Home » বিশেষ নিবন্ধ » সরকারি ব্যয়ে শতকোটি টাকার পৌর নির্বাচন

সরকারি ব্যয়ে শতকোটি টাকার পৌর নির্বাচন

এম. জাকির হোসেন খান

Last 2কারচুপিঅনিয়মের কারণে ভোটাররা প্রতারিত হয়েছেন। এ নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র নিশ্চিত হবে না। অনেকের ভ্রান্ত ধারণা যে নির্বাচন নিয়মিত হচ্ছে, তার মানেই এখানে গণতন্ত্র আছে তা ঠিক নয়। যেখানে ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন কিন্তু ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ভিন্ন দৃশ্য, আগে থেকেই ছাপদেয়া ব্যালট পেপার দিয়ে বাক্স ভরা হয়এটা কি ভোটারদের সাথে প্রতারণা নয়? নানা অনিয়মের কারণে ভোটারদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে এবং নির্বাচন নিয়ে আস্থার সঙ্কট আরো বেড়েছে’। গত ৩০ ডিসেম্বর বিবিসি বাংলার প্রবাহ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত পৌরসভার মেয়র নির্বাচনকে রাজনীতি বিশ্লেষক ড. নাসিম আখতার হুসাইন মূল্যায়ন করেন এভাবেই। এর আগে নির্বাচন সম্পর্কে বিবিসি বাংলায় ‘ভোটের সময় ধামরাই, মাঠের মধ্যে ব্যালট পেপার’ শিরোনামে ধামরাইয়ের বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ সহ পৌরসভা নির্বাচনের কয়েকটি কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে সংবাদ, ও ‘ভোট শেষে গণনা শুরু, মাধবদী পৌরসভায় ভোট স্থগিত’ এবং ‘অনিয়ম নিয়ে পরস্পরকে দুষছে আওয়ামী লীগবিএনপি’ শিরোনামে আরও দুটি খবর প্রকাশিত হয়।

অথচ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা হলো রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য সঠিক এবং সুষম উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কি ও লর্ড ব্রাইস স্থানীয় সরকারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘গণতন্ত্রের বিদ্যালয়’ বলে অভিহিত করেছেন। জন ক্লার্ক মনে করেন, ‘স্থানীয় স্বশাসিত সরকার জাতীয় বা প্রাদেশিক সরকারের সে অংশ, যা শুধু স্থানীয়পর্যায়ে সম্পৃক্ত, স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দায়বদ্ধ’। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১, ৫৯ ও ৬০ এ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে সরাসরি গুরুত্ব দেওয়া হলেও, এ ব্যবস্থাকে কখনো কোন সরকার প্রকৃতপক্ষে জনগণের কল্যাণার্থে ব্যবহার তো করেইনি, উল্টো ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দলীয় সমর্থকদের অবৈধ সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ এ প্রতিষ্ঠানগুলো হতে পারতো প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র চর্চা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দ্রুত এবং সহজতর বহুমুখী নাগরিক সুবিধা প্রদানের অন্যতম মাধ্যম।

তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে নাগরিকদের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য দলমত নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করার কথা ইউপি, পৌরসভা বা উপজেলা পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করা হয়েছে। নির্দলীয় চরিত্রের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে কখনো দলীয় মোড়কে নির্বাচন না হলেও ২০১৫ এর ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরেই দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে মেয়র, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন ও দলীয় প্রতীক থাকতে হবে। মূলতঃ কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে সংহত করার পর স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্যই যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা বলা যায়। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এবং সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলাপআলোচনা করা উচিত ছিল’। দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনের ফলে সমাজে ইতিমধ্যে সৃষ্টি রাজনৈতিক বিভাজন আরো দৃঢ় হয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত হবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে আরো দলীয়করণ হয়ে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পাবে।

সংবিধানের ৩৯()() অনুচ্ছেদে প্রদত্ত প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতার অধিকার এবং ১২২() অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ‘প্রাপ্ত বয়স্কের ভোটাধিকারভিত্তিতে সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে’ বলে নির্দেশনা থাকলেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নামে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি ভোটারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সাংবিধানিক ভোটাধিকার হরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো সবশেষ পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে তা সমাপ্ত হলো।

২০১৫১৬ অর্থ বছরে নির্বাচন কমিশনের বাজেট বরাদ্দ ছিলো ১৪৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৩৫ টি পৌরসভার নির্বাচনের জন্য ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। যার মধ্যে ৪৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং বাঁকি ৫৫ কোটি টাকা নির্বাচনে আইন শৃংখলা বজায় রাখার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। ২৩৫ টি পৌরসভার সর্বমোট ভোটার ছিলো প্রায় ৭১ লাখ এবং এ হিসেবে নির্বাচনে গড়ে ভোটার প্রতি প্রায় ১৪১ টাকা ব্যয় হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ভোটারবিহীন ১০ম সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি ভোট বাবদ গড়ে প্রায় ১৭১ টাকা। ওই নির্বচন বাবদ নির্বাচন কমিশনের বাজেট বরাদ্দ ছিল ২৯১ কোট টাকা, যে ব্যয় ভোটের হিসাবে ১৯৯১ থেকে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি। ২০১৪ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ওই বাজেটের বাইরেও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তার ব্যয়িত সময় এবং ভাতা সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের প্রকৃত হিসাব করলে শুধুমাত্র ভোট গ্রহণ বাবদ তার পরিমাণ প্রায় ১৫ শত কোটি টাকা। এবারের পৌর নির্বাচনে সরকারি ব্যয় শতকোটি টাকা হলেও প্রার্থীদের অর্থ ব্যয় হয়েছে অনেক অনেক গুণে বেশি।

যে বা যারা উন্নততর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে তুলনা করে বাংলাদেশেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার পক্ষে কথা বলছেন, তারা আসলে সত্যকে ধামাচাপা দিচ্ছেন। পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীকে ব্যবহার করে সে ধরনের একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তা ঐসব উন্নত দেশে আছে কিনা? ভোটাধিকার থেকে নাগরিকদেরকে বঞ্চিত করা ক্ষমতাসীনদের জন্য সন্তোষজনক হলেও জনগনের জন্য চরম হতাশার।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের ইচ্ছাঅনিচ্ছার প্রতিফলন হতে না দেওয়ায় প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর জনগণের অনাস্থা আরো বাড়বে। এর ফলে সার্বিকভাবে সকল উন্নয়ন এবং নাগরিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে একতরফা এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে পরিচালিত হবে, যা প্রকৃতপক্ষে সামাজিক অসাম্য আরো প্রকট করবে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রবণতা আরো বাড়বে। আর এর ফলে, টেকসই উন্নয়ন ব্যহত হবে। সুতরাং শত কোটি টাকার সরকারি ব্যয়ে যে পৌরসভা নির্বাচন হলো তার প্রকৃত অবদান শুধুমাত্র কমই হবেনা, বরং সামাজিক দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হবে, সার্বিকভাবে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে সামাজিক বৈষম্য এবং দুর্নীতি সৃষ্টির প্রবনতাও বাড়তে থাকবে।।