বিশেষ করে গ্রামীণ দারিদ্র্যের ওপর এর প্রভাব তার গবেষণায় পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। কৃষি ও কৃষিবহির্ভূত খাতগুলো কীভাবে বিকশিত হচ্ছে, এর পেছনে কোন বিষয়গুলো ভূমিকা রাখছে এবং ক্ষুদ্রঋণ ও ঋণসহায়তা কীভাবে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিকশিত হতে সহায়তা করছে, তা তার গবেষণায় উঠে এসেছে বিস্তারিত। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ড. মাহবুব তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তার গবেষণা শুধু আমাদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করেনি, নীতিনির্ধারণেও সহায়তা করেছে। তার গবেষণা ছিল নীতি বা পলিসি ওরিয়েন্টেড। ফলে নীতিসংক্রান্ত গবেষণায় তার ভূমিকা অনন্য। আমাদের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ড. মাহবুবের যে অবদান, তা অস্বীকার করা যাবে না। কেননা তার গবেষণার ওপর ভিত্তি করে অনেক নীতি নতুন করে তৈরি হয়েছে, অনেক নীতিতে পরিবর্তন আনা বা সংস্কার করা হয়েছে। তিনি আমাদেরকে কৃষি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি পুষ্টি পরিস্থিতি উন্নয়নে অধিক দৃষ্টি দেয়ার কথা বলেছিলেন। তার পরামর্শ আমাদের জাতীয় জীবনের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। সরকারও তার মতামত নীতি প্রণয়নে অন্তর্ভুক্ত করে সুফল পেয়েছে। সরকারি বিভিন্ন কাজে ড. মাহবুব সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে।

গবেষণার বাইরেও তিনি বিভিন্ন খাতের উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে থেকে আন্তর্জাতিক কৃষিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ব্র্যাক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে তিনি কৃতিত্বের সফল চিহ্ন রেখে গেছেন।

মাহবুব ভাই গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ হিসেবে নিজ যোগ্যতায় যে স্থান অধিকার করেছেন, তা হারানোর নয়। যত দিন দেশের কৃষি গবেষণা, গ্রামীণ অর্থনীতি থাকবে, . মাহবুবের নাম সেখানে অবশ্যই লেখা থাকবে। তার ভূমিকা শুধু আজ নয়, ভবিষ্যতে আমাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। মাহবুব ভাই আমাদের জাতীয় জীবনের উন্নয়নে যে ভূমিকা রেখেছেন, সে ভূমিকার কথা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নতির যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নে আমাদের আরো নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমেই ড. মাহবুবকে স্মরণ করা হবে বলে আমি মনে করি। আশা করি, তার গবেষণার আলোকে, অবদানের আলোকে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।

মাহবুব ভাইয়ের প্রতি আবারো গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। পরকালে তার আত্মা শান্তি পাক।।

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোফিন্যান্স